কেঁচো খোঁড়াই চলছে

367

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনায় রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে গত ২৬ জুন। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছে এবং তাদের মধ্যে ১৪ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানা গেছে। মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে ‘নয়ন বন্ড’ গত ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে।

এ মামলার এক নম্বর সাক্ষী ও নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকেও পুলিশ গ্রেফতার করেছে এবং রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসবাদ করার পর জেলহাজতে পাঠিয়েছে। মিন্নিকে গ্রেফতার দেখানো নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠছে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনা নিয়ে। কারা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

এখনো হত্যা মামলাটি কেঁচো খোঁড়ার পর্যায়েই রয়েছে। সাপের নাগাল মিলছে না। রিফাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর নেপথ্যে মাদক বাণিজ্যের বিষয়টি উঠে আসে। নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির ব্যানারে মানববন্ধনে এমনটাই দাবি করা হয়েছিল। মাদক নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে রিফাতকে খুন করা হয়েছে-এমন তথ্য বিভিন্ন সূত্রেও জানা গেছে।

ওই সূত্রগুলো বলছে, এর আগেও মাদক নিয়ে রিফাত শরীফের সঙ্গে সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডের বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই রিফাতকে মাদক দিয়ে নয়ন ফাঁসিয়েছিল। মাদক সম্পৃক্ততার দায়ে রিফাত জেলেও ছিল। পুরো ঘটনা সবার জানা। তবু পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ার আগেই সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছেন, রিফাত খুনের সঙ্গে মাদকের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

তবে তিনি বলেছেন, আসামিদের অনেকেই মাদকসেবী ও কারবারি। তার এমন বক্তব্যে ফেনীতে নুসরাত হত্যায় পুলিশের ভূমিকার কথা চলে আসে। বরগুনার পুলিশ স্বাধীনভাবে কাজ করুক তা সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও চায়। কিন্তু পুলিশ সেই সুযোগ নিয়ে যাতে কাউকে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত না করে, সরকার এবং উচ্চ আদালত সে বিষয়টিও দেখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। মিন্নিকে রিমান্ডে নেওয়ার শুনানির সময় তার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিল না, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। অনেকে বলছেন, স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভয়ে বরগুনার কোনো আইনজীবী মিন্নির পক্ষে আদালতে দাঁড়ানোর সাহস পাননি। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা থেকে একটি আইনজীবী প্যানেল বরগুনায় যাচ্ছে।

জানা গেছে, মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর গতকাল শনিবার সকালে জেলগেটে গিয়ে মিন্নির সঙ্গে দেখা করেছেন। মিন্নি বলেছেন, তাকে রিমান্ডে ভয়ভীতি দেখিয়ে জবানবন্দি নিয়েছে আর জবানবন্দি না দিলে আবার তাকে রিমান্ডে নেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছে। এমন অভিযোগ করে মিন্নির বাবা আরও বলেন, মিন্নি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তার সুচিকিৎসা দরকার।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রিফাত হত্যার আসামিরা মাদক ও মোটরসাইকেল চোরাচালানের সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। প্রধান আসামি, যে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে সেই নয়ন বন্ড ১০০ জনের বেশি সদস্য নিয়ে ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপ ‘০০৭’-এর মাধ্যমে অপরাধমূলক কর্মকা- চালাত। নয়নেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন রিফাত শরীফ। নয়নের গ্রুপ থেকে বেরিয়ে এসে অন্য গ্রুপে যোগ দিয়েছিলেন রিফাত। এর কয়েক মাস পর গত ২৬ জুন হত্যার শিকার হন রিফাত। আর গত ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে ‘বন্ধুকযুদ্ধে’ নিহত হয় নয়ন বন্ড।

নয়ন নিহত হওয়ার পর তার মা শাহিদা বেগম সাংবাদিকদের বলেছেন, বরগুনা সদর উপজেলা পরিষদের গত নির্বাচনের সময় নয়ন ‘দাদা’র সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু কে সেই ‘দাদা’ তা শাহিদা বেগম পরিষ্কার করে বলেননি। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, দাদা হচ্ছে স্থানীয় এমপিপুত্র। ওই নির্বাচনের সময় যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় ‘দাদা’র সঙ্গে নয়নের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। নিহত রিফাত ও নয়ন ছিল দুই বন্ধু। স্থানীয় এমপির ছেলের গ্রুপ ছাড়ার ব্যাপারে নয়নের সিদ্ধান্ত ভালোভাবে নিতে পারেননি নিহত রিফাত শরীফ। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এ কারণে দুই বন্ধু পরিণত হয় শত্রুতে।

এমন পরিস্থিতিতেও নয়নের বাসায় আসা-যাওয়া অব্যাহত ছিল রিফাতের স্ত্রী মিন্নির। এ সময়ও মিন্নি ও নয়নের মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক চলছিল। যা নিয়ে মিন্নি-রিফাতের মধ্যে জগড়া হয় এবং রিফাত মিন্নিকে মারধর করে। পরে মারধরের বিষয়টি মিন্নি নয়নকে জানালে কলেজে রিফাতকে নয়ন ও তার সহযোগীরা মারধর করে হত্যা করে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করেছে।

এ ছাড়া রিফাত হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর গত ২৮ জুন মিন্নি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, রিফাতের সঙ্গে নয়নের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। হঠাৎ করেই নয়নের বাসায় মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযান চালায়। রিফাতের দেওয়া তথ্য মতে সেই অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে নয়ন দাবি করে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত। সেই ঘটনার জের ধরে রিফাতকে ১৫ গ্রাম গাঁজা দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেয় নয়ন।

বরগুনার সাংবাদিক রুদ্র রুহান গণমাধ্যমকে বলেন, চলতি বছরের ১৬ মার্চ রিফাত শরীফকে ১৫ গ্রাম গাঁজাসহ পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। ওই রাতেই নয়ন বন্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সে ভিডিও ফুটেজ আমাকে পাঠায়। পরের দিন নয়নের সঙ্গে আমার কথা হয়। তখন নয়ন বলে, পুলিশ দিয়ে রিফাত আমাকে হয়রানি করছে।

রিফাতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েকবার পুলিশ আমার বাসায় অভিযান চালিয়েছিল, কিন্তু কোনো মাদক পায়নি। রিফাতকে মাদকসহ গ্রেফতারের ব্যাপারে তার (নয়ন) সম্পৃক্ততার (পুলিশকে জানানো) বিষয়টিও আমার কাছে স্বীকার করে বলে, ‘ভাই, আমি ভালো হয়ে গেছি। এখন আর মাদকের সঙ্গে আমি জড়িত নই। রিফাত হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদকের বিষয়টি জড়িত দাবি করে গত ১৪ জুলাই বরগুনা প্রেস ক্লাবের সামনে বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির ব্যানারে মানববন্ধন হয়। মানববন্ধন কর্মসূচিতে স্থানীয় এমপিপুত্র সুনাম অংশ নিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি মাদক নিয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments