ক্রসফায়ার কি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?

276

আলোকিত সকাল ডেস্ক

প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা আর বিচার বহির্ভূত হত্যা, দুটোই সমান অপরাধ। এমন কথাই বলছেন দেশের বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। তাদের ভাষ্য মতে অপরাধ অপরাধই। অপরাধকে কোন কিছু দিয়ে ঢাকার বা মূল্যায়ণের সুযোগ নেই। আরও একটি কথা স্পষ্ট হয়, অপরাধকে বৈধতা দেয়ার অর্থ হল, বড় অপরাধকে চোখ বুঝে প্রশ্রয় দেয়া। অতএব অন্যায়কে অন্যায় বলতেই হবে। নয়তো একদিন বিপদ নিজের ঘাড়ে আসতে পারে বলে জানান অধ্যাপক আলী রিয়াজ। প্রতিদিন আমরা কেবল বিভিন্ন ধরনের হত্যাকাণ্ড, এমনকি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে মৌনতাই পালন করি তা নয়, অনেকেই দ্বিধাহীনভাবেই কাকে কখন ‘ক্রসফায়ারে’ দেয়া উচিত, এই বিষয়ে পরামর্শ দেই। এটাই হচ্ছে হত্যাকাণ্ডের স্বাভাবিকীকরণ!

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, খুনি, দাগী আসামী ও ধর্ষকদের বিচারের দাবি করতে গিয়ে সমাজে ‘ক্রসফায়ারে দেবার’ দাবি এখন প্রায়ই উচ্চারিত হয়। ক্রসফায়ারের অর্থ সবাই কমবেশ জানে, রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক বিচারের বাইরে গিয়ে হত্যা করা। ‘পিটিয়ে হত্যা করো’, ‘ফায়ার স্কোয়াডে দাও’ এসব দাবিও শোনা যায়। বিচারের বাইরে গিয়ে এ রকম হত্যাকাণ্ডের জন্য দাবি সমাজে কেন তৈরি হয়? কারণ বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা নেই। অপরাধীদের বস্ যারা তারাই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। পুলিশ মামলার কাগজপত্র এমনভাবে তৈরি করে যাতে অপরাধী ছাড়া পেয়ে যায়, আদালতও নানা প্রভাবের মধ্যে থাকে। শুধু তাই নয়, আদালত থেকে খুনের আসামি পালিয়ে যায়, কারও বিচার যদি হয়ও খুনের দায়ে ফাঁসির আসামিও রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে যায়। এসব কারণে ভুক্তভোগীরা ত্বরিত শাস্তি দেখে মনের শান্তি পেতে চান। দু-একজন চিহ্নিত দুর্বৃত্তকে এ রকম ক্রসফায়ারে দিয়ে রাষ্ট্রও বাহবা নিতে চায়, পাশাপাশি চলে নির্বিচার ক্রসফায়ার হত্যাকাণ্ড। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের এই অনাস্থা, আর ধরে ধরে খুন করার ঘটনা রাষ্ট্র বা সরকারের শক্তি নয় দেউলিয়া অবস্থাই নির্দেশ করে।

তিনি আরও বলেন, যারা এসব সন্ত্রাসী তৈরি করে তাদের বিচার কোথায় হবে? না তাদেরও ক্রসফায়ারে হত্যা করে লাভ নেই, সেই দাবিও আমরা করি না। আমরা চাই সমাজে মানুষের শক্তি তৈরি হোক জুলুমবাজদের প্রতিরোধ করতে, আইন ও বিচার প্রক্রিয়াকে সঠিক জায়গায় আনতে। কুপিয়ে, পিটিয়ে, গুলি করে যারা মানুষ খুন করে তাদের সঙ্গে ক্রসফায়ারওয়ালাদের মৌলিক কোনো তফাৎ নেই। এক-দুইজন ভাড়াটে, দিনে দিনে পোষা খুনি-ধর্ষককে, বসদের ঝামেলা থেকে বাঁচাতে, খুন করে ক্রসফায়ারের বৈধতা দেয়া যাবে না।

এদিকে নয়ন বন্ড’র ক্রসফায়ারের হত্যা নিয়ে অধ্যাপক আসিফ নজরুল তার ফেসবুক পেইজে লিখেন, নয়নকে কি সত্যি হত্যা করা হয়েছে? যদি তাকে সত্যি হত্যা করা হয় এই ক্রসফায়ারের প্রতিবাদ জানাই আমি। কারণ এই একটা ‘ন্যায্য’ ক্রসফায়ারের মূলধন দিয়ে হত্যা করা হবে আরও অনেক মানুষকে। কারণ এই ক্রসফায়ার আড়াল করবে আরও অনেক আগের ক্রসফায়ার। কারণ নয়নকে ক্রসফায়ার করলে জানা যাবে না তার গডফাদারদের কথা, আরো বহু নয়ন তৈরি হচ্ছে যাদের হাতে তাদের কথা। মাথায় রক্ত আমারও চাপে মাঝে মাঝে। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন ক্রসফায়ার আমাদের সমর্থন করা উচিত নয় কোনোভাবেই। তবে তার আগে আসুন জেনে নেয়ার চেষ্টা করি সত্যি কি নয়নকে হত্যা করা হয়েছে? নাকি তার নামে বা তার বদলে অন্য কাউকে?

ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক গণমাধ্যমে বলেছেন, সকলের মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসন পাওযার অধিকার রয়েছে এবং রাষ্ট্র তা দিতে বাধ্য।

আস/এসআইসু

Facebook Comments