ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে জঙ্গিদের তত্পরতা

193

আলোকিত সকাল ডেস্ক

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলার ঘটনার তিন বছর পূর্তি আজ। সেই হামলার কথা স্মরণ করে জঙ্গিদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল সিটিটিসির (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট) প্রধান মনিরুল ইসলামের কাছে। গতকাল ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ‘ওদের মাথা চাড়া দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। এরা বিভিন্ন সময়ে অপতত্পরতা চালানোর চেষ্টা করছে। এটাও আমাদের মনিটরিংয়ে ধরা পড়ে। জঙ্গি হামলার বিষয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ওদের বড় হামলা করার কোন সক্ষমতা নেই। এ ধরণের হামলার সুনির্দিষ্ট কোন তথ্যও আমাদের কাছে নেই।’

তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, হলি আর্টিজানের মতো বড় ধরনের হামলার সক্ষমতা জঙ্গি দলগুলোর নেই। কিন্তু তারা চোরাগোপ্তা বা ‘লোন উলফ’ (একক ব্যক্তি বা জঙ্গিদের কোন ছোট দল) এর মতো হামলা চালাতে পারে। সর্বশেষ গত ২৯ এপ্রিল গুলিস্তানে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ওপর বোমা হামলা চালানো হয়। এতে দুই পুলিশ আহত হন। এ ঘটনার এক মাস পর ২৭ মে মালিবাগে একটি পুলিশ ভ্যানে দূর নিয়ন্ত্রিত বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে একজন পথচারী আহত হয়। এই দুই হামলা কথিত আইএসের নামে চালানো হয়েছে বলে দায় স্বীকার করা হয়।

ফিরে দেখা:২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরের ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর প্লটের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার ঘটনায় ৯ জন ইতালির নাগরিক, ৭ জন জাপানি নাগরিক, ১ জন ভারতের নাগরিক, ৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক ও দুই জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২৩ জন নিহত হন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর অপরাশেন থান্ডার বোল্ড অভিযানে ৫ জঙ্গি নিহত হন। এই হামলার ঘটনার জের ধরে পরবর্তীতে সারাদেশে পুলিশ ও র্যাব ২৭ টি জঙ্গি বিরোধী অভিযান চালায়। এতে ৭৩ জন জঙ্গি (পুরুষ ও নারী) নিহত হন। অভিযান চালাতে গিয়ে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে.কর্নেল আবুল কালাম আজাদসহ দুই পুলিশ কর্মকর্তা এবং চার জন উত্সুক জনতা নিহত হন।

ওই হামলায় তামিম ও সরোয়ার জাহান মানিকসহ ২১ জঙ্গির জড়িত থাকার প্রমাণ উল্লেখ করে গত বছরের ২৩ জুলাই আদালতে চার্জশিট দাখিল করে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থা সিটিটিসি ইউনিট। চার্জশিটে বলা হয়, নব্য জেএমবির জঙ্গিরা ছয় মাস আগে থেকে ওই হামলার পরিকল্পনা করে প্রস্তুতি নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, দেশকে ‘অস্থিতিশীল’ করা, বাংলাদেশকে একটি ‘জঙ্গি রাষ্ট্র’ বানানো।

এই ২১ জনের মধ্যে ১৩ জন নিহত হয়েছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে। এর মধ্যে ঘটনার রাতে প্যারা কমান্ডোদের অপারেশনে নিহত হন রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামীহ মোবাশ্বীর, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল। ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই কল্যাণপুরে অভিযানে নিহত হন আবু রায়হান তারেক। ওই বছরের ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় অভিযানে নিহত হন তামিম আহমেদ চৌধুরী। পরে রাজধানীর রূপনগরে মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম, আজিমপুরে তানভীর কাদেরী, আশুলিয়ায় সরোয়ার জাহান মানিক, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধে নূরুল ইসলাম মারজান নিহত হন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে অভিযানে নিহত হন বাশারুজ্জামান চকলেট ও ছোট মিজান।

মামলার সর্বশেষ অবস্থা:এ মামলায় ২১১ জন প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত জঙ্গিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হলেন- রাকিবুল হাসান রিগ্যান, পরিকল্পনাকারী রাজীব গান্ধী, হাদিসুর রহমান সাগর, অস্ত্র সরবরাহকারী মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, সংগঠক সোহেল মাহফুজ ও রাশেদুল ইসলাম র্যাশ। পলাতক রয়েছেন দুই জঙ্গি। এরা হলেন, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালিদ ও মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন। এরা ভারতে আত্মগোপন করে আছেন বলে গোয়েন্দাদের ধারণা।

মামলাটি বর্তমানে ঢাকার সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমানের আদালতে বিচারাধীন। এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর(পিপি) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, অভিযোগ গঠনের পর দুটি ধার্য তারিখে আসামি হাজির না হওয়ায় সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি। বাকি সব কার্য দিবসে সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এভাবে সাক্ষ্য গ্রহণ চললে হয়তো এ বছরে মামলাটির বিচার শেষ হবে।

কর্মসূচি:হলি আর্টিজান হামলায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গুলশান ২ নম্বরের ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর প্লটের বাড়িটি আজ সোমবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। এছাড়া হলি আর্টিজান ট্র্যজেডি দিবস পালন করবে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

এ প্রসঙ্গে গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহবুব আলম বলেন, জঙ্গি হামলার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আজ ৩ ঘন্টার জন্য ঘটনাস্থলটি উন্মুক্ত রাখা হবে। বাড়ির সামনে একটি বেদী স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে যে কেউ এসে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। তিনি জানান, ইতালির নয় নাগরিকের স্মরণে দেশটির একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে শ্রদ্ধা জানাবেন। জাপানি দুতাবাস থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হবে। পুলিশের পক্ষ থেকেও নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments