অশনিতে মধ্যবিত্ত

173

আলোকিত সকাল ডেস্ক

গত ১ জুলাই থেকে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে। এমনিতেই ‘বাড়বাড়ন্ত’ জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে গলদঘর্ম সাধারণ মানুষ। সেখানে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবনকে আরও অসহনীয় করে তুলবে-এমন অশনি সংকেতই দেখা যাচ্ছে সামনে। ঈশান কোণের কালো মেঘের মতো এ সংকেত সবচেয়ে বেশি চিন্তায় ফেলে দিয়েছে মধ্যবিত্তকে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নিম্নমধ্যবিত্তের ভোগব্যয় তুলনামূলক কম। মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভোগব্যয় অপেক্ষাকৃত বেশি। কারণ, সামাজিকভাবে এরা অগ্রসর, রাষ্ট্রীয় অন্যান্য অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে তারা বেশি জড়িত। নিয়মিত কর- ভ্যাট ইত্যাদি শোধ করতে হয় তাদেরই। ফলে মধ্যবিত্তকেই মূল্যবৃদ্ধির জাঁতায় পিষ্ট হতে হবে বেশি। আবাসিকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পরপর বিভিন্ন খাতে মূল্যবৃদ্ধির মিছিল শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ১২ কেজি সিলিন্ডারে ব্যবহৃত এলপি গ্যাসের দাম বাড়ানোর চিন্তাভাবনা শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কমিশন (বিপিসি)।

এদিকে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে নাগরিকদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। বাম গণতান্ত্রিক জোট আজ রোববার সারা দেশে আধাবেলা হরতালের ডাক দিয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ বলেছে, সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে সরকার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যেখানে গ্যাসের দাম নেমে এসেছে অর্ধেকে সেখানে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি মেনে নিতে পারছেন না কেউ। এমনকি যেদিন থেকে বাংলাদেশে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির চূড়ান্ত ঘোষণা আসে, সেদিন অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে ভারতের মতো দেশে কমানো হয়েছে গ্যাসের দাম।

গত ৩০ জুন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নতুন নির্ধারিত মূল্যে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে আগের চেয়ে ৩২.৮ শতাংশ। আবাসিক গ্রাহকদের এক চুলার জন্য জুলাইলের ১ তারিখ থেকে গুনতে হচ্ছে ৯২৫ টাকা; আগে যা ছিল ৭৫০ টাকা। আর দুই চুলার জন্য গুনতে হচ্ছে ৯৭৫ টাকা; যার মূল্য আগে ছিল ৮০০ টাকা।

অন্যদিকে যানবাহনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম প্রতি ঘনমিটারে ৩৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৩ টাকা। সে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসে প্রতি ঘনমিটারে বাড়ানো হয়েছে ৪.৪৫ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ১৩.৮৪ টাকা, সারে ৪.৪৫ টাকা, শিল্পে ১০.৭০ টাকা, চা-বাগানে ১০.৭০ টাকা, বাণিজ্যিক হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ২৩ টাকা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ১৭.০৪ টাকা এবং সিএনজিতে ৪৩ টাকা।

