ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত সিংহভাগই শিশু

167

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ডেঙ্গু জ্বরে দেশে যত মানুষ মারা যাচ্ছে, তার অর্ধেকের বেশি শিশু। যেসব রোগী দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গু দেশ থেকে যাবে না। তাই সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগ মোকাবিলা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক কাজী তারিকুল ইসলাম বলেন, রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে। রোগের ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে। এতে আগের চেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে।

রাজধানীতে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭৩ জন নতুন করে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সব মিলিয়ে চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৭শত ২৪ জনেরও বেশি। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে ২০ জনের আক্রান্ত হবার খবর মিলেছে। যদিও আক্রান্তদের মধ্যে ২,৯০০ জনই সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১১ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শতকরা ৩৪ শতাংশ শিশু। আর নারীদের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ। এই তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ অধিদপ্তরের ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম সূত্রে সরকারি ,আধা সরকারি ও বেসরকারি মোট ৪৭টি হাসপাতাল থেকে পাওয়া।

তথ্যে দেখা যায়, চলতি জুলাই মাসে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া এক হাজার একশ’ ২৮ জন ডেঙ্গু রোগীর লিঙ্গভিত্তিক পরিচয় বিশ্লেষণ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এদের মধ্যে ৩শত ৫৮ জন শিশু ডেঙ্গু রোগী।

এ ব্যাপারে কন্ট্রোল রুমের দায়িত্ব প্রাপ্ত ডা. আয়শা আক্তার বলেন শিশুর পরিস্থিতি দেখতে পৃথকভাবে হিসাব রাখা শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পর্যায় ক্রমে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সব রোগীর লিঙ্গ ভিত্তিক পরিচয় রাখা হবে। ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ডেঙ্গুর ব্যাপকতা বৃদ্ধি বিবেচনায় রেখে গত বছর থেকেই ঢাকা শিশু হাসপাতাল আলাদা ভাবে ডেঙ্গু রোগীর হিসাব রাখছে। তাদের হিসাব চলছে ২০১৮ সালের ৪ জুলাই থেকে চলতি বছরের ১০ জুলাই পর্যন্ত প্রায় এক হাজারের মতো শিশু ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছে। এদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ শিশুর বয়স ৫ বছরের কম। আর মোট আক্রান্তের ৯৮ শতাংশের বয়স ১২ বছরের নিচে। চলতি বছরও ভর্তি হয়েছে একশ’ ২৬ জন শিশু। এর মধ্যে গত পহেলা জুন সূত্রাপুরের ১২ বছরের একটি শিশু মারা গেছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে অনুসন্ধানে জানা যায় শিশু মৃত্যুর সরকারি হিসাবে এই শিশুর মৃত্যুর হিসাব নেই।

তবে পরিস্থিতির যাতে অবনতি না হয় সেজন্য এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের জন্য বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে সবার আরও সচেতনতার ওপর জোর দেন মশা নিয়ে গবেষণাকারী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কবিনুল বাশার। তার মতে, কয়েকটি কারণে এবার ডেঙ্গু প্রকোপ বেশি হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই সচেতন হওয়া বেশি জরুরি।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পুরনো ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল এবং সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ওয়ার্ডে সাধারণ রোগীর সঙ্গে ডেঙ্গু রোগী রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এতে করে ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে আশপাশের অন্যান্য রোগী। এ আশঙ্কা থেকে ওই সকল ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগী এবং স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড ও বিছানা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থার দাবি জানান হাসপাতালে থাকা রোগী ও স্বজনরা।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, আমরা ডেঙ্গু মশা নিধনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের জনবল স্বল্পতার কারণেও আমরা তাৎক্ষণিক সব বিষয়ে সমাধান দিতে পারছি না। তাছাড়া শুধু মশা নিধনেই ডেঙ্গু মশার নির্মূল হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। জনগণকে নিয়ে ডেঙ্গু মশা নিধনের পাশাপাশি বাড়ির আঙ্গিনায় জমে থাকা পানি, ডাবের খোসায় জমে থাকা পানি ও ফুলের টবের পানি ফেলে দেয়া। তা হলেই ডেঙ্গু মশা নিধন সম্ভব হবে। এ রোগে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার কমে আসবে।

এদিকে বিএসএমএমইউর মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, এ বছর পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে আসছে। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রকোপ বেশি। তাই বলে ডেঙ্গুকে মহামারী বলা যাবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে তা ছড়িয়ে বিভাগীয় শহরে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান বলেন, চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা খুবই কম। চলতি জুলাই মাসে মাত্র দুজন রোগী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মেয়র, স্বাস্থ্য বিভাগ ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে বলে সিভিল সার্জন জানান।

আস/এসআইসু

Facebook Comments