থামছে না শিশু ধর্ষণ

259

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ধর্ষণের মতো বিকৃত সামাজিক ব্যাধির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি নিষ্পাপ শিশুরা। ঘরে-বাইরে সর্বত্র অনিরাপদ হয়ে উঠছে তাদের জীবন। স্কুলে, মাদ্রাসায়, খেলার মাঠে, ঘরের ছাদে কোনো স্থানেই এখন শিশুর নিরাপত্তা নেই। খোদ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রীদের কাছেও নিরাপদ থাকছে না শিশুরা। সভ্যতার বড়াই করা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বক্তৃতা দেওয়া এবং ধর্মীয় বিশুদ্ধতার দাবিদার ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছেই আজ বিপন্ন শিশুরা।

দিন দিন বেড়ে চলেছে শিশু ধর্ষণের ঘটনা। আইন বা ধর্ম কোনো কিছু দিয়েও থামানো যাচ্ছে না ভয়াবহ এ বিকৃতাচারকে। ধর্ষণের মতো পাশবিক নির্যাতনেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে রীতিমতো খুনের পথও বেছে নিচ্ছে ধর্ষকরা। গত কয়েক দিনে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার যে খবর প্রকাশ পেয়েছে তাতে আঁতকে উঠেছে দেশের মানুষ। এ নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ, নিন্দা, ঘৃণা প্রকাশ করেছেন তারা। লজ্জায় ঘৃণায় অনেকে নিজেদের মানুষ ভাবতেও দ্বিধা করছেন। সমাজের এমন ক্ষত দেখার পর সভ্যতার বড়াই করাকে ‘অপরাধ’ বলেই মনে করছেন অনেকে।

সামাজিক মানুষের সর্বজনীন মানবিক প্রবৃত্তির বিপরীতে ঘৃণ্য ধর্ষণকামী প্রবৃত্তির উৎসস্থল কোথায় তার খোঁজও নিতে শুরু করেছেন কেউ কেউ। সমাজ-সভ্যতা অনাদিকাল থেকে শিশুদের ‘স্বর্গের দূত’ আখ্যা দিয়েছে। সেইসঙ্গে শিশুদের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্যকে সুনির্দিষ্ট পবিত্র কর্তব্য হিসেবেই জ্ঞান করা হয়। আজ সে সমাজ-সভ্যতার কাছেই শিশুর বিপন্নাবস্থা দেখে কেঁদে উঠছে মানবিক মানুষের মন।

সর্বশেষ রাজধানী ঢাকার ওয়ারিতে উদ্ধার হওয়ার ৭ বছরের শিশু সামিয়া আক্তার সায়মার লাশের ময়নাতদন্তে উঠে এসেছে,তাকে ধর্ষণ করে ঘটনার ধামাচাপা দেওয়ার জন্য হত্যা করা হয়েছে। গত শুক্রবার ছুটির দিনের বিকালে খেলতে বেরিয়েছিল সায়মা। তাকে একা পেয়ে বাসা ও ছাদ ঘুরে দেখানোর কথা বলে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে একই ভবনের প্রতিবেশী হারুন অর রশিদ। ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় সায়মাকে। গতকাল রোববার হারুনকে আটক করেছে পুলিশ।

এর আগে গত ২৭ জুন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধরগঞ্জ থেকে আটক করা হয় সেখানকার একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষককে, যার বিরুদ্ধে স্কুলের ছাত্রীদের নিয়মিত ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। আরিফুল ইসলাম নামের ওই শিক্ষক গত পাঁচ বছরে নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল করে ধর্ষণ করেছেন অন্তত ২০ জন ছাত্রীকে। র‌্যাব বলেছে, মোবাইলে আপত্তিকর ছবি তুলে সেগুলো ইন্টারনেটে ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ছাত্রীদের ধর্ষণ করতেন তিনি। আরিফের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পরপরই ফাঁস হয় নারায়ণগঞ্জের এক মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিকৃতাচার। এ মাদ্রাসা শিক্ষকের নাম আল আমিন। তিনি বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসা নামের প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক ও অধ্যক্ষ। একই সঙ্গে তিনি মাহমুদপুর মসজিদের ইমাম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে আসছেন। গত দেড় বছরে তিনি ধর্ষণ করেছেন অন্তত ১২ জন ছাত্রীকে। র‌্যাব তাকে আটকের পর তার মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপে বিপুল পর্নো পেয়েছে। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ছাড়াও ধর্ষণের চেষ্টা ও যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন ওই মাদ্রাসার আরো অভিভাবক।

গত শুক্রবার নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করতে গিয়ে স্থানীয়দের কাছে ধরা পড়েন শহরের একটি কওমি মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। তার নাম আবুল খায়ের বেলালী। তাকে গ্রেফতারের পর পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। পুলিশের কাছে তিনি স্বীকার করেছেন, এর আগে ওই মাদ্রাসার অন্তত ৮ শিশু শিক্ষার্থীকে তিনি ধর্ষণ করেছেন। ধর্ষণের পর শিশুদের কোরআন ছুঁইয়ে শপথ করাতেন যেন ধর্ষণের ঘটনা কাউকে ফাঁস করে না দেয়।

