এরশাদ যবনিকাপাত

271

আলোকিত সকাল ডেস্ক

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত ব্যক্তি, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মারা গেছেন। গতকাল রোববার সকাল পৌনে ৮টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইতি ঘটলো এমন এক অধ্যায়ের, যে অধ্যায়ে একইসঙ্গে একজন ‘পতিত স্বৈরশাসক’ এবং রাজনীতির ময়দানে টিকে থাকে একজন ‘সফল রাজনীতিবিদকে’ দেখতে পেয়েছেন দেশের মানুষ।

যদিও রাজনৈতিক ময়দানে বড় অংশটি তাকে ‘সামরিক স্বৈরাচার’, ‘গণতন্ত্র হরণকারী’, ‘সংবিধান বিনষ্টকারী’, ‘খুনী’, ‘সাম্প্রদায়িক’ ও ‘চরম দুর্বৃত্তপরায়ন’ এক রাষ্ট্রশাসক হিসেবে অভিধায়িত করেন। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে এরশাদ একাধারে কলুষিত করেছিলেন দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে। গণ আন্দোলনের মুখে বিতাড়িত দীর্ঘ নয় বছরের সেনাশাসক ফের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছেন এবং আবির্ভূত হয়েছেন কেবল দেশের রাজনীতির দেওয়লিয়াপনার কারণে।

রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর যে পাকিস্তানপন্থী সাম্প্রদায়িক ভাবধারা পুনরোজ্জীবন লাভ করেছিল তারই পথ ধরে জন্ম হয়েছিল স্বৈরাচারী শাসক এরশাদের। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরশাদই একমাত্র ব্যক্তি যার নামের সঙ্গে ‘স্বৈরাচার’ শব্দটি এঁটে আছে। বিশ্বে তিনিই একমাত্র সামরিক স্বৈরশাসক যিনি গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও রাজনীতিতে টিকে ছিলেন শেষাবধি। ১৯৮২ সালে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে বাংলাদেশে নেতিবাচক অনেক ধারা সৃষ্টির জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত এরশাদ। কিংবদন্তি শিল্পী পটুয়া কামরুল হাসান তার তুলিতে এরশাদকে এঁকেছিলেন ‘বিশ্ব বেহায়া’ হিসেবে। অথচ সেই এরশাদই তার সমর্থকদের কাছে ছিলেন ‘নায়ক’, ‘পল্লীবন্ধু’।

ক্ষমতাকালীন গুলি-টিয়ার, লাঠি দিয়ে আন্দোলন দমানো, প্রকাশ্যে গুলি করে রাজনৈতিক কর্মী হত্যা, সমাবেশে ট্রাক তুলে দেওয়া, বিপুল রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন, রাষ্ট্রের চরম সাম্প্রদায়িকীকরণ, আর্থিক কেলেঙ্কারি, নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার মাধ্যমে এরশাদ হয়ে উঠেছিলেন রাজনীতির সবচেয়ে সমালোচিত শাসক। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাজনীতিতে একের পর এক ‘ডিগবাজি’র মধ্য দিয়ে তিনিই আবার হয়ে উঠেছিলেন ‘আনপ্রেডিক্টেবল ম্যান’।

বেশ কিছুদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন এরশাদ। গত ২৭ জুন সকালে অসুস্থবোধ করলে সিএমএইচে ভর্তি করা হয় তাকে। তিনি রক্তে হিমোগ্লোবিন-স্বল্পতা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন। এ জন্য তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।

আজ (১৪ জুলাই) এরশাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তার আত্মীয় ও জাতীয় পার্টির (জাপা) সভাপতিম-লীর সদস্য খালেদ আখতার। এ ছাড়া আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) থেকেও তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। আইএসপিআরের সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম খান জানান, রোববার সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে এরশাদ মারা যান। তার মৃত্যুতে শোক নেমে আসে তার দল জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের মধ্যে। মৃত্যুর খবর শুনেই হাসপাতালে ছুটে যান পরিবারের সদস্য ও দলীয় নেতাকর্মীরা। তার রুহের মাগফিরাত কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তার স্ত্রী ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ। ছেলে এরিক এরশাদও বাবার জন্য দোয়া চেয়েছেন। এরশাদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও শোক প্রকাশ করেছেন এরশাদের মৃত্যুতে।

