ডেঙ্গু জ্বরে প্যারাসিটামল ব্যতীত অন্য ওষুধে নিষেধাজ্ঞা

234

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানী ঢাকায় এখন ডেঙ্গু আতঙ্ক। এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর সিজন হলেও সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত। এবারে ডেঙ্গুর চার ধরনের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক সেরোটাইপ-৩-এ অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন।

দ্রুত প্লাটিলেট কমে যাওয়া এবং কিডনি, ফুসফুস, লিভারসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে সংক্রমণ হওয়ায় অনেক রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হচ্ছে। ডেঙ্গু জ্বরের যে চেনা লক্ষণ তার পরিবর্তন ঘটেছে। জ্বর কমে যাওয়ার পরও হুট করে প্লাটিলেট কমছে কারও কারও।

রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
গত বুধবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে স্কয়ার হাসপাতালে ডা. নিগার নাহিদ দিপু নামে এক নারী চিকিৎসক মারা গেছেন। এর আগে দুই শিশু মারা যায় ডেঙ্গুতে।

মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষই আক্রান্ত হচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট ঘোষণার কয়েক দিন আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। সর্বশেষ টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জোয়াহেরুল ইসলাম ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতর। এতে মূলত দেশের জনগণকে এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে নিষেধ করা সহ চিকিৎসার ক্ষেত্রে জাতীয় গাইডলাইন-২০১৮ অনুসরনের জন্য বলা হয়েছে। এতে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের চিকিৎসায় জ্বর নিয়ন্ত্রণে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্যান্য ওষুধগুলো দিতে নিষেধ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক (লাইন ডিরেক্টর, সিডিসি) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব নির্দেশনা জানানো হয়েছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সভায় বিশেষজ্ঞরা বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে জানিয়ে উদ্বিগ্ন না হবার পরামর্শ দিয়েছেন।

এক্ষেত্রে অবশ্য করণীয় গুলো হল- সকল সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা অবশ্যই জাতীয় গাইডলাইন ২০১৮ অনুসরণ করে প্রদান করতে হবে। ডেঙ্গু মৌসুমে যেকোনো জ্বরের রোগীকে চিকিৎসার জন্য দ্রুততার সাথে রেজিস্টার্ড ডাক্তার অথবা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। ডেঙ্গু রোগের ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনাই প্রধান চিকিৎসা। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অবশ্যই গাইড লাইন অনুসরণ করতে হবে। ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে যাদের কো-মরবিডিটি (শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী, ডায়াবেটিস ইত্যাদি) আছে তাদেরকে দ্রুত হাসপাতালে প্রেরণ করতে হবে এবং চিকিৎসা নিতে হবে। কেস, ভেক্টর ও ভাইরাস সম্পর্কিত সার্ভিলেন্স জোরদার করতে হবে। সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনা (কমিউনিটি, প্রাতিষ্ঠানিক ও জাতীয় পর্যায়ে) আরো জোরদার করতে হবে।

এছাড়া এক্ষেত্রে অবশ্য বর্জনীয় বিষয়গুলো হলো- ডেঙ্গু রোগী কে প্যারাসিটামল ব্যতীত এন এস এ আই ডি, স্টেরয়েডস, ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা, প্লাটিলেট কনসেনট্রেট দেওয়া যাবে না। অনিবন্ধিত স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী/স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক জ্বরের চিকিৎসা করা যাবে না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম জানায়, শুক্রবার দুপুর ১২ টা পর্যন্ত রাজধানীতে মোট ৯৩ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
সারা দেশ থেকে এখন পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন মোট ২৬২ জন রোগী।
মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ২৭৭ জন। এর মধ্যে জানুয়ারীতে ৩৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৯ জন, মার্চে ১২ জন, এপ্রিলে ৪৫ জন, মে’তে ১৫৩ এবং জুনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬৯৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া জুলাইতে এই ৭ দিনে গড়ে ৯০ জন করে আক্রান্ত হয়েছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকদের (আইইডিসিআর) মতে, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সময় মুলত জুন থেকে বা বর্ষার শুরু থেকে শুরু হয়। সেক্ষেত্রে প্রথম মাসেই এত রোগী হওয়াটা যথেষ্ট অ্যালার্মিং বিষয়। মূলত সচেতনতার অভাবেই এ রোগ বাড়ছে। বৃষ্টির পানি বাসার আশেপাশে কোথাও জমে থাকতে দেয়া যাবে না। কেননা ডেঙ্গুবাহিত এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। তাই বাসার ফুলের টবসহ এমন কোন জায়াগা রাখা যাবে না যেখানে পানি জমে থাকতে পারে। তাছাড়া এই মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। তাই শুধু রাতে না দিনের বেলাতেও মশা থেকে সাবধান থাকতে হবে। আর এ সময় জ্বর হলেই নিকটস্থ চিকিৎসকের স্বরনাপন্ন হতে হবে। কোন অবস্থাতেই বিলম্ব করা যাবে না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক ও সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এডিস মশার বংশ বিস্তারের উর্বর সময় এখন চলছে, এই গরমের আবহাওয়া এডিস মশার বংশ বিস্তারের জন্য সবচেয়ে উর্বর সময়। তাই এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. শরীফ আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন,আমরা মশা নিধনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। ১৫ আগস্ট থেকে ৪৭৬টি মেডিকেল টিম রাজধানীতে ফ্রি চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দেবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments