আতঙ্ক উদ্বেগ উৎকণ্ঠা

315

আলোকিত সকাল ডেস্ক

শিশু ধর্ষণ, হত্যা-নির্যাতন চরম রূপ নিয়েছে। শিশুর প্রতি এই বিকৃত-ঘৃণ্য মানসিকতার চরম বহিঃপ্রকাশ সম্প্রতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে কন্যাশিশুরা সবচেয়ে বেশি এই বিকৃত লালসার শিকার হচ্ছে। এ কারণে কন্যাশিশু থাকা পরিবারের বাবা-মাসহ স্বজনরা এখন চরম আতঙ্কে সময় পার করছেন। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও একাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এমনকি ধর্ষণের পর ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে নিষ্পাপ শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। এসব মর্মান্তিক খবরে প্রতিনিয়তই বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। ধর্ষকদের শাস্তি চেয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও রাজপথে আন্দোলন করছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার ও সামাজিক পর্যায়ে আরও বেশি সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি মানুষকে জ্ঞানদান করতে হবে। পুলিশ সদর দফতর বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে নারী-শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন বেড়ে যাওয়ায় সারা দেশে আরও কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে। এসব বিষয়ে সব জেলা পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে সদর দফতর।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সোমবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেÑ বিগত ছয় মাসে সারা দেশে ২০৮৩ নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই ছয় মাসে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১৩ জন এবং ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৩১ জন। অন্যদিকে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম জানিয়েছে, ছয় মাসে সারা দেশে ৪৯৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

মধ্য বাড্ডার একটি কোচিং সেন্টারে গৃহবধূ আঁখি সুলতানা সোমবার বিকালে তার কন্যাশিশু আরশিকে প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে নিয়ে যান। মেয়েকে শিক্ষকের কাছে রেখে তিনি বাইরেই অপেক্ষায় ছিলেন। এ সময় কথা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, মেয়েকে এখন আর কোথাও নিরাপদ ভাবতে পারছি না। চরম উৎকণ্ঠায় আছি।

পল্টনের বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার মেয়ে স্নেহা নবম শ্রেণির ছাত্রী। সাম্প্রতিক ওইসব বিকৃত ও ঘৃণ্য ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে চরম আতঙ্কে সময় পারছি। এই সমাজে শিশুকন্যারা বর্তমান সময়ে খুবই নিরাপত্তাহীন অবস্থা পার করছে। এ ব্যাপারে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের কঠিন শাস্তির আওতায় আনতে হবে এবং সেই শাস্তি প্রকাশ্যেই দিতে হবে।

জানা যায়, সর্বশেষ ৫ জুলাই রাজধানীর ওয়ারীর একটি বাসায় এমনই একটি মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার হয় সাত বছর বয়সি ছোট্ট ফুটফুটে শিশু সামিয়া আফরিন সায়মা। সারা দেশে আলোচিত হওয়া এই ঘটনায় এরই মধ্যে ধর্ষক ও খুনি যুবক হারুন অর রশিদকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এর আগে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গাড়ির ভেতরে জুতা তৈরির কারখানার এক নারী শ্রমিককে ধর্ষণের পর রাস্তায় ছুড়ে ফেলে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় একজন ধর্ষণ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে। বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের ঘটনা যেমন ঘটছে তেমনি গ্রেফতারও হচ্ছে। তবুও থামছে না শিশুর প্রতি এই বিকৃত সহিংসতা।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা সময়ের আলোকে বলেন, এ লক্ষ্যে চিহ্নিত ও দাগী আসামিদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধিসহ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে আরও গতিশীল হতে সারা দেশে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পলাতক ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেফতারে আরও বেশি তৎপর হতেও বলা হয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণ রোধে পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে জনগণকে সচেতন করতে এবং নজরদারি বাড়াতে প্রয়োজনীয় কার্যকরী বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সব জেলা পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।

‘আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক)’ সিনিয়র সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির (ফরিদ) সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমানে নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। এখানে সমাজের এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অপরাধ প্রতিরোধে শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য সরকারকেও আন্তরিকভাবে এগিয়ে যেতে হবে।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, এ ধরনের অপরাধ বাড়ার কারণগুলোর মধ্যে বিদেশি সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব, সমাজে আস্থাহীনতা, বিচারহীনতা, মূল্যবোধের অভাব, পারিবারিক দূরত্ব, অসচেতনতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকাসহ আরও নানা কারণে এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ জাতীয় অপরাধের ক্ষেত্রে খুব স্বল্প সময়ে তথা দ্রæত বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেও অপরাধ কমে আসবে। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার প্রবণতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

সমাজ বিশ্লেষকরা বলেছেন, বর্তমানে শিশু ধর্ষণ-নির্যাতনের ঘটনা খুবই উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে। অন্যদিকে ধর্ষণের মতো অপরাধের সঙ্গে শিক্ষকদের জড়ানোর বিষয়টি খুবই লজ্জাজনক। শিক্ষকরা যদি এমন অপকর্ম করে, তাহলে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে। ধর্ম, শিক্ষা, রাজনীতি, সংস্কৃতি কোনো কিছুই এসব অপকর্মকে রুখতে পারছে না। এ নিয়ে সবাইকে আরও সোচ্চার হতে হবে। গণমাধ্যমকে আরও এগিয়ে আসতে হবে।

আলোকিত সকাল/এসআইসু

Facebook Comments