কেন বঙ্গোপসাগরের হাঙর ধরছে জেলেরা?

5

দেশবার্তা ডেস্কঃ বঙ্গোপসাগর থেকে নির্বিচারে হাঙর নিধন করছে বাংলাদেশের জেলেরা। এতে হুমকির মুখে পড়েছে স্তন্যপায়ী এ প্রজাতিটি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এভাবে নির্বিচারে হাঙর ধরার ফলে শিগগিরই এই হাঙর বঙ্গোপসাগর থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী হাঙর ধরা নিষিদ্ধ হলেও সমুদ্রে এ কাজ চলছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি বাংলা। এতে জানানো হয়, গত কয়েকদিনে উপকূলীয় জেলা বরগুনা ও ভোলায় জেলেদের কাছ থেকে বেশ কিছু হাঙর জব্দ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের ইন্সটিটিউট-এর অধ্যাপক সাইদুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর থেকে জেলেরা যেসব হাঙর ধরে সেগুলোর পাখা আলাদা করে সেসব দেশে-বিদেশে পাঠানো হয়।’

বিষয়টি বেশ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যাচ্ছে শুধু পাখা বা ডানা সংগ্রহের জন্য পুরো মাছ মেরে ফেলা হচ্ছে, পুরোটা ব্যবহার হচ্ছে না।’

বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের আওতাধীন সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘হাঙর ধরা এবং বিদেশে পাঠানো অবৈধ।’ পুরো কাজটি গোপনে করা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পাচার করা হাঙরের অংশবিশেষের গন্তব্য চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। কারণ সেখানে হাঙরের পাখা দিয়ে তৈরি এক ধরনের স্যুপ দারুণ জনপ্রিয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইদুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে হাঙরের পাখা চীন, হংকং, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুরে যায়। হাঙর ধরার পর পাখনা আলাদা করে বাকি হাঙর ফেলে দেয়া হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ হাঙর মাছ খায় না। তাছাড়া বিদেশে হাঙরের পাখার চাহিদাই বেশি।’

জীব বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করে আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াইল্ডএইড জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে হাঙরের পাখা দিয়ে তৈরি স্যুপ খাবার প্রবণতা কমে আসলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে এটি এখনো বেশ জনপ্রিয়।

তাদের এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ১০ কোটি হাঙর মারা হয়। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত কোটি হাঙর শুধু পাখা সংগ্রহের জন্যই শিকার করা হয়।

বাংলাদেশের উপকূলে শিকার করার মতো দামী মাছের পরিমাণ কমে যাওয়াকেই এদেশের জেলেদের হাঙর শিকারে ঝুঁকে পড়ার কারণ হিসেবে দেখছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা।

তারা জানান, উপকূলে এখন রূপচাঁদা, লাইক্ষ্যা, বড় পোয়া মাছ দামী মাছ ধরার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এসব মাছের পরিমাণ আশংকাজনক হারে কমায় জেলেরা অধিক লাভের আশায় এখন হাঙর ধরার দিকে ঝুঁকছে।

অধ্যাপক সাইদুর রহমানের ভাষ্য, ‘এখন বিকল্প জিনিস খুঁজছে। কিছু না কিছু তো তাদের করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত এবং অতিরিক্ত মৎস্য আহরণের কারণে দামী মাছ কমে যাচ্ছে।’

সাধারণ মাছ ধরার চেয়ে হাঙর ধরা বেশি লাভজনক বলে জানান কক্সবাজারের একজন মৎস্যজীবী। তিনি বলেন, ‘মাছ সবসময় সমানভাবে ধরা পড়ে না। সেজন্য অনেকে মাছ না পাইলে হাঙর ধরে।’ আবার অনেকেই শুধু আছে হাঙর ধরার জন্যই সমুদ্রে যায় বলেও জানান তিনি।

বঙ্গোপসাগরে হাঙর যে হুমকির মুখে রয়েছে তা স্বীকার করলেন সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক শরীফ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘একটি মাছ লক্ষ-লক্ষ ডিম দেয়। কিন্তু হাঙর কোন ডিম দেয় না, তারা বাচ্চা প্রসব করে। স্বাভাবিকভাবেই হাঙরের সংখ্যা কম হয়।’ এভাবে হাঙর ধরতে থাকলে এ প্রজাতিটি একসময় নিঃশেষ হয়ে যাবে বলেও মনে করেন তিনি।

শরীফ উদ্দিন আরো জানান, বাংলাদেশের জেলেরা ২০০-২৫০ কেজি পর্যন্ত ওজনের হাঙর ধরে বলে প্রমাণ মিলেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জানান, হাঙরের পাখা আলাদা করার পর বাকি অংশ শুকিয়ে শুটকি তৈরি করা হয়। এই শুকনো হাঙরের চাহিদা রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর মাঝেও। মৎস্যজীবীরা হাঙরের শুটকি করে তাদের কাছে বিক্রি করেন।

 

Facebook Comments