তদন্তে নতুন মোড়, ১৩ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ এবং জনমনে নানা প্রশ্ন

2684

বিশেষ সংবাদদাতা

বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এক নম্বর সাক্ষী ও নিহতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে সারাদিন প্রায় ১৩ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড় নিল। মিন্নিকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে স্বামীর হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে গেলেন স্ত্রী। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আজ বুধবার মিন্নিকে আদালতে তোলা হবে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে সদর উপজেলার নয়াকাটা গ্রামের বাড়ি থেকে মিন্নিকে বরগুনা পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যাওয়া হয়। তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরকেও তার সঙ্গে নেওয়া হয়। মিন্নিকে গ্রেফতার দেখানোর পর রাতেই তার বাবাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন সমকালকে জানান, প্রাথমিকভাবে রিফাত হত্যায় তার স্ত্রী মিন্নির সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাই এই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে রিফাত হত্যা পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে মিন্নির প্রত্যক্ষ যোগসূত্র মিলেছে। হত্যাকারীদের সঙ্গে পূর্ব যোগাযোগ ও ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। রিমান্ডে এনে এ ব্যাপারে তাকে আরও বিশদ জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

মিন্নির বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন কিশোর জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম তার বাড়ি থেকে মিন্নিকে ও তাকে কালো মাইক্রোবাসে বরগুনা পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যায়। এ সময় পুলিশ জানায়, একজন আসামি শনাক্ত করার জন্য মিন্নিকে নিতে হবে। গতকাল বিকেল ৫টা ২৩ মিনিটের সময় মিন্নির বাবার কাছে মোবাইলফোনে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইলে তিনি জানান, মিন্নির কাছ থেকে তাকে সকাল ১১টার দিকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। তাকে পুলিশ লাইন্সের গোলঘরে বসতে বলা হয়েছে। মিন্নিকে কোথায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।

গত ২৬ জুন ঘটনার পর থেকে মিন্নি বাড়িতে পুলিশ পাহারায় ছিলেন। সম্প্রতি ঘটনার একটি নতুন ভিডিও প্রকাশ পেলে একটি মহল এ মামলায় মিন্নিকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি আলোচিত হয়। গত ১৩ জুলাই রাতে নিহত রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বরগুনা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে এ মামলায় গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানান। পরদিন ১৪ জুলাই সকালে বরগুনা প্রেস ক্লাবের সামনে সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ, চাচা আবদুল আজীজ শরীফ, জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এমপিপুত্র অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথ ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান মারুফ মৃধা বক্তৃতা করেন। এর পর থেকে শহরে গুঞ্জন শুরু হয়, মিন্নিকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে অথবা গ্রেফতার করবে।

বরগুনা জেলা অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে দায়িত্বরত অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ও জেলা মানবাধিকার জোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট সঞ্জীব দাস বলেন, রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান ও প্রত্যক্ষ সাক্ষী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে এ মামলায় আসামি হিসেবে গ্রেফতার করা হলে এজাহারভুক্ত আসামিদের বিচারে জটিলতা হতে পারে। এমনকি নৃশংস এ ঘটনায় সম্পৃক্ত মূল আসামিরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।

এ ব্যাপারে বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান নান্টু বলেন, মিন্নিকে আসামি হিসেবে গ্রেফতার করা হলে রিফাত শরীফ হত্যা মামলা ডিফেক্টিভ হবে। উচিত ছিল, তাকে সাক্ষী রেখেই তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা। মিন্নিকে প্রধান সাক্ষী রেখে প্রসিকিউশন তৈরি হতে থাকলে, সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা হলে তখন বিষয়টি ডিফিকাল্ট হয়। তিনি বলেন, এই মামলায় মিন্নি শুধু সাক্ষী নয়, আই উইটনেসও বটে। মামলা বিচারে উঠলে অনেকেই সন্ত্রাসীদের ভয়ে সাক্ষ্য দিতে চাইবেন না। তখন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বরগুনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি চিত্তরঞ্জন শীল বলেন, রিফাত হত্যা মামলা মিন্নির আকুতির কারণেই গুরুত্ব পেয়েছে এবং এ পর্যন্ত এসেছে। এখন কোনো কারণে যদি মিন্নি এ মামলায় আসামি হয়ে যায়, তাহলে মামলার বিচার ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে পারে। তিনি বলেন, মিন্নি দোষী হলে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে কোনো বাধা নেই। তবে কোনো মহলের চাপে অথবা প্রভাবের কারণে মামলার মূল আসামিরা রক্ষা পেয়ে যাবে, এটা বরগুনার মানুষ একেবারেই কামনা করে না।

গুঞ্জন রয়েছে, ঘটনার আগের দিন ও ঘটনার দিন ঘাতক নয়ন বন্ড মিন্নির সঙ্গে কথা বলেছে। নয়ন বন্ডের মোটরসাইকেলে মিন্নি ঘুরেছেন। তবে পুলিশ হেফাজতে যাওয়ার আগে মিন্নি এই অভিযোগ অস্বীকার করে সমকালকে জানান, ঘটনার দিন বা আগের দিন নয়ন বন্ডের সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি। শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পক্ষ তাকে টার্গেট করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। এসব কারণে তিনি মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত। ঘটনার আগের দিন মিন্নি রিফাত শরীফের এক আত্মীয়ের বাসায় পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন।

ভাইরাল হওয়া সিসিটিভির যে ফুটেজ নিয়ে বিতর্ক চলছে তাতে দেখা যায়, ঘটনার দিন কলেজের গেট থেকে মিন্নি বেরিয়ে আসছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন রিফাত শরীফ। এদিক-সেদিক তাকিয়ে আবার রিফাতকে কলেজে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন মিন্নি। তখন দুর্বৃত্তরা কলেজ গেট থেকে রিফাতকে ধরে সামনের দিকে নিয়ে যায়। এ সময় মিন্নিকে হাঁটতে দেখা যায়। এরপর নয়ন বন্ড ও অন্যরা যখন রিফাতকে কিল-ঘুষি-লাথি মারতে শুরু করে, তখন তিনি তার স্বামীকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালান।

এই ভিডিওর সূত্রে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, দুর্বৃত্তরা রিফাতকে ধরে নেওয়ার সময় মিন্নি কেন স্বাভাবিকভাবে হাঁটছিলেন? কেন দুর্বৃত্তরা তাকে টার্গেট করেনি? কেন স্বামীকে প্রথমে ধরতে না গিয়ে জুতা তোলার চেষ্টা করেছিলেন মিন্নি?

এদিকে মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

মিন্নিকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে রাত সোয়া ৯টার দিকে বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন তাঁর কার্যালয়ে প্রেস বিফ্রিং করেন। তিনি বলেন, মিন্নিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। রাত ৯টার দিকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ সুপার আরো বলেন, ‘দিনব্যাপী জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এবং এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে এ হত্যাকাণ্ডে মিন্নির সংশ্লিষ্টতা প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। তাই মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন ও সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।’

রিফাত হত্যার সঙ্গে মিন্নির সম্পৃক্ততার ব্যাপারে পুলিশ সুপার বিস্তারিত আর কিছু বলেননি। তবে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে মিন্নিকে আদালতে সোপর্দ করে প্রয়োজনে রিমান্ড চাওয়া হবে।

মিন্নির গ্রেপ্তারের বিষয়ে তাঁর পরিবার দাবি করছে, মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্যই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর রাত সাড়ে ৯টার দিকে মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, রিফাত হত্যা মামলার এক আসামিকে শনাক্তের কথা বলে মিন্নিকে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাসা থেকে পুলিশ লাইনসে নিয়ে আসে। তিনিও মিন্নির সঙ্গে পুলিশের পিকআপে করে পুলিশ লাইনসে চলে আসেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশ লাইনে আমাকে একটি কক্ষে বসিয়ে রেখে মিন্নিকে পুলিশ ভেতরে নিয়ে যায়। সেই থেকে ১২ ঘণ্টা আমি ওই কক্ষেই ছিলাম। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় মিন্নিকে তারা জিজ্ঞাসাবাদের নামে মানসিক নির্যাতন করে।’

মোজাম্মেল হোসেন আরো বলেন, ‘আমার মেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার স্বামীকে রক্ষার চেষ্টা করেছিল। একই সঙ্গে ঘটনার সময় উপস্থিত লোকজনের সহযোগিতা চেয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে থাকা নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজির ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। শুরু থেকেই প্রভাবশালীরা আমার মেয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে আসছিল। সেই অপপ্রচারের সূত্র ধরেই পুলিশ প্রভাবশালীদের বাঁচাতেই আমার মেয়েকে গ্রেপ্তার করেছে।’