জোহর নামাজের পর সেনা কেন্দ্রীয় মসজিদে এরশাদের প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। আগামীকাল মঙ্গলবার সামরিক কবরস্থানে তাকে দাফনের কথা রয়েছে।

ক্ষমতাকালীন এরশাদের বেশকিছু রাজনৈতিক অপকর্ম সম্পর্কে জানাতে গিয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মীরা বলেছেন, রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। এরপর থেকে সামরিক আইন জারি করে দেশের রাজনীতিসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে গণবিরোধী ধারার কার্যক্রম চালাতে থাকেন তিনি। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণ করে পাকিস্তানি ভাবধারাকেই পূর্ণপ্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন এরশাদ। তিনি কাটাছেঁড়া করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িকীকরণ করলেন ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ঘোষণা করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন বাগাতে রোববারের পরিবর্তে শুক্রবার ছুটির প্রচলন করেন। তার শাসনের বিরোধিতা করলে বা আকারে ইঙ্গিতে সমালোচনা করলে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান করেন তিনি। এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম দিন থেকেই প্রতিবাদ করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। ১৯৮২ সালের ২৬ মার্চের স্বাধীনতা দিবসে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতারা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে গিয়ে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলে সাভার সেনানিবাস থেকে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয় ছাত্রদের। ওই বছরের ৮ নভেম্বর মধুর ক্যান্টিনে ১৪টি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় জয়নাল, জাফর, দীপালি সাহাসহ অন্তত ১০ ছাত্রকে। এদের মধ্যে জয়নালকে গুলিবিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০, এরশাদের পুরো শাসনামলেই গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতার বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম-হরতাল-ঘেরাও কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কেটেছে। বিভিন্ন কর্মসূচিত রাস্তায় নামতো মানুষের ঢল। আর সে ক্ষুব্ধ জনতার ওপর চলতো গুলি। মানুষের ওপর অব্যাহত নিপীড়ন-নির্যাতনের মাত্রা ছাড়ালে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবীসহ সব শ্রেণিপেশার মানুষ। আন্দোলনকে ভুল করতে মাঝে এরশাদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন বাহানা সামনে আনলেও নব্বইয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তিনটি জোট ১৫ দল, ৭ দল এবং ৫ দল যুগপৎ আন্দোলনে নামে।

সাংবাদিক হেলালউদ্দিন চৌধুরীর জবানীতে উঠে আসে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে আট দলের সমাবেশে যোগ দিতে গেলে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে বিনা উসকানিতে গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। ওইদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে ট্রাক তুলে দিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল অন্তত ২৪ জনকে। এ সংক্রান্ত একটি মামলায় আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘ট্রাকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে আসার পর পুলিশ প্রথমে টিয়ারশেল, পরে এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ ও গুলি ছুড়ে পুলিশ ট্রাকের হেলপার আবদুল মান্নান গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যায়। বেশ কয়েকজন রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে ছিল। এ সময় শেখ হাসিনা বারবার মাইকে গুলি বন্ধের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। আমি কোতয়ালির ওসি সাহাবুদ্দিনকে জিজ্ঞেস করি-শান্তিপূর্ণ সমাবেশে গুলি চালালেন কেন? তিনি বলেন ওপরের অর্ডার আছে।

গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে এরশাদের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারাতে হয়েছে নূর হোসেনকে; যার বুকে পিঠে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’, ডা. শামসুল আলম মিলন, কমরেড তাজুল, যুবনেতা টিটো, জেহাদ, সাহাদাত হোসেন, ঢাকা বিশ্ব্বিদ্যালয়ের ছাত্র দেলোয়ার হোসেন ও ইব্রাহিম সেলিম, ঢাকা পলিটেকনিকের ছাত্র মনিরুজ্জামান, আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজ উদ্দিনসহ অগুণতি মানুষকে। জনগণকে দমাতে খুনের পর খুনে হাত রাঙিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি এরশাদের। গণবিক্ষোভে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি।

