জিডি হয়, তদন্ত হয় না, তাই মেলে না প্রতিকারও

172

আলোকিত সকাল ডেস্ক:৩৯

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের বেশিরভাগ থানায় নথিভুক্ত জিডির তদন্ত হয় না। দেশের কোথাও না কোথাও কাউকে না কাউকে নানা রকম হুমকি দেয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। সশরীরে, চিরকুটে, এসএমএসে, টেলিফোনে কিংবা অন্য কোনও মাধ্যমে চাঁদা দাবি অথবা অন্য কোনও কারণে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে অজ্ঞাত অপরাধীরা।

ছাত্র-শিক্ষক, গৃহিনি, ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক কর্মী, চাকরিজীবী, শ্রমজীবী, রাজনীতিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে নানা কারণে হুমকিতে পড়তে হচ্ছে। নিজেদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের সাহায্য পেতে থানায় সাধারণ ডায়রি (জিডি) করে থাকেন ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা। এ ছাড়া মূল্যবান কোনও জিনিস যেমন- সনদপত্র, দলিল, লাইসেন্স, পাসপোর্ট, রসিদ, চেকবই, ক্রেডিট কার্ড, স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ ইত্যাদি হারালেও থানায় জিডি করা হয়। আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকলেও জিডি করা হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেন-দরবার না করলে ওইসব জিডি বা সাধারণ ডায়রির তদন্ত হয় না বললেই চলে।

তবে ব্যতিক্রম শুধু ভিআইপি বা প্রভাবশালীদের বেলায়। থানায় জিডি হলে সাথে সাথে সক্রিয় হয়ে ওঠে পুলিশ। ক্ষেত্র-বিশেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তারও ব্যবস্থা করা হয় তৎক্ষণাৎ। কিন্তু সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে জিডির একটি নম্বর দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে থানা পুলিশ। যথাযথ তদবির করা হলে তবেই কিছু তৎপরতা দেখা যায়। অন্যথায় থানায় জিডি পড়ে থাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। আবার অনেক সময় জিডির কপির হদিসও থাকে না। আর এসব কারণে সাধারণ মানুষ হুমকিতে পড়লেও পারতপক্ষে থানা পুলিশের কাছে যেতে চান না জিডি করার জন্য। তখন উপায় না দেখে অনেক সময় তারা বাধ্য হন প্রতিপক্ষের সাথে আপস-মীমাংসায় যেতে অথবা নিয়তির হাতে নিজেদের শপে দেন।

দৈনিক জাগরণ-এর এই প্রতিবেদকের কাছে একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, জিডিতে সমাধানের চেয়ে বিপদ বরং বাড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ কোনও খোঁজই নেয় না। উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়। আর পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও অগ্রগতি থাকে না তেমন। এ ক্ষেত্রে পুলিশের সহযোগিতা তো মেলেই না বরং যাদের বিরুদ্ধে জিডি করা হয় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করার পর বেশ কয়েকজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এমন ঘটনার নজির রয়েছে খোদ রাজধানীতেই। গত ২০১৭ সালে অপহরণের পর হত্যা করা হয় পল্লবীর আবদুল কুদ্দুস নামের একজনকে। এর আগে তার পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়রি বা জিডি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই জিডির তদন্ত হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে কোনও সহযোগিতা মেলেনি।

চাঁদা না দেয়ায় ২০১৭ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর শ্যাওড়াপাড়ায় ঝুট ব্যবসায়ী নূরুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুর আগে নূরুল ইসলাম নিরাপত্তা চেয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি করেছিলেন কিন্তু থানা পুলিশ কোনও সহায়তা করেনি।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন থানায় এক লাখের বেশি জিডি করা হয়েছে। ওইসব জিডি ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। জিডির তদন্ত না হওয়ায় মানুষের জীবন হয়ে উঠছে সঙ্কটাপন্ন।

তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অগনিত মামলা তদন্ত করার জন্যই পর্যাপ্ত সময় মেলে না। সেখানে সব জিডির তদন্ত করাটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার কিছু জিডির তদন্ত করে ঘটনার সূত্রই পাওয়া যায় না।

এদিকে যথাযথভাবে জিডির তদন্ত না হওয়ায় তার ভিত্তিতে র‌্যাব ও পুলিশের করা ‘নিখোঁজ তালিকা’ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা রকম বিভ্রান্তি। উঠছে নানা প্রশ্ন। ওই তালিকায় এমন অনেকের নামও রয়েছে যারা আগেই বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে ফিরে এসেছেন। অথচ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তা জানেনই না। আবার কেউ কেউ র‌্যাব-পুলিশের হেফাজতেও আছেন।