এলপি গ্যাস : বেশ কয়েক বছর বাসাবাড়িতে পাইপলাইনে গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রেখেছিল সরকার। এতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহীসহ দেশের কয়েকটি বড় শহরে যেখানে পাইপলাইন গ্যাস ব্যবহার হয়, সেখাসে সিলিন্ডারভর্তি এলপিজি বা তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়। সাধারণত যারা পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করেন তারা যে বিল মাসান্তে শোধ করেন, সিলিন্ডার ব্যবহারকারীদের তার দ্বিগুণ ব্যয় করতে হয় গ্যাসের জন্য। গ্যাস ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ বৈষম্য দূর করার দাবি উঠলে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এলপিজি সহজলভ্য করা হবে। কিন্তু ঘটলো তার উল্টোটা। কয়েক বছরে কয়েক দফা বেড়েছে এলপিজির দাম। এমনকি দাম নিয়ন্ত্রণে কোনো ধরনের ব্যবস্থাও নিতে দেখা যায়নি সরকারকে। সরকারের কোনো কার্যকর ভূমিকাও দেখা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এলপি গ্যাসের বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। নেই তদারকিও। ফলে বাজার পুরোটাই ব্যবসায়ীদের দখলে। মোট চাহিদার ৯৮ শতাংশই তারা সরবরাহ করেন। সরকার শুধু লাইসেন্স দেওয়ার মধ্যেই তার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে। গত ১০ বছরে এলপিজি সরবরাহে বিভিন্ন কৌশলের কথা বললেও এলপিজির সরবরাহ বাড়াতে পারেনি বিপিসি। উল্টো চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অংশীদারিত্ব কমেছে। এ অবস্থায় তারা লোকসান গুনছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগকে। লোকসান কমাতে এলপি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কথা ভাবছে তারা। যদিও ১২ কেজি বোতলের এলপি গ্যাসের দাম কত নির্ধারণ করা হবে তার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব এখনো করেনি তারা।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান গণমাধ্যমে বলেন, ‘নতুন অর্থবছরের বাজেটে এলপিজির ভ্যাট ট্যাক্স বাবদ একটি বড় অঙ্ক যোগ হচ্ছে। এমনিতেই লাভ ছাড়াই এলপিজি বিক্রি করে বিপিসি।’ তিনি বলেন, ‘বাজারে সবচেয়ে কম দামে বিক্রি করি আমরা। তবে আমাদের এলপিজির পরিমাণ কম। এই অবস্থায় আমরা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে এলপিজির দাম বাড়াবে নাকি লোকসান গুনবে বিপিসি, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছি।’ বিপিসির দাবি, দাম না বাড়ালে বছরে ৩৯ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হবে।

এদিকে বাজেটে এলপি গ্যাসের ওপর করের বোঝা বাড়ানোর কারণে দেশে উৎপাদিত সিলিন্ডার বোতলের দাম বাড়বে এমন আশঙ্কা আগেই করা হচ্ছিল। বাজেটে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার উৎপাদন পর্যায় মূল্যের ওপর পাঁচ শতাংশ ভ্যাট, এলপিজি আমদানি পর্যায়ে পাঁচ শতাংশ আগাম কর ও সিলিন্ডার তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে পাঁচ শতাংশ আগাম কর আরোপ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ : বিইআরসির নতুন নির্ধারিত গ্যাসমূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসে প্রতি ঘনমিটারে বাড়ানো হয়েছে ৪.৪৫ টাকা ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে বাড়ানো হয়েছে ১৩.৮৪ টাকা। এতে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ।

স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলে, এর ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং গ্রাহক পর্যায়েও বাড়বে বিদ্যুতের দাম। তবে বিইআরসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হবে না।

পরিবহন : বিইআরসি পরিবহনে ব্যবহৃত সিএনজিতে প্রতি ঘনফুটে মূল বাড়িয়েছে ৭.৫ শতাংশ। নতুন এ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে। বেড়ে যাবে পরিবহন ব্যয়। এরই মধ্যে পরিবহনের ভাড়া বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোয় গণপরিবহনে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এর আগে গ্যাসের দাম বাড়লেও গণপরিবহনে ভাড়া বাড়েনি। ব্যয় সামঞ্জস্যের জন্য এবার ভাড়া বাড়ানো হতে পারে।

সাধারণ যাত্রীরা বলছেন, বাংলাদেশে পরিবহনের ভাড়া নিয়ে এমনিতেই নৈরাজ্য রয়েছে। কয়েকগুণ বাড়তি ভাড়া আদায় করেন পরিবহন মালিকরা। এ অবস্থায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে আবারো বাড়ানো হবে গণপরিবহন ভাড়া।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাস, মিনিবাস, সিএনজি অটোরিকশাসহ সব ধরনের যানবাহনের ভাড়া পুনঃনির্ধারণ করতে সরকারের কাছে দাবি তুলে ধরতে চায় পরিবহন খাতের মালিক ও শ্রমিকরা। এ নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন তারা।

নিত্যপণ্য : শিল্পখাতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। এর ফলে শিল্পকারখানার পরিচালনা ব্যয় বাড়ছে। এতে ক্ষুদ্র বা মাঝারি পণ্য উৎপাদন কারখানাগুলোর ব্যয় বাড়বে। ফলে কারখানার পণ্যের দামও বৃদ্ধি পেতে পারে। খরচ পোষাতে না পারলে অনেক কারখানা বন্ধও হয়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা করছেন কেউ কেউ। এতে কর্মহারা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির শঙ্কাও রয়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments