এখন ধর্ষণ যেন মামুলি অপরাধ

210

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ধর্ষণ, ধর্ষক, ধর্ষণের শিকার কিংবা ধর্ষিতা! ভয়ংকর এই শব্দগুলো শুনতে শুনতে আর এ ধরনের খবর গণমাধ্যমে পড়তে পড়তে গোটা জাতির কানের পর্দা আজ শক্ত হয়ে গেছে। পুরু হয়ে গেছে চোখের পর্দা। একটি দিনও বাদ যায় না, যেদিন ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি কিংবা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি।

ধর্ষণের ঘটনায় দেশের মানুষ আজ এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, এই ঘৃণ্য অপরাধের কথা শুনলে এখন আর কেউ বিচলিতও হয় না। উন্নয়নের মহাসড়কে তীব্রগতিতে ছুটে চলা বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার নারী আর কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।

এই তো চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের ঘটনাবলি থেকে দেখা যাচ্ছে, মোট ২০৮৩টি নির্যাতনের ঘটনায় ধর্ষণেরই শিকার হয়েছেন ৭৩১ জন, গণধর্ষণের শিকার ১১৩ জন, হত্যার শিকার ২৭৬ জন। যাদের সবাই নারী ও শিশু। ধর্ষণ-গণধর্ষণে মৃত্যু কত সহজ এ দেশে! সহজ মৃত্যুর পরিবেশে ধর্ষণ যেন আরেক মামুলি অপরাধ!

এ যেন নষ্ট হয়ে যাওয়া ক্ষুধার্ত পুরুষের এক ধরনের বিলাসী আহার! এদের থামানোর কেউ নেই। কোনো একদিন ওদের সর্বগ্রাসী এ ক্ষুধাই গ্রাস করবে সমগ্র বাংলাদেশকে, এমন শঙ্কায় সমাজের বিশিষ্টজনরা। দেশের সচেতন মহলের শঙ্কা- অচিরেই বিশ্বের বুকে ধর্ষণের দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে বাংলাদেশ এবং সেই দিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয়।

গেলো মে মাসে শাহিনুর আক্তারকে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। যিনি পেশায় একজন নার্স। অসুস্থ মানুষকে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলাই ছিল তার পেশা। তিনি কাজ করতেন ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। মৃত্যুপথযাত্রী কত রোগীকে মৃত্যুর মুখ থেকে প্রতিনিয়ত ফিরিয়ে নিয়ে আসেন শাহিনুররা।

অথচ শাহিনুররা প্রতিদান স্বরূপ ওতপেতে থাকা নরকের কীটদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। শুধু ধর্ষণ করেই তারা ক্ষান্ত হয় না, তারা শাহিনুরদের মাথা থেঁতলে দেয়, তারপর পৈশাচিক উল্লাসে ধর্ষণের শিকার দেহ ছুড়ে ফেলে দেয় ঝোপ-জঙ্গলে কিংবা মহাসড়কের ঢালে। রূপাকেও ওরা তা-ই করেছিল।

ধর্ষিত রূপার থেঁতলানো দেহটিও পাওয়া গিয়েছিল শালবনের নিকষ কালো অন্ধকারে। শাহিনুর যখন ধর্ষণের শিকার হচ্ছিলেন বা মারা যাচ্ছিলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন, কী তার অপরাধ? সমাজকে সেবা করার বিনিময়ে তিনি কী পেলেন? তার বিপদে কেউ কি এগিয়ে আসবে? কেউ কি বাঁচাবে তাকে? শাহিনুরের এই প্রশ্নগুলো চারদিকে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এসেছে। কেউ এগিয়ে আসেনি তাকে বাঁচাতে।

‘গণ’ শব্দটি সম্মিলিত শক্তির অস্তিত্বকেই জানান দেয়। গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, গণসংযোগ, গণসংগীত, গণনাটক এই শব্দগুলো মনের মধ্যে এক ধরনের উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একাত্তর, উনসত্তর, নব্বই কিংবা শহীদ মিনারের বেদিতে জাগ্রত জনতার সম্মিলিত স্লোগান, গান কিংবা নাটকের মঞ্চায়ন। কিন্তু এই শব্দটিই কদাকার ও ঘৃণ্য হয়ে ওঠে, যখন তা ‘ধর্ষণ’ শব্দটির সঙ্গে যুক্ত হয়।

কোথায় গেলে নিরাপত্তা পাবে নারীরা? নিজের ঘরে, রাস্তাঘাটে, স্কুল-কলেজে, মাদ্রাসায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে, গণপরিবহনে, রাইড শেয়ারে, কর্মস্থলে, হাসপাতালে, একুশের প্রভাতফেরিতে, নাকি মঙ্গল শোভাযাত্রায়? কোথাও নেই শান্তি, নিরাপত্তা নেই এতটুকু।

লিফটেও একা চড়তে ভয় হয়। ভয় হয় ফ্যাশান হাউসের ট্রায়াল রুমে ঢুকতে কিংবা অচেনা প্রক্ষালন কক্ষে। গণপরিবহনে তো বটেই, ব্যক্তিগত গাড়িতেও একা ড্রাইভারের সঙ্গে চলতে ভয় হয় আজ।

প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমক্ষেই যে দেশে নারীরা নিগৃহীত হন, সে দেশে কোনো মেয়ে রাতের আঁধারে একা চললে ধর্ষণের শিকার হবেন, এটাই যেন স্বাভাবিক। সর্বদাই ধর্ষণের শিকার আর অপমানিত হওয়ার ভয় কুরে কুরে খায় নারীদের। বিচারহীনতাই যে দেশের সংস্কৃতি, সেখানে বিচার চাওয়াও যেন এক ধরনের অপরাধ।

নুসরাত সেই অপরাধেরই মাশুল দিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে। এ দেশে দুই-তৃতীয়াংশ নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার, ৯৪ শতাংশ নারী গণপরিবহনে আর ৪০ শতাংশ নারী পোশাকশ্রমিক কারখানার ভেতরে-বাইরে যৌনহয়রানির শিকার হন।

সহিংসতার শিকার প্রায় ৯৭ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ— আদালতে শুনানির পর্যায়েই যায় না বা গেলেও বাতিল হয়ে যায়। দেশের অধিকাংশ নারী ও পুরুষ এখনো জানেন না যৌননির্যাতনের সঠিক সংজ্ঞা। সংজ্ঞাটি জানলে যৌন সহিংসতার শিকার বলে গণ্য হওয়া নারীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে বলে মনে করেন অনেকেই।

প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন নারী কিংবা কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। ছেলে শিশুরাও বলাৎকারের শিকার হচ্ছে। ধর্ষণের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ধর্ষকদের নিজেদের ঘর সুরক্ষিত থাকবে তো! হয়তো তাতে কিছুই আসে যায় না সেসব কাপুরুষদের। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মকর্তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকলে এবং গা ঝাড়া দিয়ে জেগে না উঠলে ভয়ানক রূপ দেখতে হবে আপনাদেরও।

অনেকেরই দাবি, হারকিউলিস বা এ ধরনের নাম দিয়ে রাতের আঁধারে ধর্ষকদের মারার অভিযানে না নেমে বরং সবার সামনে আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নরপশুগুলোর বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিতে জোর দাবিও জানান অনেকে।

অন্যথায় নিজেদের মোটেই নিরাপদ বলে মনে করবেন না। কারণ নেকড়েদের ক্ষুধার্ত দৃষ্টি থেকে রেহাই পাবে না আপনার ঘরের নারী কিংবা কন্যাশিশুটিও। এছাড়া প্রতিমুহূর্তে নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন আর ধর্ষণের দায় নিয়ে কখনো কি ওঠা যায় উন্নয়নের মহাসড়কে এমন প্রশ্নেও মত্ত রয়েছেন দেশের সচেতন মহল।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের মতে, নারী ও শিশুদের উত্ত্যক্তকরণ ও যৌনহয়রানি, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েই চলছে। এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত দুই হাজার ৮৩ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১৩ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৬ জনকে।

এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১২৩ জনকে, বিভিন্ন কারণে একই সময়ে ২৭৬ জন নারী ও মেয়ে শিশুকে হত্যা করা হয়েছে ও হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ১০ জনকে।

শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন ৫৪ জন নারী ও শিশু। যৌননির্যাতনের শিকার হয়েছে ৭০ জন। আর এ সময়ে মারধরের শিকার হয়েছেন ১৪৭ জন। যৌতুকের কারণেও বড় সংখ্যক নারী নির্যাতনের শিকার হয় বলে জানায় সংস্থাটি।

তাদের দেয়া তথ্য বলছে, যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৯৪ জন। এর মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ৪৭ জনকে। এসব নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনায় মাত্র তিন থেকে চার শতাংশ মামলায় সাজা হয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

সংস্থার সভাপতি আয়শা খানম বলেন, অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্ষণ আইনের সংশোধন ও সংস্কার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি দ্রুত বিচারের মাধ্যমে অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে এ ধরনের অপরাধ থেকে অন্যরা দূরে থাকে। তবে এ জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

আলোকিত সকাল/এসআইসু

Facebook Comments