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ছিল এরশাদের পতন দিবস। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদের পতন ঘটলেও রাজনীতির নানা সমীকরণে আওয়ামী লীগ-বিএনপি প্রধান দুই জোটে এরশাদের কদর রয়ে গেছে শেষ পর্যন্ত। ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের সরকার এরশাদকে জেলে ঢোকায়। তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা দায়ের করে। খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকার তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা দায়ের করে এবং একটি মামলায় তিনি দ-িত হন। পরে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার এরশাদকে সব মামলায় জামিন দিয়ে জাতীয় সংসদে বসার সুযোগ করে দেয়। তারপর এরশাদ ২০০৫ সালে তার জাতীয় পার্টি নিয়ে মহাসমারোহে খালেদা জিয়ার জোটে যোগ দেন। খালেদা জিয়া তাকে কাছে টেনে নিলেন পরম মমতায়। ২০০৭ সালের এক-এগারোর কিছু আগে সমীকরণ আবার পাল্টে যায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এরশাদ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটে মহা অংশীদার হন। ২০০৯ সাল থেকেই তিনি এবং তার দল ক্ষমতার ভাগীদার। এভাবেই রাজনীতিতে তিনি হয়ে ওঠেন ‘ফ্যাক্টর’। তাকে কেউ যেমন গিলতেও পারেননি তেমনি পারেননি উগরে দিতে।

এরশাদের জন্ম ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে। অবিভক্ত ভারতে শিশুকাল কুচবিহারে কাটে তার। ভারত ভাগের পর তার পরিবার চলে আসে রংপুরে; পেয়ারা ডাকনামে পরিচিত এরশাদের কলেজের পড়াশোনা চলে রংপুরেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এরশাদ। পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রাম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে অ্যাডজুট্যান্ট, পশ্চিম পাকিস্তানের ৫৪তম ব্রিগেডের মেজর, তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়ক এবং সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর) সেক্টর কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় পশ্চিম পাকিস্তানেই ছিলেন এরশাদ। তার ভাষ্য, তিনি বন্দি হিসেবে সেখানে ছিলেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়ার তথ্য তুলে ধরে অনেকে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পাকিস্তান থেকে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে ফেরার পর মামা রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়ার (বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রতিমন্ত্রী) সুপারিশে এরশাদকে সেনাবাহিনীর চাকরিতে ফেরত নেওয়া হয় বলে সেক্টর কমান্ডার রফিকুল ইসলাম তার বইয়ে লিখেছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হন তিনি; তখন তার পদমর্যাদা ছিল কর্নেল।

১৯৭৫ সালে এরশাদ ভারতের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রতিরক্ষা কোর্সে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। ওই বছরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকা-ের সময় তিনি সেখানেই ছিলেন। ওই ঘটনায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসা জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হওয়ার পর তার উদ্যোগে ভারত থেকে এনে এরশাদকে করা হয় সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান, মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে। পাকিস্তান প্রত্যাগত এরশাদকে জিয়ার এই পদোন্নতি দেওয়া তখন ভালো চোখে দেখেননি মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তারা।
রাষ্ট্রপতি জিয়ার এক সময়ের ঘনিষ্ঠ অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদ তার বইয়ে লিখে গেছেন, এরশাদকে নির্বিষ ভেবে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঠেকাতে তাকে নিজের পরের পদটিতে বসিয়েছিলেন জিয়া।

জিয়া রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে ‘নির্বিষ’ এরশাদকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করেন; কিন্তু সেই এরশাদই তার জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ান বলে বিএনপি নেতারা এখন বলেন।