মিন্নিকে পুলিশ লাইনসে নেওয়ার বিষয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার নিজ কার্যালয়ে দুপুরের দিকে সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি বলেন, মিন্নি এই মামলার এক নম্বর সাক্ষী। তাই তাঁর জবানবন্দি নেওয়ার জন্য স্বজনসহ তাঁকে পুলিশ লাইনসে আনা হয়েছে। তিনি জানান, রিফাত হত্যার পর থেকেই মিন্নি ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার জন্য তাঁদের বাড়িতে পুলিশ পাহারা বসানো হয়। তা এখনো রয়েছে।

নয়ন বন্ডের বাসায় পুলিশ

রিফাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডের বাসায় পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। সোমবার রাতে ওই অভিযান চালানো হয় বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। অভিযানের সময় নয়ন বন্ডের মা সাহিদা বেগম পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, বরগুনা সরকারি কলেজের দেয়াল ঘেঁষেই নয়ন বন্ডের বাসা। নয়নের সঙ্গে ওই বাসাতেই তার মা সাহিদা বেগম বসবাস করতেন। কিন্তু ঘটনার পর থেকেই নয়ন বন্ডের মা ওই বাসায় তালা ঝুলিয়ে অন্যত্র চলে যান। নয়ন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর তার লাশ গ্রহণ করেন সাহিদার ভাই। নয়নের মা তাঁর ভাইয়ের গৌরীচন্নার বাসায় অবস্থান করছিলেন।

সোমবার রাত ১০টার দিকে পুলিশের একটি দল নয়নের বাসার সামনে আসেন। তখন নয়ন বন্ডের মা তাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি তালা খুলে দিলে পুলিশ প্রশাসনের সদস্যরা ঘরে প্রবেশ করেন। ঘণ্টা দেড়েক পর পুলিশ সদস্যরা বাসা থেকে চলে যান। তাঁরা আলামত হিসেবে বেশ কিছু জিনিস নিয়ে যান।

হঠাৎ আলোচনায় নয়নের মা

ঘটনার পর থেকে নয়নের মা সাহিদা অনেকটা আত্মগোপনে ছিলেন। এরই মধ্যে তাঁকে উদ্ধৃত করে অনলাইন পোর্টালে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। সেখানে নয়নের গডফাদারের নাম প্রকাশ করা হয়। পরে বরগুনার সংবাদকর্মীরা নয়নের মাকে খুঁজে বের করেন। প্রথম দিকে তিনি নয়নের ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দেননি। কিন্তু হঠাৎ করেই নয়নের মা দুটি ঘটনার জন্য মিন্নিকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন। বলেন, মিন্নির ব্যবহারের অনেক কিছু তাঁর ঘরে রয়েছে।

নয়ন বন্ডের মায়ের বক্তব্যের সূত্র ধরেই রিফাতের বাবা মিন্নির বিরুদ্ধে খুনের ঘটনার সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলেন। শনিবার রাতে রিফাতের বাবা বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে মিন্নির গ্রেপ্তার দাবি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, এ হত্যার সঙ্গে মিন্নি জড়িত। কারণ হিসেবে তিনি সংবাদ সম্মেলনে নয়ন বন্ডের মায়ের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেন। ওই সংবাদ সম্মেলনের আগে ও পরে প্রেস ক্লাবে এমপিপুত্র সুনাম দেবনাথের উপস্থিতি আলোচনার জন্ম দেয়।

সংবাদ সম্মেলনের পরের দিন রবিবার রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় স্ত্রী মিন্নির গ্রেপ্তারের দাবিতে বরগুনা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন হয়। মানববন্ধনে স্থানীয় সাংসদের ছেলে ও বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক সুনাম দেবনাথ বক্তব্য দেন। ‘বরগুনার সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে সুনামের অনুসারীরা অংশ নেয়। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, রিফাত হত্যায় তাঁর স্ত্রী মিন্নি জড়িত। তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবি করেন তাঁরা।

