ছিঁচকে চোর থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী হয়ে ওঠা নয়ন বন্ডের শেষ পরিণতি

477

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনার কলেজছাত্র মো. শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত সাব্বির আহম্মেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড একসময় ছিঁচকে চোর হিসেবেই পরিচিত ছিল বরগুনা পৌর এলাকায়।

চুরির টাকায় মাদক সেবন করে চলছিল তার জীবন। তবে একসময় মাদকের অর্থের জোগান দিতে বেছে নেয় ছোটখাটো ছিনতাই ও মাদক ব্যবসা। এ থেকে স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালীদের সাথে চেনা পরিচয় ও তাদের মদদেই ছিঁচকে চোর থেকে হয়ে ওঠে শীর্ষ সন্ত্রাসী। সর্বশেষ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে মঙ্গলবার (২ জুলাই) ভোরে পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় বরগুনার সন্ত্রাসের জগতের গডফাদার নয়ন বন্ড।

অবশ্য নয়ন বন্ডের বরগুনার শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদকরাজ্যের গডফাদার হয়ে ওঠার পেছনে তার পরিবারের অবজ্ঞা এবং অবহেলাকেই দায়ি করছে স্থানীয় কিছু মহল। বাবার ভালোবাসা না পাওয়া এবং মায়ের অনাচার তাকে সন্ত্রাসের রাজ্যে ঠেলে দেয় বলে মনে করছে তারা।

বরগুনা থানার পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পৌর শহরের বিকেবি রোডের ধানসিঁড়ি এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে নয়ন (২৫)। বিগত ১০ বছর ধরেই সে ছোটখাটো বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে চুরি ও ছিনতাই ছিল তার মূল পেশা। তবে নয়ন ২০১৫ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসে।

এরপর ২০১৭ সালে নয়ন বন্ড মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়। একই বছরের মার্চ মাসে প্রায় ১২ লাখ টাকা মূল্যের ৪৫০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১ গ্রাম হেরোইন ও ১২ বোতল ফেনসিডিল নিয়ে ধরা পড়ে নয়ন বন্ড। সেই থেকে রিফাত শরীফ হত্যার পূর্বে পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে ৮টি মামলা হয়। যার প্রতিটিতেই নয়নকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয় পুলিশ।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, সাব্বির আহম্মেদ নয়ন পূর্বে থেকে নয়ন বন্ড নামে পরিচিত ছিল না। ২০১৫ সালে জেমস বন্ড ছবি দেখে নিজের নামের সাথে বন্ড শব্দটি জুড়ে দিয়ে নয়ন বন্ড বনে যায় সে। এমনকি ওই চলচ্চিত্র থেকেই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে ০০৭ নামে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে নয়ন বন্ড। তার পরিচালনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই নামে একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপও রয়েছে। যেখানে নয়ন বন্ড ও তার সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরা সকল অপকর্মের পরিকল্পনা করে আসছিল। যেমনটি করা হয় রিফাত শরীফকে হত্যার পূর্বে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, নয়ন বন্ডের ছিল বড় একটি মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেট। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার গড়ে, যা নয়ন বিকেবি রোডের ধানসিঁড়ি এলাকায় নিজ বাড়িতে বসেই পরিচালনা করত। এলাকার সকল ধরনের চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং টেন্ডারবাজিতে ভাড়ায় যেত নয়ন বন্ড ও তার গ্রুপের সদস্যরা।

স্থানীয়রা আরো জানান, নয়ন বন্ডের কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি নেই। কিন্তু সে বরগুনা সদর আসনের এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর পুত্র জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক সুনাম দেবনাথের লোক হিসেবে পরিচিত ছিল। তার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় নয়ন অপরাধ জগতে বেড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাছাড়া নয়ন বন্ডের সন্ত্রাসী গ্রুপের অন্যতম সদস্য বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, সাবেক এমপি ও জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেনের ভায়রা ছেলে ছাত্রলীগ নামধারী রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী। বরগুনা আওয়ামী লীগের বিবদমান দুই গ্রুপের ছত্রচ্ছায়ায় থাকার কারণে কাউকেই পরোয়া করত না নয়ন বন্ড।

যদিও সন্ত্রাসী নয়ন বন্ডকে নিজেদের লোক বলে পরিচয় দিতে নারাজ এমপি ধীরেন্দ্র নাথ শম্ভু এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন। তারা দুজন নয়ন বন্ডকে একজন অপরজনের লোক বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি সুনাম দেবনাথেরও দাবি, নয়ন বন্ডের সাথে তার কোনো যোগসাজশ নেই।

এদিকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সাথে নয়ন বন্ডের বেড়ে ওঠার পেছনে পুলিশকেও দায়ী করা হচ্ছে। তারা বলছেন, নয়ন একাধিক মামলার আসামি হলেও বীরদর্পে ঘুরে বেড়িয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় প্রতিটি মামলা থেকেই জামিন পেয়ে যায় নয়ন। শুধু তা-ই নয়, এমনকি বরগুনা জেলা ডিবিতে কর্মরত এক উপপরিদর্শকের সোর্স হিসেবেও নয়ন বন্ড কাজ করত বলে গুঞ্জন রয়েছে। যদিও এমন অভিযোগ আগে থেকেই অস্বীকার করে আসছে পুলিশ।

যদিও বরগুনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবির মোহাম্মদ হোসেনের দাবি, ‘নয়নের বিরুদ্ধে যখনই কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাৎক্ষণিক তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টায় বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে নয়ন বন্ড তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে রিফাত শরীফের ওপর হামলা করে। স্ত্রীর সামনে তাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে জখম করে। পরে তাকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হলে একই দিন বিকাল সোয়া ৪টায় অপারেশন টেবিলে তার মৃত্যু হয়।

এই ঘটনায় নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে নয়ন বন্ড, তার বাহিনীর সেকেন্ড ইন-কমান্ড রিফাত ফরাজীসহ ১২ জনকে নামধারী আসামি এবং ৪-৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় এজাহারভুক্ত চারজন ও সন্দেহজনক আরো চার আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

সর্বশেষ মঙ্গলবার ভোরে বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের পুরাকাটায় পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় নয়ন বন্ড। সেই সাথে ইতি ঘটে নয়ন বন্ডের মাদক ও সন্ত্রাসের রাজত্বের।

আস/এসআইসু

Facebook Comments