প্রতিবেশী, শিক্ষকদের হাতে এভাবে ক্রমাগত ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থা। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম নামের একটি সংগঠন গত ২ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) মোট ২১৫৮টি শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। যাদের মধ্যে ৯৮৮টি শিশু বিভিন্ন ধরনের অপমৃত্যু এবং ৭২৬টি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেওয়া এ প্রতিবেদনে তারা বলেছে, গত বছরের তুলনায় এই বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে ৪১ শতাংশ হারে, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। বছরের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৯৬টি শিশু। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে এ সংখ্যা ছিল ৩৫১টি। ৪৯৬টি ধর্ষিত হওয়া শিশুর মধ্যে ৫৩টি শিশুকে গণধর্ষণ করা হয়েছে, ২৭টি প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ২৩ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

এদিকে একই সময়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘মানুষের জন্য’ ফাউন্ডেশন। তারা বলেছে, চলতি বছরের প্রথাম ৬ মাসে বাংলাদেশে ৩৯৯ জন শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে। তারা বলছে, ধর্ষণের পর একজন ছেলে শিশুসহ মোট ১৬ জন শিশু মারা গেছে।

ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি এই তথ্য দিয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, অন্তত ৪৯টি শিশু (৪৭ জন মেয়েশিশু ও ২ জন ছেলেশিশু) যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে ৩৫৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি। এর মধ্যে মারা গিয়েছিল ২২ জন এবং আহত হয়েছিল ৩৩৪ জন।

এ সংক্রান্ত গবেষণায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশু ধর্ষণের ঘটনা আগে তেমন একটা প্রকাশ পেত না। কিন্তু এখন প্রকাশের হার বেড়েছে। সেইসঙ্গে শিশু ধর্ষণের মাত্রাও বেড়েছে।

পুলিশ বলছে, শিশুদের ওপর বল খাটানো বা প্রভাবিত করা, ভয় দেখানো সহজ। ফলে সেই সুযোগটি নিচ্ছে অপরাধীরা। শিশুরা এখন একশ্রেণির লোকের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। তারা শিশুদের নিয়ে পর্নোগ্রাফি তৈরি করছে। একশ্রেণির মানুষ শিশুদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফিরও প্রভাব রয়েছে।

শিশুদের ওপর নির্যাতনের বিভিন্ন দিক নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন। তিনি মনে করেন, মূলত দরিদ্র শ্রেণির শিশুরা ধর্ষণের ঝুঁকিতে থাকে। শ্রমজীবী বাবা-মায়েদের অনুপস্থিতিতে এসব শিশুর দেখার কেউ থাকে না। আরেকটি অংশ যারা নিজেরাই কর্মজীবী শিশু এবং গৃহকর্মী; তারাও ধর্ষণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

তিনি বলেন, অনেক শিশু বা অভিভাবক জানেন না কোথায় গিয়ে বিচার চাইতে হয়। আবার বিচার চাইলে বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তাও নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অনেকেই আদালত বা পুলিশের দোরগোড়ায় যান না। অধিকাংশ নির্যাতনের ঘটনা বিচার না হয়ে মিটমাট হয়ে যায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতিও শিশু ধর্ষণকে উৎসাহিত করছে বলে মনে করেন তিনি।

শিশু নির্যাতন নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে আসা সাংবাদিক ও গবেষক আফসান চৌধুরী বলেন, আগের তুলনায় হিংসাত্মক ঘটনা বেশি হচ্ছে, যদিও আগের তুলনায় এখন ঘটনাগুলো বেশি জানা যাচ্ছে। এখন অনেক বাবা-মা পুলিশের কাছে যাচ্ছে। সামাজিক প্রতিরোধ হচ্ছে। এর ফলে নির্যাতক অনেক সময় নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে শিশুটিকেই হত্যা করছে। মূলত শিশু নিরাপত্তার বিষয়টি নেই বললেই চলে। একটা হিংসাত্মক সমাজ যেখানে যে কেউ যেকোনো সময় মারা যেতে পারে।

তিনি বলেন, শুধু যে মেয়ে শিশুরাই এমন নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছে, তা নয়। আমাদের দেশে ছেলেরা এত নির্যাতিত হয় তা ভাবাই যায় না। ছেলেরা যে ছেলেদের দ্বারাই নির্যাতিত হয় তা নয়, নারীদের দ্বারাও সেটি হয়। কিন্তু স্কুল বা মাদ্রাসাগুলোতে বলা হচ্ছে না বলেই শিশুরা এ সম্পর্কে জানছে না যে- তাকে কী করতে হবে।

আফসান চৌধুরী বলেন, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। এজন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম আমরা বস্তিতে বস্তিতে, সরকারও কিছু ভূমিকা রেখেছিল। শিশুদের শেখাতে হবে- এ রকম ঘটনা ঘটলে কী করতে হয়, কোথায় যেতে হয়, কে আদর করলো, কে শরীর স্পর্শ করলো এবং এর কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ।

এগুলো স্কুল-মাদ্রাসায় শেখানো হয় না। অনেকে আত্মীয় স্বজন ও পারিবারিক সম্পর্কের কথা বিবেচনা করে কিছু বলে না। কিন্তু শিশুদের আদরের নামেও অনেক ক্ষেত্রে যৌনতার প্রকাশ ঘটে। তবে সব ক্ষেত্রেই তা নয়। খেয়াল রাখতে হবে বাচ্চার অস্বস্তি হয় এমন কিছু করা উচিত না।

আস/এসআইসু

Facebook Comments