চিড়েচ্যাপ্টা মধ্যবিত্ত

268

আলোকিত সকাল ডেস্ক

চলতি অর্থবছরের বাজেটে কালোটাকার মালিকদের বিশাল ছাড় দেওয়া হলেও ভ্যাট ও শুল্ককর বাড়ানো হয়েছে ভোজ্যতেল, শিশুখাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা খাতে। ভ্যাটে রেয়াত সুবিধার পরিবর্তে স্বপ্নবিলাসী বাজেটের অর্থের জোগান দিতে উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোগ পর্যন্ত তিন স্তরে রাজস্ব দিতে হচ্ছে গ্রাহকের। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর ফলে ভীষন চাপে পড়বেন নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ। এমন চাপের মধ্যেই সম্প্রতি বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের দাম।

অথচ এই গ্যাসের ওপরই নির্ভরশীল দেশের কৃষি-শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ, পরিবহন যোগাযোগসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম। তাই গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে নতুন আরেক চাপে পড়েছে সাধারণ আয়ের মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এমন একের পর এক চাপে মধ্যবিত্তদের এখন চিড়েচ্যাপ্টা দশা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা খাতে ভ্যাট বাড়ানোয় কম আয়ের মানুষের আয়-ব্যয়ে এমনিতেই ফারাক তৈরি হয়েছে। তার ওপর নতুন করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়বে জীবনধারণের নানা পর্যায়ে।

কারণ গ্যাসের ওপর বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন, শিল্প কারখানাসহ অনেককিছু নির্ভরশীল। এ সিদ্ধান্তে সরকারের রাজস্ব বাড়লেও সীমিত আয়ের মানুষের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাবে। দেশে রয়েছে সাড়ে ৪ কোটি বেকার। প্রবাসীদের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা এলেও তা বিনিয়োগ হচ্ছে না। বাজেটে ভ্যাট বাড়ানো আর গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে ইতোমধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য পেঁয়াজ, রসুন, শিশুখাদ্য গুঁড়োদুধের দাম বেড়ে গেছে। আরও দেড়-দুই মাস পর গ্যাস-ভ্যাটের খড়্গের কুফল স্পষ্ট হবে।

রাজধানীর কারওয়ানবাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহ আগে রসুনের দাম ছিল কেজিপ্রতি ১১০ টাকা, এখন ১৩০ থেকে ১৩২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজ ২৩ থেকে ৩৫ টাকা। গুঁড়াদুধের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ২০ টাকা। দোকানদাররা বলছেন, বাজেটের চাপে তেল, আটা, ময়দা, ডালের দাম বাড়ানোর গুঞ্জন রয়েছে। ইতোমধ্যে মসলার দাম বেড়ে গেছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান আমাদের সময়কে বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে শিল্পে উৎপাদিত পণ্যে দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা এ বাড়তি চাপ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেবে এটাই স্বাভাবিক।

তিনি আশঙ্কা করেন, গ্যাসের দাম বাড়ায় খাদ্যপণ্য থেকে শিল্প উৎপাদন এমনকি পরিবহন খরচও বেড়ে যাবে। ভোক্তার ওপর বাড়তি ভাড়ার চাপ পড়বে। এ ছাড়া সরকার ভর্তুকি না দিলে সারের দাম বাড়বে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। এর চাপ পড়বে কৃষকের ওপর। রাজধানীতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের। আবাসিক খাতে এক চুলা এবং দুই চুলা উভয় ক্ষেত্রে গ্যাসের মাসিক খরচ ১৭৫ বৃদ্ধি পাওয়ায় এ দুই শ্রেণির মানুষের দৈনন্দিন খরচে নতুন বোঝা তৈরি করবে। এসব জনগোষ্ঠীর বড় একটা গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ চুক্তিভিত্তিক ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তাদের ওপরও নতুন করে ভাড়া বৃদ্ধির খড়্গ নেমে আসবে।

