আওয়ামী লীগ-বিএনপি প্রস্তুত

77

দেশবার্তা ঢাকাঃ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তফসিল ঘোষণা হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে রাজনীতির মাঠের এই প্রধান দুই দলই। তফসিল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মাথায় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে দলীয় মনোনয়নের আবেদন ফরম বিতরণ ও জমাদান কার্যক্রমের সময়সূচি ঘোষণা করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলীয় মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করতে ২৮ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকও ডেকেছে দলটি। বিএনপির এই কার্যক্রমও শুরু হচ্ছে দু-একদিনের  মধ্যেই। তফসিল ঘোষণা মাত্র নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরদার করেছে দলটি।

প্রধান দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতাও আরও জোরদার হয়েছে। দলীয় মনোনয়ন পেতে আগে থেকেই তৎপর মনোনয়নপ্রত্যাশীরা আরও জোরেশোরে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নানাভাবে লবিং-তদবিরের পাশাপাশি দলীয় মনোনয়নের আশায় প্রভাবশালী ও নীতিনির্ধারক নেতাদের নজরে আসার চেষ্টা করছেন। রাজধানীজুড়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টার চোখে পড়ছে।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীরাও সমানতালে তৎপরতা চালাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন দুই সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দু-একদিনের মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা আরও জোরদার হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার জন্য সময় আছে আট দিন। তাই এ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলো আজকালের মধ্যে এ তৎপরতায় নামবে বলে মনে করা হচ্ছে।

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে উত্তরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আনিসুল হক এবং দক্ষিণে একই দল সমর্থিত মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। আনিসুল হকের মৃত্যুতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আতিকুল ইসলাম বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন। আগামী ৩০ জানুয়ারি দুই সিটিতেই মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে ভোট হবে। তবে দুই সিটির ১২৯টি সাধারণ এবং ৪৩টি সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীদের ভোট হবে নির্দলীয় প্রতীকে।

আওয়ামী লীগ :সদ্যসমাপ্ত ২১তম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত আওয়ামী লীগের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির সামনে প্রথম নির্বাচনী চ্যালেঞ্জই হচ্ছে রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রাজধানী ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়া। এই দুই সিটির বর্তমান মেয়র আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত। আগামী নির্বাচনেও এই জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে চায় দলটি। বিশেষ করে এবারের নির্বাচন দলীয় প্রতীক ও ইভিএমে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে ভোটের মাঠে জিতে আসাটাকে রীতিমতো মর্যাদার বিষয় হিসেবে নিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা।

তবে আওয়ামী লীগের এই নির্বাচনী প্রস্তুতি বেশ আগে থেকেই চলে আসছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে দলীয় তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়। গতকাল বিকেলে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী বাছাই কার্যক্রমও শুরু করা হয়। আগামীকাল মঙ্গলবার দলের নবনির্বাচিত সভাপতিমণ্ডলীর বৈঠকে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ হওয়ার কথা রয়েছে। এর পর দিন বুধবার থেকেই দলীয় সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দুই সিটির মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে দলীয় মনোনয়নের ফরম বিতরণ শুরু হবে। আগামী শুক্রবার পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে ফরম সংগ্রহ ও জমা দেওয়া যাবে। এরপর দলীয় মেয়র প্রার্থী ঠিক করতে ২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় গণভবনে বৈঠকে বসবে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ওই বৈঠক থেকেই জানিয়ে দেওয়া হবে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী কারা হচ্ছেন।

দলীয় সূত্র বলছে, মঙ্গলবারের সভাপতিমণ্ডলীর বৈঠকেও দুই সিটি নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা ও কৌশল নির্ধারণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকও ডাকা হতে পারে। সেক্ষেত্রে গতবারের মতো এবারও দুই সিটিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে শক্তিশালী নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে। আর দলের বিজয় নিশ্চিত করতে মেয়র পদে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জনপ্রিয় মুখ এবং ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বর্তমান দুই মেয়রের কার্যক্রম ও দক্ষতাকেও বিবেচনায় আনা হবে। প্রার্থী বাছাইয়ে শেখ হাসিনার উদ্যোগে আগে থেকেই জরিপ চালানো হচ্ছে।