ওই ঘটনার পর রবিবার দুপুরে মিন্নি তাঁর বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, যাঁরা বরগুনায় ‘বন্ড ০০৭’ নামে সন্ত্রাসী গ্রুপ সৃষ্টি করিয়েছিলেন, তাঁরা খুবই ক্ষমতাবান এবং অর্থবিত্তশালী। নেপথ্যের এই ক্ষমতাবানরা বিচারের আওতা থেকে দূরে থাকার জন্য হত্যা মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তাঁর শ্বশুরের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে সংবাদ সম্মেলন করিয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে তাঁর স্ত্রী মিন্নির সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রিফাতকে কোপানোর ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, দুজন রাম দা দিয়ে রিফাতকে কোপাচ্ছে। মিন্নি তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করছেন। একজনকে ঠেলে সরিয়ে দিলে অন্যজন এসে রিফাতকে কোপাচ্ছে। স্বামীকে বাঁচাতে তিনি বারবার চিৎকার করছিলেন। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। দুর্বৃত্তরা রিফাতকে কুপিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায়। বিকেলে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ওই দিন রাতেই রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বরগুনা থানায় ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। এ ছাড়া সন্দেহভাজন হিসেবে অজ্ঞাতপরিচয় আরো চার-পাঁচজনকে আসামি করেন। মামলায় মিন্নিকে প্রধান সাক্ষী করা হয়। খুনের মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়।

মামলার এজাহারভুক্ত ছয় আসামিসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। মামলার দুই নম্বর আসামি রিফাত ফরাজীসহ বাকি তিন আসামি এখনো রিমান্ডে আছে। মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। পুলিশ বলছে, তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

যা বললেন পুলিশ সুপার : গত কয়েকদিন ধরে দেশজুড়ে শুধু একটাই আলোচনা চলছে। স্ত্রীর সামনে স্বামীকে খুন। আর তাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল শ খানেক লোক। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসল না। এ নিয়ে উত্তাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। রিফাত শরীফের (২২) মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে বরগুনায় প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত রিফাত শরিফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি অবশেষে গ্রেফতার হয়েছেন। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পর নানা আলোচনা-সমালোচনায় মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) দিনভর জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) রাত ৯টার দিকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

গণমাধ্যমকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন। তিনি বলেন, রিফাত শরীফ হত্যা মামলার ১ নম্বর সাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শী মিন্নি। তার বক্তব্য রেকর্ড ও তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বরগুনা পুলিশ লাইনে আনা হয়। রাতে তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তার কথাবার্তায় সন্দেহ হয় পুলিশের।

মিন্নিকে গ্রেফতার দেখানোর পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন পুলিশ সুপার। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে ও অন্যান্য সোর্স থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্নির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। তাই রাত ৯টার সময় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, আলোচিত রিফাত রিফাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাদকের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত কারণ ও আক্রোশের জন্য এই রোমমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্নি সরাসরি সম্পৃক্ত। এজন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এর আগে, মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) সকাল সোয়া ১০টার দিকে বরগুনা পৌরসভার মাইট এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে পুলিশ লাইনে আনা হয়েছিল।

রিফাত হত্যার পর পরই অনেকেই মিন্নিকে দোষারোপ করে তাকে গ্রেফতারের দাবি তুলে। স্যোস্যাল মিডিয়াসহ সারা দেশে বিতর্কের ঝড় বইতে শুরু করে। এরপর গত শনিবার (৬ জুলাই) নতুন একটি সিসিটিভি ফুটেজে মিন্নির স্বাভাবিকভাবে হাঁটার কারণে অনেকেই তাকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ভিডিও ফুটেজের ৫ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে দেখা গেছে, নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজীসহ ১০-১২ জন রিফাতকে মারধর করতে করতে বরগুনা সরকারি কলেজ থেকে বের হচ্ছে। এদের মধ্যে একজন পেছন থেকে রিফাতকে ধরে রেখেছে। বাকি দুজন দুই হাত ধরেছে। ৫ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের ফুটেজে মিন্নিকে দেখা যায়, তার বাম হাতে একটি পার্স ছিল। তিনি পার্স হাতে স্বাভাবিকভাবে হাঁটছিল। একবার ডানেও তাকিয়েছেন কলেজের দিকে।

ভিডিও ফুটেজে আরও দেখা যায়, নয়নের সঙ্গীরা যখন রিফাতের মাথায় আঘাত করছিল তখনও স্বাভাবিক ছিলেন মিন্নি। ৫ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে যখন সব বন্ধুরা একসঙ্গে রিফাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন তখন প্রথমবারের মতো দৌড়ে যান মিন্নি। প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। যখন দা বের করে রিফাতকে কোপানো শুরু হয় তখন পেছন থেকে মিন্নিকে প্রতিরোধ করতে দেখা যায়।