যেসব ভাড়াটিয়া গ্যাসের বিল পরিশোধ করছে তাদেরও ব্যয় বাড়ছে। সিএনজি গ্যাসের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে পরিবহন খাত। কারণ সিএনজিচালিত পরিবহনে ভাড়া বাড়লে যাত্রী চলাচল থেকে শুরু করে মালামাল বহন প্রতিটি ধাপে ব্যয় ভাড়বে। সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, মাছ, মাংস, কাঁচাবাজারে যার প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে সিএনজি গ্যাসে ৭.৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে ঘনমিটার প্রতি ৪০ থেকে ৪৩ টাকা নতুন দাম নির্ধারণ করলেও অযৌক্তিকভাবে কয়েকগুণ ভাড়া বাড়িয়েছে কিছু পরিবহন মালিক। বগুড়ার একতা পরিবহনে ভাড়া ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় গ্যাসচালিত পরিবহন মালিকরা বেশি দামে গ্যাস কিনবেন। আর এ দায় চাপাবে যাত্রীদের ওপর। রাজধানীতে সিটিং বাসের নামে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোয় পরিবারপ্রতি গড়ে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ বেড়ে যাবে। গ্যাসের দাম বাড়ানোয় সরকার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা পাবে। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও প্রায় ৪০ থেকে ৪৮ হাজার কোটি টাকা কেটে নেবে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে।

সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অধিকাংশ পাওয়ার প্লান্ট গ্যাসনির্ভর। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে পাওয়ার প্লান্টগুলোয় গড়ে ৫০ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় সরবরাহ গ্যাসে ঘনমিটারপ্রতি ৩ টাকা ১৬ পয়সা থেকে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দাম বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। তাই গ্যাসের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে অতীতের মতো কিছুদিন পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হতে পারে। নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে বাসাবাড়িসহ কলকারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। আবার গ্যাস-বিদ্যুতের ওপর সার উৎপাদনের নির্ভরশীল। এখানে গ্যাসের মূল্য প্রতি ঘনমিটারে ২.৭১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪.৪৫ টাকা করা হয়েছে, দাম বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬৫ ভাগ। সরাসরি এর প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদনে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করার যে কৌশল অবলম্বন করতে চাচ্ছে, কৃষি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে গেলে রাজস্ব বাড়ানোর সেই চেষ্টা বৃথা যাবে। অন্যথায় কৃষককে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে বাধ্য করা হবে। এতে উৎপাদন খরচ না উঠলে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে কৃষকের ওপর পড়বে। শিল্প খাতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম প্রায় ৩৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৭.৭৬ টাকা থেকে ১০.৭০ করা হয়েছে। ফলে শিল্পকারখানার পরিচালনা ব্যয় বাড়ায় সেসব কারখানার পণ্যের দাম বাড়তে পারে। বিশেষ করে রড উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। দাম বাড়ায় টনপ্রতি রডের দাম বাড়বে ১৪০০ টাকা করে। নতুন দাম বাড়ায় এর প্রভাব পড়বে গ্রাহকের ঘাড়ে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার হোসাইন জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্টিল পণ্যের ওপর বাড়তি ভ্যাট-ট্যাক্স বসানো হয়েছে। এরপর আবার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা কোথায় যাবেন? রড থেকে শুরু করে ব্লেড পর্যন্ত সব পণ্যে দাম বেড়ে যাবে। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব ক্রেতাদের ওপর পড়বে। আমরা এখান থেকে মুক্তি চাই।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ জানান, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষদের ওপর বড় চাপ পড়বে। সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়বে। এ চাপ পড়বে শিল্পের ওপর। তিনি বলেন, দেশে অনেক গ্যাস অপচয়, চুরি হচ্ছে। এগুলোর সমাধান না করে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ দিয়ে গ্যাসে বাড়তি দাম নেওয়াটা ঠিক না। চুরি, অপচয় ঠেকাতে কোম্পানিগুলোর মিটার ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু গ্রাহকদের মিটার দেওয়া হয়নি। মিটার থাকলে গ্রাহকরা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করত। তাদের ধারণা হতো। কিন্তু এখন ইচ্ছা মতো গ্রাহকরা ব্যবহার করছে। অনেক অপচয় করছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments