দেখা হবে ভারতে

177

আলোকিত সকাল ডেস্ক

আগামী বিশ্বকাপ ভারতে- ক্রিকেট ঈশ্বর শচীন টেন্ডুলকার কি রোববার ইয়ন মরগানকে সেই আমন্ত্রণটাই জানিয়ে রাখলেন -সংগৃহীত

ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ আর বৃত্তাকার আকৃতির স্টেডিয়ামগুলো যেভাবে আছে, সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে। লর্ডসে, ওভালে, এজবাস্টনে বা কার্ডিফে খেলা হবে আবারও। গত দেড় মাস বাইশ গজের পিচে যারা ব্যাট-বল হাতে নেমেছেন, গুটিকয়েক বাদে তাদের সবাইও ফের খেলতে নামবেন। কোনো একটি শট বা ডেলিভারি নিয়ে সাবেক ক্রিকেটাররা বিশ্নেষণ করবেন আরও অনেকবার। নানা ব্যানারে-স্লোগানে গ্যালারিতে হাজির হবেন সমর্থকরা; থাকবে টিভির সামনের দর্শক উপস্থিতিও। খেলা নিয়ে স্বপ্ন দেখা আর নতুন পরিকল্পনাও কম হবে না। সবই হবে। ঘুরেফিরে সবই দেখা যাবে। তবে যা হবে না, তা একসঙ্গে।

যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক সব স্টেডিয়াম, ব্যাট-বলের কৌশলী লড়াই, কিংবদন্তি ক্রিকেটারদের সরব উপস্থিতি, গ্যালারিতে নানা রঙের সমর্থক আর রাত-দিন একাকার করে ক্রিকেটবিশ্বের অখণ্ড মনোযোগের মাতামাতি- এ সবকিছু আর একসঙ্গে হবে না; পাওয়া যাবে না ‘আইসিসি ওয়ার্ল্ড কাপ-২০১৯’ নামের ৪৬ দিনের ক্রিকেট উৎসব। লর্ডসের ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে অতীতের গর্ভে চলে গেল চার বছর পর হাজির হওয়া ক্রিকেটবিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব- বিশ্বকাপ ক্রিকেটের। আরেকটি উৎসবের জন্য অপেক্ষা এবার ২০২৩ সালের, দেখা হবে ভারতে।

ক্রিকেটের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত ইংল্যান্ডে এবারের বিশ্বকাপটি ছিল পঞ্চম, সাকল্যে দ্বাদশ। ইউরোপের যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি বিশ্বকাপ আয়োজন করে এশিয়া, আফ্রিকা আর ওশেনিয়া মহাদেশও। জন্মভিটায় আরেকটি বিশ্বকাপ ফিরতে ফিরতে তাই এক-দেড় দশক তো কমপক্ষে লাগবেই। এদিক থেকে কেবল ভেন্যুর কারণেই এবারের বিশ্বকাপ ছিল বিশেষ মাহাত্ম্যের। গত ২৯ মে বাকিংহাম প্যালেসের সামনে আয়োজিত উদ্বোধন অনুষ্ঠান আর রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে ১০ অধিনায়কের সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পঞ্চাশওভারি ক্রিকেটের সর্বোচ্চ এই আসরের বর্ণাঢ্য যাত্রা। মাঠের খেলা গড়ায় পরদিন দ্য ওভালে, ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে। ১০ দল নিয়ে আয়োজিত এবারের আসরে ফরম্যাট ছিল রাউন্ড রবিন লীগ, যে কারণে সব দলই খেলেছে একে অপরের বিপক্ষে। বিরতিহীনভাবে ৩০ মে থেকে ৬ জুলাই ছিল রাউন্ড লীগ পর্ব। তবে ৩৮ দিনের নিরবচ্ছিন্ন সূচিতে বিরতি ঘটেছে একাধিকবার; বৃষ্টির বাগড়ায় কোনো বলই হতে পারেনি চারটি ম্যাচে। তারপরও বাকি যে ৪১টি ম্যাচে ফল হয়েছে, সেখানে ছিল ক্রিকেটীয়-অক্রিকেটীয় সব ঘটন-অঘটনের মুহূর্ত, রুদ্ধশ্বাস লড়াই আর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ছিল ভারত-পাকিস্তানের হাইভোল্টেজ ম্যাচ, ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মর্যাদা ও ঐতিহ্যের জোড়া লড়াই (লীগ পর্ব + সেমিফাইনাল), প্রতাপশালী ইংল্যান্ডকে হারিয়ে শ্রীলংকার টুর্নামেন্ট জমিয়ে দেওয়া, আফগানিস্তানের কাছে ভারতের বিপর্যয়ে পড়া, নিউজিল্যান্ডের তিন-তিনটি ম্যাচে দম বন্ধ করা সমাপ্তির মতো লড়াই।

ম্যাচের পর ম্যাচ সেঞ্চুরি করে গেছেন রোহিত শর্মা (৫টি), আট ইনিংসের সাতটিতেই পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস খেলে অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান, ভয়ানক সব ইয়র্কারে বারবার ম্যাচের মোড় ঘুরিয়েছেন মিচেল স্টার্ক, গতি-বাউন্সারে ঝড় তুলেছেন জোফরা আর্চার-মার্ক উড, বাঁহাতি পেসে মারাত্মক সুইংয়ের ‘কামড়’ দিয়েছেন মোহাম্মদ আমির ও ট্রেন্ট বোল্ট, ফিল্ডিংয়ে দুর্দান্ত ক্যাচ ও রানআউটের প্রদর্শনী দেখিয়েছেন শেল্ডন কটরেল, মার্টিন গাপটিল, জিমি নিশাম। আছে গ্যালারিতে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সমর্থকদের মারামারি, আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে কোনো কোনো ক্রিকেটারের মাত্রাতিরিক্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার মতো দৃষ্টিকটু ঘটনাও। বৃষ্টির হানা আর স্টাম্পে বল লাগার পর বেল না পড়ার অনাকাঙ্ক্ষিত আর উদ্ভট ব্যাপার তো ছিলই। সমর্থনের দিক থেকে ঘটেছে ‘যা কেউ ভাবেনি আগে’ ঘরানার একটি ঘটনাও। লীগ পর্বের শেষ দিকে ইংল্যান্ড-ভারত ম্যাচে স্বাগতিকদের সমীকরণ ছিল ‘মাস্ট উইন’। আবার সেদিন ইংল্যান্ড হারলেই সেমির সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তিন এশিয়ান দেশ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার। রাষ্ট্রীয় ও বিবিধ কারণে ভারতের সঙ্গে বিরোধিতা থাকলেও ৩০ জুনের ম্যাচটিতে সাময়িক স্বার্থের জন্য তিন এশিয়ান দেশই ভারত সমর্থক হয়ে ওঠে। ঠাট্টা ওঠে, ১৯৪৭-এ ভাগ করে যাওয়ার পর আবারও উপমহাদেশ একত্র করে ফেলেছে ইংল্যান্ড!

টক-ঝাল-মিষ্টির এমন সব ঘটনা মিলিয়েই জমজমাট ছিল পুরো বিশ্বকাপ, আলোচনা-সমালোচনায় জাগরূক ছিল ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে। নিখাদ ক্রিকেটপ্রেমীদের দেড় মাস ঘোরের মধ্যে রেখে ব্যাট-বল উৎসবের সেই মহাআয়োজনের পর্দা নেমে গেল গতকাল। চার বছর পরের বিশ্বকাপ শুরুর আগে যা হবে, তার সবই হবে বিচ্ছিন্নভাবে, দ্বিপক্ষীয়-ত্রিদেশীয় বা মহাদেশীয় আয়োজনে বা বিশওভারি ক্রিকেটের মোড়কে। কিন্তু পঞ্চাশওভারি রোমাঞ্চের ক্রিকেট উৎসব আর তার মিলন মেলার স্বাদ কি আর তাতে মিটবে?

আস/এসআইসু

Facebook Comments