এ ঘটনার পর নয়ন ও তার সঙ্গীরা পালিয়ে যাওয়ার পর কোনও একজন মিন্নিকে তার পার্সটি মাটি থেকে হাতে তুলে দেন। মিন্নি স্বাভাবিকভাবে সামনের দিকে হাঁটতে থাকেন। এ ঘটনার ৮ মিনিট পর একটি মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থলে আসেন পুলিশের দুই কর্মকর্তা।

এদিকে গত শনিবার (১৩ জুলাই) রাতে সংবাদ সম্মেলনে পুত্রবধূ আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে দায়ী করে গ্রেফতার করার দাবি জানিয়েছিলেন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ।

যেভাবে মিন্নিকে আটক করে : প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রিফাত শরীফ হত্যায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে মিন্নিকে গ্রেফতার দেখানো হয় বলে জানিয়েছেন বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন।

তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে রিফাত হত্যাকাণ্ডে তার স্ত্রী মিন্নির সংশ্লিষ্টতা পেয়েছি। তাই তাকে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ দেখানো হয়েছে। আপাতত সে পুলিশ হেফাজতে থাকবে। বুধবার তাকে আদালতে নেয়া হতে পারে।

এর আগে দুপুরে মিন্নিকে তার বাসা থেকে বরগুনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নেয়া হয়। তখন পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, মিন্নি মামলার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। মামলার স্বার্থে তাকে ডেকে আনা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির চাচা আবু সালেহ জানান, সকাল পৌনে ১০টার দিকে মিন্নিকে আনার জন্য নারী পুলিশের একটি দল তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের বাড়িতে যায়।

তিনি বলেন, পুলিশ মিন্নির পরিবারকে জানিয়েছিল- রিফাত হত্যা মামলার আসামিদের শনাক্ত ও মামলার বিষয়ে কথা বলার জন্য তাকে পুলিশ লাইনসে যেতে হবে।

গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনের রাস্তায় প্রকাশ্যে সবার সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার স্ত্রী বাধা দিলেও আটকাতে পারেননি হামলাকারীদের। রিফাতের পরিবারসহ স্থানীয়রা সেসময় জানান, নয়ন বন্ডের নেতৃত্বে তার সহযোগীরাই রিফাতকে হত্যা করেছে।

এ ঘটনায় নয়ন বন্ডসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে ও আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন রিফাতের বাবা। মিন্নি ছিলেন সেই মামলার সাক্ষী।

তবে গত ১৩ জুলাই রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ সংবাদ সম্মেলনে জানান, সিসিটিভি ফুটেজে পুত্রবধু মিন্নির গতিবিধি সন্দেহজনক। পরবর্তীতে সে হামলাকারীদের নিবৃত্ত করতে চাইলেও বিষয়টি তার কাছে পরিকল্পিত বলে মনে হয়। তিনি মিন্নিকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার দাবি জানান।

রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে আইনের আওতায় আনার দাবি করে শনিবার (১৩ জুলাই) বরগুনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন নিহত রিফাতের পিতা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ। সম্মেলনে এই হত্যাকাণ্ডে মিন্নি জড়িত ছিল এমন সন্দেহে তিনি ১০টি যুক্তি তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য রাখেন।

এদিকে, মিন্নি তাকে জড়িয়ে শ্বশুরের দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। স্বামী রিফাত হত্যায় তার সম্পৃক্ততা আছে দাবি করে শ্বশুর দুলাল শরীফের দেওয়া বক্তব্যকে ‘বানোয়াট ও মনগড়া’ বলেন মিন্নি। রবিবার (১৪ জুলাই) দুপুরে মিন্নি তার বাবার বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন।

এ মামলার এজাহারভুক্ত ৫ জন আসামি পলাতক রয়েছে। তারা হলো- রিশান ফরাজী, মাসা (বন্ড), রায়হান, মুহায়মিনুল ইসলাম সিফাত ও মো. রিফাত।

তাদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বরগুনা থানার ওসি আবির মোহাম্মাদ হোসেন বলেন, তাদেরকে গ্রেফতারের জন্য বরগুনাসহ সর্বত্র অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শিগগিরই তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের প্রধান গেটের সামনে ঘাতকেরা স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির সামনে প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে রিফাত শরীফকে।

গুরুতর আহত রিফাতকে এদিন বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বিকাল ৪টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

আস/এসআইসু

Facebook Comments