দেশে এসব হচ্ছে কী?

239

আলোকিত সকাল ডেস্ক

আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভ্যস্ত হওয়ায় আমরা অনেক লোকের ভিড়েও একাকী হয়ে পড়ছি? ভীনদেশি অ্যাকশন মুভি দেখে ক্রাইম শিখছি? বিচার দীর্ঘায়িত হওয়ায় আমরা অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছি? দিনে দিনে আমাদের সামাজিক অবক্ষয় হচ্ছে? আসলে এসব হচ্ছে টা কী? প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু, বালিকা, তরুণী, নারী এমনকি বৃদ্ধা ধর্ষণেরও খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহি বাঙালির পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?

এখন স্কুলে-কোচিংয়ে সন্তানকে দিয়ে মা নিরাপদ বোধ করেন না, পাশের বাড়িতে খেলতে গেলেও থাকে দুশ্চিন্তা। এমনকি মক্তব-মাদরাসায় ধর্মীয় শিক্ষা দিতে সন্তানকে পাঠিয়েও শান্তি নেই। স্কুল-কলেজ, মক্তব-মাদরাসায় এখন যৌন নির্যাতন-ধর্ষণ মহামারী আকার ধারণ করেছে। এ থেকে বেড়িয়ে আসতে না পারলে আমাদের সামনে বড় বিপর্যয় আসন্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের মাদরাসায় প্রধান শিক্ষক কর্তৃক ১২ শিশু ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় সারাদেশে যখন আলোচনা-সমালোচনা চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আবারো রাজধানীর ওয়ারীতে নির্মমতা পাশবিকতার শিকার হল সামিয়া আক্তার সায়মাকে (৭) নামে এক শিশু। ধর্ষণের পর গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করেছে অজ্ঞাত পশুরা (দুর্বত্তরা)।

শনিবার দুপুরে সায়মার ময়নাতদন্ত করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ।

তিনি বলেন, বাহ্যিকভাবে শিশুটির গলায় রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার আলামত পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তার ঠোঁটে কামড়ের চিহ্ন, মুখে রক্ত ও আঘাতের চিহ্ন এবং যৌনাঙ্গে ক্ষত চিহ্ন পাওয়া গেছে। শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এ আলামত আমরা পেয়েছি।

সোহেল মাহমুদ বলেন, এ ব্যাপারে আরো স্পষ্ট হতে হাই ভ্যাজাইনাল সোয়াবের জন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সব নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। এসব প্রতিবেদন পাওয়া গেলে শিশুটির মৃত্যু কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এর আগে শুক্রবার মাগরিবের নামাজের সময় সায়মা নিখোঁজ হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর নির্মাণাধীন ভবনের অষ্টম তলার একটি কক্ষ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

মেয়েটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তের পর জানায় পুলিশ। নিহত সায়মা সিলভারডেল স্কুলের ছাত্রী ছিল। তার বাবা আব্দুস সালাম নবাবপুরে ব্যবসা করেন।

নিহত সায়মার বাবা আবদুস সালাম বলেন, মাগরিবের আজানের সময় আমি নামাজ আদায়ে মসজিদে যাই। মসজিদ থেকে ফেরার সময় সন্ধ্যার নাশতা কিনে বাসায় আসি। বাসায় এসে দেখি সায়মা নেই। আমি, আমার স্ত্রীসহ সায়মাকে খুঁজতে শুরু করি। ছয় তলা ও আটতলায় খুঁজে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে আবার আট তলায় খুঁজতে গিয়ে রান্নাঘরে তার লাশ পাওয়া যায়।

শনিবার সকালে শিশুটির বাবা আবদুস সালাম অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে ওয়ারী থানায় মামলা করেছেন। পুলিশের ওয়ারী জোনের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ সামসুজ্জামান মামলার তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করা হয়।

মোহাম্মদ সামসুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে আমরা কয়েকজনকে আটক করেছি। ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে।

এদিকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে আম খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মোকাব্বের আলী (৪৫) নামের একজনকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা। শনিবার সকালে উপজেলার গুমানীগঞ্জ ইউনিয়নের কুড়িপাইকা গ্রামের এ ঘটনা ঘটে। আটক মোকাব্বের আলী ওই গ্রামের মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে।

এর আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভূঁইঘরের মাহমুদপুরের পাকা রাস্তা এলাকার বায়তুল হুদা ক্যাডেট মাদরাসার ১২ জন শিশু ছাত্রীকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত প্রধান শিক্ষক মাওলানা আল-আমিনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে নির্যাতিত এক শিক্ষার্থীর বাবা বাদি হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা এবং অপর মামলাটি র‌্যাবের পক্ষ থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি দায়ের করা হয়েছে। শুক্রবার সকালে ফতুল্লা থানায় এ মামলা দুটি দায়ের করা হয়।

র‌্যাব-১১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আলেপ উদ্দিন জানান, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত প্রধান আল-আমিন মাদরাসার ১২ জন ছাত্রীকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের কথা স্বীকার করেছেন। একই সাথে তিনি ওইসব শিশু শিক্ষার্থীদের পর্নোগ্রফি ভিডিও চিত্র দেখিয়ে এবং তাদের ছবি যুক্ত করে পর্নোগ্রাফি বানিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে আসামাজিক কাজে বাধ্য করতো বলেও জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। এই ১২ শিক্ষার্থী ছাড়া আরো কোনো শিক্ষার্থীর সাথে ওই শিক্ষক যৌনাচার করেছেন কি না, সে ব্যাপারে তাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

তিনি জানান, র‌্যাব-১১ ডিএডি কামাল হোসেন বাদি হয়ে ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট আইনে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি এবং নির্যাতিত এক শিশুর বাবা বাদি হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।

এর আগে ধর্ষণের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি কান্দারপাড় এলাকার অক্সফোর্ড হাইস্কুলে গত ২৭ জুন র‍্যাবের অভিযানে সহকারী শিক্ষক আশরাফুল আরিফকে ২০ শিশু ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি জেনেও কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার অভিযোগে প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জুলফিকারকেও গ্রেপ্তার করা হয়। সেদিন আরিফের মোবাইল ও ল্যাপটপ থেকে অন্তত ২০ ছাত্রীকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ভিডিও জব্দ করে র‍্যাব।

অন্যদিকে খুলনায় গত ২০ দিনে ১৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি গণধর্ষণের ঘটনা ভিডিও ধারণও করেছে দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে মহানগর এলাকায় গণধর্ষণসহ তিনটি ঘটনায় আট আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে।

খুলনার ওয়ান স্টপক্রাইসিস সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ দিনে খুলনার পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা, রূপসা, কয়রা, ফুলতলা, দাকোপ ও দিঘলিয়া উপজেলা থেকে সেক্সুয়াল এসার্ল্ড নিয়ে নয় শিশু, কিশোরী ও নারী ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া খুলনা সদর, সোনাডাঙ্গা খালিশপুর ও হরিণটানা এলাকার আরো ১০ জন ধর্ষণের শিকার হয়ে ভর্তি হন।

এ ছাড়া নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় এক মাদরাসাছাত্রীকে (১১) ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে ওই মাদরাসার মুহতামিমকে (অধ্যক্ষ) গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। শুক্রবার সকালে পৌর শহরের একটি কওমি মহিলা মাদরাসায় এই ঘটনা ঘটে।

এ রকম আরো অনেক অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। হয়তো অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে মুখ খোলেন না আবার অনেকে প্রভাবশালীদের ভয়ে। এ থেকে বেড়িয়ে আসতে হলে আমাদের সামাজিকভাবে সচেতনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সমাজবিদরা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments