আড়ালেই থাকছে গডফাদাররা

213

আলোকিত সকাল ডেস্ক

মৌমাছির চাক অটুট রেখেই চারপাশে ছোটাছুটি করা কয়েকশ মৌমাছি মেরে ফেললেও- তাতে ভয় পায় না রানি মৌমাছিরা। স্বাভাবিকভাবেই কাজ চালিয়ে যায় তারা। এ দৃশ্য কারোরই অজানা নয়। তেমনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ক্রসফায়ারের মাধ্যমেও আড়ালে থেকে যাচ্ছে অপরাধীদের গডফাদাররা।

ক্রসফায়ারের মাধ্যমে গডফাদারদের পোষ্য অপরাধীদের মেরে ফেললেও তাতে ভাটা পড়ে না- সেসব গডফাদারদের দুর্গে। হাজারো অপরাধী সৃষ্টির নেপথ্যে থাকা গডফাদাররা এক নয়ন বন্ডের অবর্তমানে আরেক নয়ন বন্ডকে জড়াচ্ছে তাদের অপরাধ দুর্গ পরিচালনায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতাধরদের ওতপ্রোততার কারণে আদালতের আগেই, আগ বাড়িয়ে ঠিক করে দিচ্ছে কে অপরাধী আর কে অপরাধী নয়।

যদিও এ কাণ্ডে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলছে- আমরা এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং (বিচারবহির্ভূত হত্যা) পছন্দ করি না।

কার্যত আদৌ এসব বিচার বহির্ভূত হত্যা বন্ধ হয়নি বরং বিএনপি সরকার আমলেই জনপ্রিয় করা এ হত্যার প্রথা চালু হয়ে আজও চলমান।

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে- হত্যাও যেন একটা নেশায় পরিণত হয়েছে। আর দেশের আমজনতাও যেকোনো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় হই হই করে ক্রসফায়ারের দাবি তোলে।

যে দাবির কারণে দেশে আজ হাজির হয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যার আরেক নায়ক ‘হারকিউলিস’। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, কমপক্ষে তিনজনকে হত্যা করে গলায় ‘ধর্ষক’ লেখা কাগজ ঝুলিয়ে দেয় এই হারকিউলিস।

অথচ যে হাত খুন করে, সে রক্তাক্ত হাত আরও অধিক খুনেও অভ্যস্ত হয়ে যায়। তাদের থামাবে কে?নুসরাত থেকে রিফাত অধিকাংশ ঘটনায়ই খুনিদের সম্পর্ক মাদক ও মাফিয়ার সঙ্গে। খুনিদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতা ও থানা-পুলিশের গভীর সম্পর্ক।

এক খুনির হাত থেকে বাঁচতে অসাধু নেতা ও বিপথগামী বন্দুকধারীদের হাতে খুন-খারাবির অধিকার তুলে দেয়া হচ্ছে— এমনটাই দাবি দেশের সচেতন মহলের।

যে দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতিতন্ত্র সব সমস্যার মূলে তার সমাধান করতে হলে আইন-প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও কার্যকর করতে পারে একমাত্র জোরদার নাগরিক নজরদারি এবং ঐক্যবদ্ধ জনতা।

অথচ বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে গোটা দেশের জনতাই দাবি তুলেছিল ক্রসফায়ারের। যেখানে দেশের আমজনতাই ক্রসফায়ারের দাবি তুলছে সেখানে আইন-প্রশাসন নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা পালনে সোচ্চার করার কাজটি করবে কে?

যারা আজ রিফাত হত্যাকারীদের ক্রসফায়ার চেয়েছিল তারা কি জানে খুনি নয়ন বন্ডের উত্থান কাদের হাতে? কারা নয়ন বন্ডের পরিচালক। বন্ড বাহিনীর জোগানদাতা।

না জেনেই আজ অহেতুক দাবি আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যার সমর্থন করায় আরও অধিক উৎসাহী করা হচ্ছে তা ভাবছেই না কেউ।

জনতা এও ভাবছে না- ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা দেলোয়ারের ভায়রাপুত্র রিফাত ফরাজীকে কেন ক্রসফায়ার দেয়া হলো না?

বিচারের দাবিতে- রিফাত ফরাজীরও ক্রসফায়ার চাওয়া হয়েছিল।

তবে নয়ন বন্ডকেই ক্রসফায়ারে দিয়ে ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল রহস্য কেন উদঘাটন করা হলো না- এমন প্রশ্ন এবং দাবি না করাতেই ক্রসফায়ারের ঘটনা বেড়েই চলেছে দিনে দিনে।

জিডি-মামলা কিংবা থানায় মৌখিক কোনো অভিযোগ না থাকলেও মাদকের সংশ্লিষ্টতা দেখিয়ে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে কুমিল্লার প্রশান্তকে।

কুমিল্লার বিজিবি সদস্যরা বলছে- প্রশান্তের কাছ থেকে ইয়াবা পাওয়া গেছে। প্রশান্ত মাদক কারবারি।

কিন্তু সংশ্লিষ্ট থানায় (কুমিল্লা কোতোয়ালি) খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রশান্তের বিরুদ্ধে থানায় কোনো অভিযোগই নেই। এমনকি সে মাদক কারবারি এরকম কোনো তথ্যও পুলিশের কাছে নেই। অথচ প্রশান্ত ক্রসফায়ার নামক বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার।

এতটা আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে এ হত্যাণ্ড যেখানে নিরপরাধ ছেলে হত্যার বিচার চাইবেন, সেখানে বাকি ছেলেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিচার প্রাপ্তির আশাও করছেন না প্রশান্তের বাবা। ঠাকুরের বিচারের আশায় বুক বেঁধেছেন তিনি।

বিচারের আগেই যেখানে শাস্তি হয়ে যাচ্ছে, সেখানে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

কে অপরাধী আর কে অপরাধী নয়- তা আদালত ঠিক করার আগেই যদি নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতাধররা তা ঠিক করে দেয় তাহলে এর নাম হওয়া উচিত ‘ইচ্ছাখুন’।

যারা এসব করছেন তাদের দৃষ্টিতে কিছু মানুষের আর বেঁচে থাকার অধিকার নেই।

ক্রসফায়ারপন্থি উদাসীন জনতা এটা দেখছে না দেশে ক্রসফায়ার যত বাড়ছে, হত্যা-খুন-ধর্ষণ ও দুর্নীতিও তত বাড়ছে! ক্রসফায়ার বেশ কবছর ধরেই চলছে।

কিন্তু অপরাধ কি কমেছে? ক্রসফায়ার- মানুষের হাতে মানুষের খুনকে স্বাভাবিক করে তুলছে, মানুষকে জীবন নেয়ায় অভ্যস্ত করে তুলেছে, তা ঘুণাক্ষরেও ভেবে দেখছে না উদাসীন আমজনতা।

ক্রসফায়ার- রক্তপিপাসু করে তুলছে গোটা জাতিকে, যে জাতির এক সন্তান চাপাতি-রামদা দিয়ে খুন করবে আর তার বদলা হিসেবে আরেক সন্তান বন্দুক দিয়ে গুলি করে তাদের মারবে, চোখের বদলে চোখ নেয়ার নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেই কারো।

ভুল রাস্তায় জোর কদমে হাঁটাহাঁটি করলে শক্তি খরচ ছাড়া আর কিছু হয় না। গত বছরের মাঝামাঝি মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্সের নামে সরকার ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শুরু করে।

যুদ্ধের প্রথম ১৩ দিনে ৯১টি লাশও পড়ে। এর মধ্যে টেকনাফের কাউন্সিলর একরামও নিহত হলেন। কার্যত এ যুদ্ধে এত প্রাণহানীর পরও মাদক ব্যবসা কি কমেছে?

গতকাল আদালতে বরগুনায় রিফাত শরীফকে কলেজের সামনে রাস্তায় প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলার আসামি গ্রেপ্তারের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের বিষয়ে শুনানিতে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড পছন্দ করি না।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতে জানান, এ মামলার কোনো আসামি দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে পারেনি।

এরই মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচজন আসামি এবং সন্দেহভাজন আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে।

অন্য আসামিদের ধরতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আসামিদের ধরতে শত শত পুলিশ-র্যাব মাঠে কাজ করছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আসামি ধরতে অভিযান চালানোর সময় পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালালে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি করতে বাধ্য হয়।

পরে গোলাগুলি থেমে গেলে পুলিশ সেখান থেকে নয়ন বন্ডের লাশ শনাক্ত করে। এসময় আদালত বলেন, আমরা এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং (বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড) পছন্দ করি না। আর একদিনেই এ নয়ন বন্ড তৈরি হয়নি। নেপথ্যে থেকে তাকে লালন করা হয়েছে।

ক্রিমিনাল বানানো হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ইঙ্গিত করে আদালত আরও বলেন, এগুলো প্রশাসনের বিষয়। সরকার কিছু করলে তা জনগণ দেখবে। এগুলো আদালতের দেখার বিষয় নয়।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে বলেছে, গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ২০৪ জন নিহত হয়েছে।

সংস্থাটি আরও বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাগুলোর প্রায় একইরকম বর্ণনা তুলে ধরে।

মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেছেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকেই একটা সমাধান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে বলে এখন তাদের মনে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বন্দুকযুদ্ধ নামে যেটা শুনি, সেটা কখনো ক্রসফায়ার, কখনো এনকাউন্টার ইত্যাদি নামে শুনেছি।

এই ইত্যাদি নামে এটিকে তারা জনসাধারণের কাছে একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে দিয়েছেন এই বলে যে, অভিযুক্তদের এছাড়া আর কোনোভাবে দমন করা যাবে না।

আস/এসআইসু

Facebook Comments