অযত্ন-অবহেলায় একের পর এক মরছে দুর্লভ প্রাণী

59

৭১ কণ্ঠ ডেস্ক

কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আর অযত্ন-অবহেলায় একের পর এক মারা যাচ্ছে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে ঠাঁই নেওয়া বিভিন্ন দুর্লভ প্রাণী। এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে ক্যাঙ্গারুর অস্তিত্ব। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ময়ূরমহল থেকে উড়ে গেছে অর্ধশত ময়ূর। চিকিৎসকের অবহেলায় মারা গেছে একমাত্র পুরুষ জিরাফটিও। চরম অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে প্রায় চার হাজার একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, লোকবলের অভাব আর আর্থিক সমস্যার কারণে পার্কটির আজ এ অবস্থা। অথচ চলতি বছরেও এ পার্ক থেকে সরকার প্রায় ১০ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে।

পার্কের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত পার্কে পাঁচটি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। গত সোমবার দুপুর ১২টার দিকে পার্কের ভেতর বাঘের নির্ধারিত বেষ্টনীর নির্জন একটি জায়গায় তিন বছর বয়সী একটি বাঘকে মৃত অবস্থায় দেখতে পায় কর্তৃপক্ষ। এর সপ্তাহখানেক আগে জীবন্ত একটি গুইসাপ খেয়ে ফেলে স্ত্রী বাঘটি। ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া একটি বাঘ চিকিৎসাধীন অবস্থায় পার্কে মারা যায়। ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল তিন পায়ের একটি বাঘের মৃত্যু হয়। এর আগে আরও দুটি বাঘ মারা যায় পার্কের ভেতরে। বর্তমানে পার্কে বাঘ রয়েছে ১২টি।

ক্যাঙ্গারুর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে পার্ক থেকে। শুরুর দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে একটি পুরুষ ও দুটি স্ত্রী ক্যাঙ্গারু আনা হয়। প্রথম অবস্থায় এদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল ক্যাঙ্গারু দম্পতি। দুই বছর পর ওই দম্পতির ঘরে ক্যাঙ্গারু শাবক জন্ম নেয়। কিছুদিনের মধ্যেই সেটি মারা যায়। এর বছরখানেক পর ফের ওই ক্যাঙ্গারু দম্পতি আরও একটি মাদি বাচ্চার জন্ম দেয়। ২০১৭ সালের অক্টোবরে পার্কের একমাত্র পূর্ণবয়স্ক পুরুষ ক্যাঙ্গারুটি মারা যায়। চলতি বছরের প্রথম দিকে অবশিষ্ট মাদি ক্যাঙ্গারু দুটিও মারা যায়। ক্যাঙ্গারুর সেই আশ্রমে এখন কয়েকটি হরিণ রাখা হয়েছে। অরিক্স, জিরাফ ও ব্ল্যাক ওয়াইল্ড বিস্টও সঙ্গীবিহীন হয়ে পড়েছে। পার্কে ৮টি অরিক্স আনা হলেও বর্তমানে আছে একটি মাদি অরিক্স। ১২টি জিরাফের মধ্যে টিকে আছে পাঁচটি মাদি জিরাফ। অরিক্স ও জিরাফ পরিবারে এখন কোনো পুরুষ সদস্য নেই। ছয়টি ব্ল্যাক ওয়াইল্ড বিস্ট আনা হয়েছিল। বর্তমানে টিকে আছে একটিমাত্র পুরুষ ব্ল্যাক ওয়াইল্ড বিস্ট। পার্কের দুই কর্মকর্তার অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে চিকিৎসকের অবহেলায় চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি একমাত্র পুরুষ জিরাফটি মারা যায়। ১৭ বছর বয়সী জিরাফটি আনা হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে।

শেয়াল-কুকুরের পেটে গেছে ব্ল্যাক সোয়ানের মতো প্রাণীও। গত বছরের ৭ ও ৯ নভেম্বর নির্ধারিত বেষ্টনী থেকে তিনটি ব্ল্যাক সোয়ান শেয়াল কিংবা বনবিড়াল খেয়ে ফেলে। পরবর্তী সময় পাশের বনে সেগুলোর দেহাবশেষ পাওয়া যায়। অন্তত ১০টি জেব্রা, ১০-১২টি হরিণ মারা গেছে গত কয়েক বছরে। কুকুরের আক্রমণে একটি চিত্রাহরিণের মৃত্যু হয়েছে।

ময়ূরমহলের দৃশ্য আরও করুণ। বছরখানেক আগেও শত ময়ূরের কেকাধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠত ময়ূরমহল। বছরখানেক ধরে ময়ূরমহলটি ওপরের অংশ নেটবিহীন পড়ে আছে। যখন-তখন ময়ূরগুলো উড়ে গিয়ে গভীর অরণ্যে আশ্রয় নিচ্ছে। গতকাল শনিবার দেখা যায় ৩৮টি ময়ূর বিচরণ করছে তাদের নির্ধারিত বেষ্টনীতে। তবে পার্ক কর্তৃপক্ষ বলছে, সব ময়ূরই আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে।

দর্শনার্থীদের অভিযোগ- পার্কে নানা অব্যবস্থাপনা। বিভিন্ন সময়ে এখানে এসে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তাদের। আর কোর সাফারি পার্কের ভেতরে বাঘ ও সিংহের দেখাই মেলে না। কোর সাফারির ভেতর অযত্নের কারণে আগাছায় ঢেকে আছে। বাঘ ও সিংহ ঝোপঝাড়ে গিয়ে লুকিয়ে থাকে। ফলে দর্শনার্থীরা একশ’ টাকায় টিকিট কেটেও এদের দেখা পান না।

পার্কের দায়িত্বে থাকা সহকারী বন সংরক্ষক তবিবুর রহমান সমকালকে বলেন, আর্থিক সমস্যার কারণে এসব পরিস্কার করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে তিন মাস আগে। এখন রাজস্ব খাত থেকে প্রায় ৫ হাজার প্রাণীর খাবারের ব্যয় বহন করা হচ্ছে। প্রতি বছর অন্তত ৩ কোটি টাকা খাবার বাবদ খরচ হয়। এ কর্মকর্তা আরও বলেন, পার্কটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অন্তত একশ’ লোকবল প্রয়োজন। সেখানে মাত্র ২৮ জন দিয়ে চলছে বিশাল পার্কটি। চিকিৎসক থাকার কথা পাঁচজন; রয়েছেন মাত্র একজন।

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক মিহির কুমার দো বলেন, পার্কে কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা নেই। ময়ূরমহলে নেট বেষ্টনী দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, আগাছার কারণে বাঘ-সিংহ দেখা যায় না- কথাটা ঠিক নয়। বর্ষা মৌসুম শেষ হলেই আগাছা পরিস্কার করা হবে।

Facebook Comments