দুই সিটিতে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে অন্তত অর্ধডজন প্রার্থীর তৎপরতা চোখে পড়ছে। তাদের মধ্যে বর্তমান দুই মেয়র ছাড়াও দলে কেন্দ্রীয় ও মহানগরের কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি দলসমর্থক বিভিন্ন পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী নেতার কেউ কেউ মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পেতে তৎপর রয়েছেন। সম্ভাব্য এসব প্রার্থীর কারও কারও পক্ষে নগরজুড়ে পোস্টার ও ব্যানার লাগানো হয়েছে।

ঢাকা উত্তরের বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলামের ওপর আস্থা রয়েছে আওয়ামী লীগের। মাত্র ১০ মাসেই কাজ দিয়ে তিনি আস্থা কুড়িয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকদের। তাকে আরও এক মেয়াদে সময় দেওয়ার পক্ষপাতী ক্ষমতাসীন দলটির অনেক নেতা। তাই ভোটের লড়াইয়ে আবারও আতিকই হতে পারেন নৌকার মাঝি। তবে উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় দলের আরও দুই কেন্দ্রীয় নেতার নামও রয়েছে। আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সদ্যসাবেক কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এ ছাড়া হক গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদম তমিজি হকও ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন চাইবেন।

বর্তমান মেয়র ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সদ্যসাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ সাঈদ খোকন আবারও দলের মনোনয়ন চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার সঙ্গে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আরও দু’জন নেতার নামও আলোচনায় রয়েছে। তারা হচ্ছেন- আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাজী নজিবউল্লাহ হিরু এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি সাবেক এমপি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান সমকালকে বলেন, তফসিল ঘোষণার পরপরই আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আগ্রহী প্রার্থীদের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই শেষে জনগণের মধ্যে গ্রহণযোগ্য স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ও দক্ষদেরই প্রার্থী করা হবে। আর গত নির্বাচনের বিজয়ের ধারা ধরে রাখতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবেন তারা।

বিএনপি :ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণে ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে বিএনপির। দীর্ঘদিন ধরেই দলের তৃণমূল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে শক্ত জনমত তৈরিতে কাজ করা হচ্ছে। গতকাল তফসিল ঘোষণার পর দলীয় প্রস্তুতি আরও জোরদার হয়েছে। তবে সুষ্ঠুভাবে ভোট হবে কিনা তা নিয়ে আশঙ্কাও রয়েছে দলটির। সাধারণ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে জয়ের ব্যাপারেও আশাবাদী দলটির শীর্ষ নেতারা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন সরকার এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। তবে পরে সিদ্ধান্ত বদলে জাতীয় সংসদের উপনির্বাচন এবং সর্বশেষ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও অংশ নিচ্ছে দলটি। এমন প্রেক্ষাপটে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত বলে জানা গেছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে এবারও বিএনপির প্রার্থী অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানায়। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে ও দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়ালের মনোনয়ন নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা সিটি উত্তরের ভোটে অংশ নিয়েছিলেন তাবিথ আউয়াল। ওই নির্বাচনে নতুন মুখ হিসেবে উত্তরের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন তিনি। বিএনপি শেষ মুহূর্তে নির্বাচন বর্জন করলেও তাবিথ আউয়াল কয়েক লাখ ভোট পান। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে নতুন ও অপেক্ষাকৃত তরুণ কোনো নেতাকে প্রার্থী করার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান ও অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। ইশরাক একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলের প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু তার আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত অন্য দলের প্রার্থী দেওয়ায় তিনি আর নির্বাচনে অংশ নেননি।

দলীয় সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে দলের তরুণ এই দুই প্রার্থীকে হাইকমান্ড থেকে সবুজ সংকেতও দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির সম্ভাব্য দুই প্রার্থী গত এক বছরের বেশি সময় ধরে নির্বাচনী এলাকায় নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রায় প্রতিদিনই এলাকায় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে উঠান বৈঠক, সভা-সমাবেশ করে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন।

দলের সম্ভ্যাব্য প্রার্থী তালিকায় আরও রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও অবিভক্ত ঢাকার সাবেক ডেপুটি মেয়র আবদুস সালাম, দলের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেল, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস। অন্যদিকে, ২০ দলীয় জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির-এলডিপির (একাংশ) সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেন সেলিমও জোটের কাছে মনোনয়ন চাইবেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, তারা সিটিসহ অন্যান্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা করছেন। তবে প্রার্থীর ব্যাপারে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। দলীয় ফোরামে আলোচনা করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রার্থীর ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

Facebook Comments