ডিও লেটার কমিটিতে ক্ষুব্ধ তৃণমূল আ.লীগ

284

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে তৃণমূল আওয়ামী লীগের। মূল দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমন্বয় নেই সহযোগী সংগঠনগুলোর। এক সংগঠন আরেক সংগঠনকে পাত্তা দেয় না। যে যার মতো করে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিশেষ করে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ, যুব মহিলা লীগ, কৃষক লীগ এবং শ্রমিক লীগের ব্যাপারে এমন অসাংগঠনিক কার্যক্রমের অভিযোগ রয়েছে।

এসব অসাংগঠনিক কার্যক্রমের জন্য ডিও লেটার কমিটি এবং কেন্দ্রের প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কমিটি ঘোষণাকেই দায়ী করেছেন আওয়ামী লীগের জেলাপর্যায়ের নেতারা।

তথ্য মতে, টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলেও আওয়ামী লীগের তৃণমূলে সাংগঠনিক অবস্থা শক্তিশালী হয়নি।

ক্ষমতাসীন হওয়ার কারণে সেটা বুঝা না গেলেও বিশ্লেষণে এমনটাই প্রকাশ পাচ্ছে। দলটির মূলদলসহ সহযোগী সংগঠনের বিগত ১০ বছরে যারা নেতৃত্বে এসেছেন, তারা অনেকেই অতীতে ছিলেন নিষ্ক্রিয় বা অন্য দলে। ক্ষমতায় আসার পর নানা কৌশলে পদ বাগিয়ে শুধু অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন, দলের জন্য কিছুই করেননি।

স্থানীয় রাজনীতিতে এদের অতীতে প্রভাব না থাকলেও স্থানীয় সাংসদের ডিও লেটার এবং কেন্দ্রের প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কমিটির নেতা বনে যাওয়ার পর ক্ষমতাবান হয়েছেন। নিজস্ব কিছু লোকের বলয় সৃষ্টি করে এরা গোটা এলাকায় রাজত্ব করে চলেছেন।

কেন্দ্রীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় বা এমপির মাধ্যমে সরাসরি নেতা বনে যাওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের তোয়াক্কা করেন না। আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে সহযোগিতা তো দূরে থাক অনেক সময় কর্মসূচি পালনেও বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন। ঢাকার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এমন তথ্য জানা গেছে।

এদিকে, গত ১৫ জুন বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সভায় ডিও লেটার কমিটি এবং কেন্দ্রের প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঘোষিত কমিটির বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বেশ কয়েকটি জেলার নেতারা।

কমিটি গঠনে জেলার নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় না করাসহ স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সদস্যদের দলে স্থান দেয়ার অভিযোগ করেন তারা। ওইসব নেতারা অভিযোগ করেন- জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সহযোগী সংগঠনের অবস্থা খুবই নাজুক। সংগঠনের কমিটি গঠনের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়।

যোগ্যতা না থাকলেও এমপিদের চাহিদা মোতাবেক কমিটিতে পদ দিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। আবার অনেকেই স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি না করলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কোনো রকমের পরিচিত হলেই বিজ্ঞপ্তির কমিটিতে বড় পদ বাগিয়ে নিচ্ছেন।

অনেক কমিটিতে ভিন্ন দলসহ স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সদস্যদেরও পদে আনা হচ্ছে। পরবর্তীতে ওইসব নেতারা আওয়ামী লীগকে দলীয় কর্মসূচি পালনে সহযোগিতা করে না, যার কারণে দলীয় কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে।

ওইসভায় গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি চৌধুরী এমদাদুল হক বলেন, সহযোগী সংগঠগুলোর মধ্যে ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ আর একটি সংগঠনের কমিটি সম্মেলন করে করা হয়েছে। বাকিদের কমিটি কেন্দ্র থেকে ঠিক করে দেয়া হয়েছে। কমিটি গঠনের বিষয়ে জেলা কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি।

এই সংগঠনগুলো নিয়ে আমাদের বিভ্রান্তির মধ্যে পড়তে হয়। এই কমিটির কাজ নিয়ন্ত্রণ করে কেন্দ্র। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হচ্ছে- আওয়ামী লীগে ঢোকার যোগ্যতা নেই, নিয়ম নেই। বিভিন্ন সময় কেন্দ্র থেকে কমিটিগুলো করে দেয়া হয়। তারা কাজ করে তাদের মতো।

রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ইরাদত আলী বলেন, সহযোগী সংগঠন নিয়ে খুবই সমস্যার মধ্যে রয়েছি। আমাদের এখানে যুবলীগ ১৪ বছর আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছে। যুবলীগের সাংগঠনিক অবস্থা বলতে পারি মুখথুবড়ে পড়েছে। আবার ডিও লেটারের মাধ্যমে কমিটি দেয়া হয়। ডিও লেটারের মাধ্যমে কমিটি হলে খুবই খারাপ হয়।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, এখানে যুব মহিলা লীগ ও কৃষক লীগ নিয়ে জটিলতা রয়েছে, যারা কোনো দিনও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়।

বরং আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সদস্যদের এখানে স্থান দেয়া হয়। আমরা এ বিষয়ে কেন্দ্রকে অবহিত করেও কোনো উত্তর পাইনি। সহযোগী সংগঠনের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাই না। অথচ আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগঠন করলে আরও বেশি গতি সঞ্চার করতে পারি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই বলেন, আমাদের ৬ থানার ১২ জনের মধ্যে ৬ জনই ভারপ্রাপ্ত। এগুলো ভারমুক্ত করতে চাই। তিনি বলেন, তৃণমূলের প্রশাসন এমপি-মন্ত্রীদের বেশি গুরুত্ব দেয়।

আওয়ামী লীগের নেতাদের সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয় না। এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা বা নির্দেশনা দেয়া যায় কিনা সে বিষয়ে ভেবে দেখতে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অনল কুমার দে বলেন, সহযোগী সংগঠনগুলোর অবস্থা ভালো না। দীর্ঘদিন ধরে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছে। আমাদের আরও অনেক কথা আছে। সব কথা প্রকাশ্যে বলা যায় না।

রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জিল্লুর হাকিম বলেন, যারা সংগঠনবিরোধী কাজ করেন তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় আমরা ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে কেন্দ্রে পাঠাই। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত পাইনি। আমাদের সাংগঠনিক কাঠামোতে আছে- জেলা-উপজেলার সুপারিশের পর ৯০ দিনের মধ্যে যদি কেন্দ্রীয় কমিটি সিদ্ধান্ত না দেয় তাহলে সেটা বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু আমি মনে করি এটা উল্টো হওয়া উচিত- তৃণমূলের সুপারিশের পর ৯০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত না দিলে সুপারিশ কার্যকর হয়ে যাবে।

সূত্র মতে, সারাদেশে আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক কমিটি রয়েছে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের মধ্যেই বেশিরভাগ জেলার ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরই মধ্যে প্রায় প্রতিটি কমিটি অনেক আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধশত কমিটিতে রয়েছে অন্তর্কোন্দল।

তারা যার যার মতো কাজ করছে। অন্যদিকে, সহযোগী সংগঠনগুলোরও একই অবস্থা। অধিকাংশ জেলা ও উপজেলার যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। কিছু উপজেলায় দেখানো সম্মেলন করে পকেট কমিটি গঠন করা হয়েছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজেই ওইসব কমিটি গঠন ও পরিচালনা করছেন। আবার কেন্দ্র হতে বেশ কিছু জেলা, উপজেলা ও ইউনিটের যুবলীগ, ছাত্রলীগের আহ্বায়ক এবং পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে সম্মেলন ছাড়াই।

ওইসব কমিটিতে স্থানীয় রাজনীতির অপরিচিত মুখও রয়েছেন শীর্ষ পদে। ছাত্রলীগের সোহাগ-জাকির মেয়াদে এবং বর্তমান শোভন-রাব্বানীর মেয়াদে অন্তত ৪০টি ইউনিটের কমিটির ঘোষণা করা হয়েছে সম্মেলন ছাড়াই। যার কারণে সুক্ষ্ন যাচাই-বাছাই না করাই ভিন্ন পন্থিদের জায়গা হয়েছে ছাত্রলীগে।

যা নিয়ে গত ৩ বছরে বেশ কয়েকবার সমালোচনার সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, দল করতে হলে যোগ্যতার সঙ্গে আনুগত্যের প্রয়োজন। তৃণমূলে দলের অন্তর্কলহ দূর করতে হবে। আওয়ামী লীগ যেন আওয়ামী লীগের শত্রু না হয়। কলহ-বিদ্রোহ না হয়। আমরা চাই জেলাপর্যায়ে সিনিয়র নেতা যারা আছেন, তারাই বসে দলের মধ্যকার এই কলহগুলোর সমাধান করবেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments