কালীগঞ্জের আড়াইশ বছরের পুরনো জামাই মেলা

162

শামীম শিকদার

অগ্রাহায়নের ধান কাটা শেষে পৌষ-সংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসবে আয়োজন করা হয় মেলার। মূলত জামাই মেলা, তবে সবাই এটাকে বলে মাছের মেলা। বলছিলাম গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইল গ্রামের মাছের মেলার কথা।

ব্রিটিশ শাসন আমল থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের আঞ্চলিক উৎসবের মধ্যে শুরু হলেও এখন তা ঐতিহ্যের রূপ ধারন করেছে। প্রায় ২৫০ বছর আগে সূচনা হয় এ মেলার । এখন শুধু হিন্দু নয়, সকল শেণি পেশা ও ধর্ম-বর্ণের মানুষ দিনটিকে উপভোগ করতে মেলায় একত্রিত হয়। এ দিনটিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আত্নীয়-স্বজনরা উপজেলার ঐতিহ্যকে স্বরণ করতে বেড়াতে আসে। মেলার প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে সামদ্রিক চিতল, বাঘাড়, আইড়, বোয়াল, গলদা চিংড়ি, বাইম, পাবদা, গুলসা, কালি বাউশ, কাইকলা, রূপচাঁদা, বাঘাইড়, কাইককা সহ কয়েক’শ প্রজাতির মাছ। সামদ্রিক মাছের পাশাপাশি দেশীয় প্রজাতির মাছের মাধ্যমে সাজানো হয় মাছের পাসরা। প্রতি বছর তিনশতাধিক মাছ ব্যাবসায়ি এ মেলায় মাছ বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে আসে।

এলাকার রেওয়াজ অনুযায়ী নতুন জামাই মেলা থেকে মাছ কিনে শশুর বাড়ি যেতে হবে। মেলা থেকে মাছ না নিলে, শশুর বাড়িতে জামাইকে মাছ খেতে দেওয়া হবে না। মেলার সময় শশুর বাড়ির লোকজন জামাইয়ের অপেক্ষায় থাকেন। কে কতো বড় মাছ নিয়ে শশুর বাড়িতে যাবেন, তা নিয়ে রীতিমতো জামাইদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে থাকে। শুধু জামাই নয়, জামাইদের মাছ কিনার প্রতিযোগিতায় এলাকার শশুরদের মাঝেও চলে নিরব প্রতিযোগিতা। শত শত বছরের রেওয়াজ এখানে চলছে। এ কারণে এ মেলাটি মাছের মেলা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি হচ্ছে জামাই মেলা।

মাছ ছাড়াও গ্রামের মানুষের হাতের তৈরি মাটির খেলনা, পুতুল, কাঠের সামগ্রী, ঘরের আসবাবপত্র, শামুক-ঝিনুকের গহনা, বাঁশের বাশি, ছোট ছোট ঢোল, কাগজের চড়কি, তিলের নাড়া, খাজা, কদমা, বাতাসা, চিনির তৈরি নানা ডিজাইনের হাতি, খৈ, মুড়ি-মুড়কি, হওয়াই মিঠাই, ঝুরি সহ শিশুদের নানাধরনের খেলনা ও নিত্য প্রয়োজনীয় সকল জিনিস পাওয়া যায়।

মেলার স্থানে শীতকালে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, মুলা, গাজর, শিম, বেগুন, আলু চাষ করা হলেও মেলাকে কেন্দ্র করে প্রায় দশ বিঘা জমিতে কোন ফসল চাষ করা হয় না। কারণ কালীগঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম সহ কাপাসিয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর, শিবপুর, ঘোড়াশাল, মাধবদী, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল থেকে একদিনে প্রায় অর্ধলক্ষের উপর মানুষ মেলাতে আসে।

সকাল ৯টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের ঢলে মেলা হয়ে উঠে জমজমাট। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ পাকা সরু সড়ক দিয়ে আসতে পারলেও মেলাটি বিলের মাঝখানে বসে বলে, সকলকে প্রায় এক কিলোমিটার হেটে মেলাতে পৌছাতে হয়। হাজার হাজার মানুষের যাতায়াতের কারণে মাটি কাদায় পরিনত হয়; পায়ে কাদা লেগে মনে করিয়ে দেয় গ্রাম-বাংলার হারানো ঐতিহ্যের কথা। যারা দূর থেকে নিজেস্ব বা ভাড়া গাড়ি নিয়ে আসে, তাদের জন্য স্থানীয় লোকজন টিকেটের মাধ্যমে প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, সাইকেল সহ বিভিন্ন গাড়ি আয়তন অনুসারে পাকিংএর ব্যবস্থা কর অর্থ নিয়ে থাকে। মেলাতে যে কেউ স্বাধীন ভাবে ঘুরতে পারবে কারণ সকল গাড়ি বা জিনিসপত্রের নিরাপত্তা দিবে স্থানীয় লোকজন। মেলার দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মেলায় প্রবেশ করার প্রতিটি সড়কে থাকে যানযট।

শামীম শিকদার

সাহিত্যিক ও সাংবাদিক কাপাসিয়া, গাজীপুর

01799389050

আস/এসআইসু

Facebook Comments