দেশবার্তার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিমাংশু শেখর ধর এর একাদশ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

141

রণধীর দত্ত রানুঃ একজন নীরব সমাজ সেবী, নিভৃত সমাজ কর্মী প্রয়াত হিমাংশু শেখর ধর ঝনা বাবুর জন্ম হয় সিলেট শহরের কাষ্টঘর মহল্লায় ১৬ এপ্রিল ১৯১৯ তারিখে। পৈত্রিক নিবাস ছিল মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর থানার খলা গ্রামে বিশিষ্ট ধর পরিবারে। শৈশব কাল সিলেটেই কেটেছিল। স্ত্রীর নাম ছিল বেলারাসী ধর। তিনি ছিলেন চার পুত্র ও এক কন্যার জননী।

প্রয়াত ঝনা বাবু ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত কলিকাতা থেকে প্রকাশিত ‘‘দৈনিক লোক সেবক’’ এবং সাপ্তাহিক ‘‘ভগ্নদূত’’এর সিলেট প্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘদিন কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৮ সালে নিজস্ব প্রেস ‘‘সিলেট প্রিন্টার্স’’ চালু করেন। দীর্ঘ দিন সুপ্রাচীন উক্ত প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করে গিয়ে ছিলেন। তৎকালিন সময়ে সিলেটের স্থানীয় ঐতিহ্য বাহী প্রত্রিকা ‘সিলেট বার্তার’’ পরিচালক ও প্রকাশক হিসেবে দীর্ঘ দিন নিযুক্ত ছিলেন, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৫ জুইস জেনারেল হাসপাতাল মন্ট্রিয়ন, কানাডায় তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

সমাজসেবী কর্মবীর ঝনা বাবুর কর্মময় জীবনের সুদীর্ঘ বিবরণ স্বল্প পরিসরে বর্ণনাতীত। সংক্ষিপ্তভাবে কর্ম বীরের কর্মময় জীবনের বর্ণনা দিচ্ছি। একাধারে চিন্তাবিদ লেখক হিসেবে তার যথেষ্ট পরিচিতি ছিল। যেমন তাঁর উল্লেখযোগ্য লেখার মধ্যে রক্তের দাগ মুছে যায় নি, বিদেশে একাদশ বর্ষ ও অভিজ্ঞতার কথা, স্বর্গাদপি গরিয়সী ইত্যাদি গ্রন্থগুলো উল্লেখযোগ্য।
সম্পাদক হিসেবে তৎকালিন বৃহত্তর সিলেটে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত সাপ্তাহিক ‘‘যুগভেরী ও ইষ্টার্ণ হেরাল্ড পত্রিকার সম্পাদনার কাজে একজন যশস্বী দক্ষ ব্যক্তি হিসেবে সম্পাদনা সম্পাদনা কার্য পরিচালনা করে গেছেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত সিলেট পৌর সভার একজন নির্বাচিত গণপ্রতিনিধি হিসেবে সুনাম ও দক্ষতার সহিত জনসেবামূলক কাজে দীর্ঘদিন অতিবাহিত করেন। ১৯৬০ সালে সিলেট চালি বন্দরস্থ শ্মশানঘাট কমিটির আজীবন সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। নিম্বার্ক সম্প্রদায় কার্যকরী কমিটির সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী দুর্গাবাড়ী প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা সদস্য পদে দীর্ঘদিন নিয়োজিত ছিলেন। তাছাড়া, সিলেট ভোলানন্দ গিরি জিউ আখড়া, গোবিন্দ জিউ  আখড়া, রামকৃষ্ণ মিশন এর একনিষ্ট কর্মী ও সদস্য হিসেবে কাজ করে গিয়েছেন। তিনি ১৯৬১ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত জেলা সংখ্যালঘু বোর্ডের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

তাছাড়া সুদীর্ঘ ২৩ বৎসর যাবত জেলা সমবায় জমি বন্ধকী ব্যাংকের সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এ কাজের সফলতার  স্বীকৃতি স্বরূপ প্রথমবার তিন হাজার টাকা নগদ ও সনদপত্র প্রাপ্ত হন। দ্বিতীয়বার পনেরোশত টাকা সহ সনদপত্র অর্জন করেন।
আরও উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৬৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সময়কালে মদনমোহন কলেজ, দি এইডেড উচ্চ বিদ্যালয়, মীর্জা জাঙ্গাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মডেল হাই স্কুল, রামকৃষ্ণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, কিন্ডার গার্টেন স্কুল সমূহে পরিচালনা কমিটির সদস্য পদে নিযুক্ত ছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর সান্নিধ্য লাভের সুযোগও আমার ঘটেছে। এমন মিষ্টিভাষী হাস্যময়, নিরহংকারী, দক্ষ কর্মী বাস্তবিকই বর্তমান সমাজে বিরল। স্থানীয়ভাবে এমন দক্ষ সমাজসেবী কর্মবীরকে এমন কেউ চিনতো না, এমন ব্যক্তি বিরল ছিল। সবাই একবাক্যে তার অতি পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। মাইকেল মধুসূদনের একটি কবিতার কলি দিয়েই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী নিবেদন করছি। সেটি হচ্ছে ‘‘ সেই ধন্য নরকোলে, লোকে যারে নাই ভুলে, মনের মন্দিরে সদা সেবে সর্বজন’’ মানুষের মনমন্দিরে তিনি অবশ্য স্থান করে নিয়েছে এবং চিরকাল স্মরণীয়, বরণীয় থাকবেন।

Facebook Comments