গত বছর রাজধানীর পল্টন এলাকা থেকে নিখোঁজ হন ঢাকার ব্যাংক কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম। এ বিষয়ে পল্টন মডেল থানায় জিডি করে তার পরিবার। কিন্তু এ নিয়ে পরে কোনও তদন্তই করেনি পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার সাতদিন পরই বাসায় ফিরে আসেন সাইদুল ইসলাম। অথচ সম্প্রতি র‌্যাবের প্রকাশ করা নিখোঁজ তালিকায় উঠে এসেছে সেই সাইদুল ইসলামের নাম।

হাবিবুর রহমান নামের এক যুবক ১০-১২ দিন আগে ঢাকার অদূরে আশুলিয়া থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর তার বড় ভাই মহিবুর রহমান আশুলিয়া থানায় জিডি করেন। মহিবুর অভিযোগ করে বলেন, জিডি করার পর পুলিশ তদন্তই করেনি। বাড়ির অন্যদের সঙ্গে রাগ করে আমার ভাই বাসা থেকে বের চলে যায়। কিছুদিন পর বাড়িতে ফিরে আসেন। অথচ র‌্যাবের নিখোঁজ তালিকায় তার নাম ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। পুলিশ যদি সঠিক সময় তদন্ত করতো তাহলে র‌্যাবও জানতে পারতো। তাদের এই ভুল হতো না।

গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর জিডির তদন্ত শুরু করার পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করার কাজ শুরু হয়। তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর একটি সংস্থা তদন্ত করে পুলিশ সদর দফতরে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তাতেও বলা হয়েছে, তালিকার নাম নিয়ে নানা রকম বিভ্রান্তি রয়েছে।

গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর কমান্ডো অভিযানে নিহত মীর সামিহ মোবাশ্বের বাসা থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন এর আগে। এ বিষয়ে তার বাবা মীর হায়াত কবির গুলশান থানায় জিডি করেছিলেন। মীর হায়াত কবির সম্প্রতি বলেন, জিডি করার পর তদন্তের ব্যাপারে পুলিশের তেমন একটা আগ্রহ ছিল না। ছেলেকে ফেরত পেতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ এমন কোনও লোক ছিল না যে তাদের কাছে যাইনি। কেউ আমাকে পাত্তাই দেয়নি। গুলশানে ঘটনা ঘটার পর হইচই শুরু হয়। এখন অনেকে অনেক কথা বলছেন। এ প্রসঙ্গে ডিএমপির গুলশান জোনের উপ-কমিশনার মোস্তাক আহমেদ অবশ্য বলেন, মোবাশ্বের নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশ ভালো করেই তদন্ত করেছে। তাকে উদ্ধার করতে যা যা করা দরকার তাই করা হয়েছিল।

গুলশানের ঘটনায় নিহত রোহান ইমতিয়াজও নিখোঁজ ছিল মাস ছয়েক আগে থেকে। তার বাবা ইমতিয়াজ আহমেদ বাবুল বলেন, সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পরপরই মোহাম্মদপুর থানায় জিডি করেছিলাম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা শুধু আশ্বাসই দিয়েছিলেন। পুলিশ যদি আরেকটু আন্তরিক হতো তাহলে সন্তানকে জঙ্গির পথ থেকে বের করে আনা সম্ভব হতো। তবে এ প্রসঙ্গে ডিএমপির তেজগাঁও জোনের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার জানান, রোহান নিখোঁজ হওয়ার পর জোরে-শোরে তদন্ত হয়েছিল। তাকে উদ্ধার করতে পুলিশের চেষ্টায় কমতি ছিল না।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের হিজলহাটি এলাকার সোহেল রানা (২৮) নিখোঁজ হন গত বছর ২১ মে। এরপর তার মা রাহেলা বেগম কালিয়াকৈর থানায় জিডি করেন। রাহেলা বেগম বলেন, পুলিশ কী তদন্ত করছে তা আমরা জানি না। পুলিশ আমাদের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ করেনি। ছেলের সন্ধান পেতে বারবার পুলিশের কাছে গিয়েও কোনও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে তৎকালীন গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন-অর-রশিদ বলেন, নিখোঁজ সোহেলকে উদ্ধার করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। জিডির তদন্ত চলছে।
রাজধানীর একটি থানার কার্যক্রম- প্রতীকী ছবি

জিডির তদন্ত না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘‘ভুক্তভোগীরা থানায় জিডি করার পর পুলিশ তদন্ত করছে না, এমন অভিযোগ মাঝে-মধ্যে পাওয়া যায়। তবে বেশিরভাগ জিডির তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এখনও যেসব জিডি ফাইলবন্দি হয়ে আছে সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হবে।’’

আস/এসআইসু

Facebook Comments