জিয়া রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে ‘নির্বিষ’ এরশাদকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করেন; কিন্তু সেই এরশাদই তার জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ান বলে বিএনপি নেতারা এখন বলছেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে যে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে জিয়া নিহত হন, তার পেছনে এরশাদই কলকাঠি নেড়েছিলেন বলে জিয়ার স্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অভিযোগ। ওই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নেতা মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে তখন হত্যা করা হয়েছিল, সেই হত্যার মামলা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বইতে হয়েছে এরশাদকে, যদিও রায় হয়নি।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি এক শোকবার্তায় এরশাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

এরশাদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা এক শোকবার্তায় বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গঠনমূলক ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনার জানান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আবদুল মোমেন বলেন, এইচ এম এরশাদের মৃত্যুতে জাতি একজন রাজনীতিবিদকে হারালো। এ ছাড়া কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, রেলপথ মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এবং সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু শোক প্রকাশ করেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি মহাসচিব শোকবার্তায় এরশাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকাহত পরিবারবর্গ ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

বাবার জন্য দোয়া চাইলেন এরিক এরশাদ
আজকে চিরনিদ্রায় গেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন ছেলে এরিক এরশাদ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা মারা গেছেন-এটা বিশ্বস করতে পারছি না। সবাই বাবার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন বাবাকে বেহেস্ত দান করেন।’

আজ (১৪ জুলাই) এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর খবর পেয়ে তাকে দেখতে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) আসেন এরিক। এ সময় তিনি সবার কাছে দোয়া চান।
এরিক বলেন, ‘তিনি (এইচ এম এরশাদ) খুব ভালো মানুষ ছিলেন। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, ইসলামের জন্য ভালো কাজ করেছেন আমার বাবা। তার মতো মানুষ আর আসবেন না।’

এরশাদের দাফন কাল
চার জানাজা শেষে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে আগামী মঙ্গলবার বিকালে ঢাকায় সেনাবাহিনীর কবরস্থানে দাফন করা হবে। গতকাল দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসে সেনা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে এরশাদের প্রথম জানাজা হয়।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাবেক সেনাপ্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, এরশাদের ভাই ও জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের, মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা, এরশাদের বড় ছেলে সাদ এরশাদসহ জাতীয় পার্টির বিভিন্ন স্তরের নেতারা।

জানাজার এক ঘণ্টা আগে জাতীয় পতাকা ও সেনাবাহিনীর পতাকা মোড়ানো এরশাদের কফিন মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে গতকাল সকালে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) সাবেক সামরিক শাসক এরশাদের মৃত্যু হয়।

দলের কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিরোধীদলীয় নেতার দ্বিতীয় জানাজা হবে। নেতাকর্মীসহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের মরদেহ দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রাখা হবে। একই দিন বাদ আছর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তৃতীয় জানাজার পর এরশাদের মরদেহ সিএমএইচের হিমঘরে রাখা হবে। মঙ্গলবার সকালে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির মরদেহ রংপুরে নেওয়া হবে। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা শহরের ঈদগাহ মাঠে রংপুরের সন্তান এরশাদের চতুর্থ জানাজা হবে। হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনার পর ওই দিনই বাদ জোহর বাংলাদেশের চতুর্থ সেনাপ্রধানের মরদেহ সেনা কবরস্থানে দাফন করা হবে।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা জানান, বুধবার বাদ আছর গুলশানের আযাদ মসজিদে এরশাদের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে গতকাল বিকালে রাজধানীর বনানীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সামনে এরশাদকে সেনা কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নেতাকর্মীরা। তারা বনানী কবরস্থান বা রংপুরে দাফনের দাবি জানান।

নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়ে রাঙ্গা বলেন, ‘দলের নেতাকর্মীদের মতামত অনুযায়ী দাফনের স্থান পরিবর্তন হতে পারে। তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে আমরা স্থান চূড়ান্ত করব। নেতাকর্মীরা চাইলে উন্মুক্ত স্থানেও কবর দেওয়া হতে পারে।’

এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের বলেন, ‘আপাতত আমরা সেনানিবাস কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কর্মীরা যেহেতু উন্মুক্ত স্থানে দাফনের কথা বলেছেন, সেটা বিবেচনা করা হবে।’

আস/এসআইসু

Facebook Comments