দেশ অচলের কর্মসূচি চান খালেদাপন্থিরা

190

আলোকিত সকাল ডেস্ক

টানা ৫২১ দিন! কারাগারে পার হয় ৩টি ঈদ। সামনে আরেকটি ঈদ। দীর্ঘ বন্দিজীবনে সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এই সময়ে বিএনপিতে নেতায় নেতায় অবিশ্বাস! দলে-জোটেও আসে ভাঙন।

তবে বারবার খালেদার মুক্তি ইস্যু এলেও নীরব থাকেন লন্ডনে নির্বাসিত নেতা। বহিষ্কার আতঙ্কে শেষ সময়ে রাজনীতিতে সম্মান রক্ষায় খালেদাপন্থিরাও হয়ে যান নীরব।

সমপ্রতি সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিরোধী দলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদের মৃত্যুর পর সিনিয়র নেতারা মনে করছেন, এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে খালেদার জন্য মুক্তির দুয়ার খুলে যাবে।

আগামী ঈদকে কেন্দ্র করে দলের স্থায়ী কমিটির শীর্ষ নেতারা তারেক রহমানের কাছে চেয়েছেন দেশ অচলের কর্মসূচি। ঈদের আগেই ঢাকায় বৃহৎ অবস্থান কিংবা বড় কর্মসূচি দিলে নিশ্চিত খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন বলে ধারণা করছেন তারা।

যদিও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে তিন বিভাগে মহাসমাবেশ কর্মসূচি চলমান। গত বৃহস্পতিবার বরিশালে প্রথম মহাসমাবেশ হয়েছে।

আজ ২০ জুলাই দ্বিতীয়টি চট্টগ্রামে ও ২৫ জুলাই তৃতীয় মহাসমাবেশ হবে খুলনায়। এমন কর্মসূচিতেও খালেদাপন্থিদের মন টলছে না। ইস্যুকে কাজে লাগাতে জোট বাঁধছেন জ্যেষ্ঠ নেতারা।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গত বৃহস্পতিবার বরিশালে প্রথম মহাসমাবেশ হলেও সেখানে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ছাড়া বিএনপির সিনিয়র কোনো নেতা উপস্থিত হননি।

নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, সরকারকে বৈধতা দিয়ে, সংসদে গিয়ে, টিকে থাকার জন্য লন্ডন নেতার প্রেসক্রিপশনে শীতল কর্মসূচি বর্জন করছেন তারা।

তারেকপন্থি এক নেতা আমার সংবাদকে জানান, বরিশালে মহাসমাবেশের পর দলের দুই জ্যেষ্ঠ নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে বড় কর্মসূচি চেয়েছেন।

তারা তারেক রহমানকে যুক্তি দিয়েছেন এরশাদের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার মুক্তিতে সরকার আর শক্ত অবস্থানে থাকবে না। এখন ঈদের আগে আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের নাড়া দিতে পারলে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন।

সংসদে বিরোধীদলের নেতাশূন্য ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমর্থনও পাওয়া যাবে। এ প্রেক্ষিতে খালেদার মুক্তির দাবিতে গতকাল শুক্রবার ফের স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক ডেকেছেন তারেক জিয়া।

ঈদের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন আরও গতিশীল করতে সবার পরামর্শের জন্য এ বৈঠক ডাকা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রটির ভাষ্য— বৈঠকে ঢাকায় বৃহৎ অবস্থান, অবরোধ, সিরিজ কর্মসূচির দাবি তোলা হয়েছে। তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত থেকে সবকিছু সবার উপস্থিতে গ্রহণ করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তারেক রহমানের সঙ্গে স্থায়ী কমিটির মতের অমিল ছিলো খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যু নিয়ে।

খালেদাপন্থিদের অনেকে তারেক রহমানের কাছে এর আগে জোর দাবি জানিয়েছেন, আপাতত তৃণমূল নেতাকর্মীদের সতেজ রাখতে এবং সরকারকে চাপে রাখতে প্রতি মাসে অন্তত দুই-একদিন হলেও বড় ধরনের কর্মসূচি হাতে রাখতে। সেটিকে কেন্দ্র করে সমপ্রতি দেয়া হয়েছে তিন বিভাগে মহাসমাবেশ। কিন্তু সেখানেও ভাটা।

প্রথমদিনই ছিলো জ্যেষ্ঠ নেতাশূন্য! ফখরুলের সঙ্গে স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠদের যে দূরত্ব তা তারেক জিয়াকে বার্তা দেয়ার জন্য সমাবেশে উপস্থিত থাকা থেকেও বিরত থাকছেন তারা।

মওদুদ আহমদ, মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, আমান উল্লাহ আমানসহ মাঠপর্যায়ের অনেক নেতাই আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে আসছেন দীর্ঘ সময় ধরে। কিন্তু তারেক রহমান, বিএনপিপন্থি প্রবাসী বুদ্ধিজীবীসহ মহাসচিব হেঁটেছেন দেশের নেতৃত্বের জন্য ভবিষ্যৎ প্ল্যানে।

তবে সিনিয়রদের ভাষ্য— খালেদা জিয়ার মুক্তি এখন তারেক জিয়ার হাতে! লন্ডন নেতা যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দেন খালেদাকে মুক্তির জন্য তবেই খালেদা মুক্তি পাবেন।

কিন্তু তিনি তা দিচ্ছেন না। লন্ডনে তিনি অনেক সভা-সেমিনার করলেও এখন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য এককভাবে কোনো প্রোগ্রাম করেননি।

প্রতিদিনই দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে নানান মাধ্যমে কথা বলছেন কিন্তু মায়ের মুক্তির জন্য জোরালোভাবে কোনো নির্দেশনা দিচ্ছেন না বলেও অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার অভিযোগ।

দল পরিচালনার নির্দেশনা আছে কিন্তু খালেদা মুক্তির জন্য নেই দলে কোনো ভূমিকা। খালেদাকে কারাগারে রেখে তারেক-ফখরুলের স্বার্থবাদী ভূমিকা দলে এখন অনেকটাই স্পষ্ট।

বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য— সরকার টিকে গেছে, বিএনপি আন্দোলন-সংগ্রাম করে আর কিছুই করতে পারবে না।

তাই একটা রাজনৈতিক সমঝোতায় দলীয় সম্পদ রক্ষা, হামলা-মামলা, দল ও নেতাকর্মীদের রক্ষা করাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান।

দীর্ঘ সময় ধরে দেশ আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপি অনেক কর্মকৌশল থেকেই পিছিয়ে গেছে।

সামপ্রতিক ইস্যুতে সক্রিয় থাকা, জনগণের ইস্যু নিয়ে কথা বলা ও দলে নেতৃত্ব তৈরি অনেকটাই অম্লান ছিলো।

তাই আগামী পাঁচ বছরে বিএনপি পুনর্গঠিত হয়ে আন্দোলনের শক্তি সঞ্চয় করবে। এমন প্ল্যানেই চলছিলো দলটি। কিন্তু হঠাৎ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর সেই ছকেও আসছে পরিবর্তন।

সিনিয়রদের বিদ্রোহের আতঙ্কে তারেক জিয়া এখন আন্দোলনের পথ বেছে নিচ্ছেন।

কেননা সামনেই বিএনপির কাউন্সিল, জেলা-বিভাগসহ দলের সকল অঙ্গ সংগঠনের সেটআপ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে দল পুনর্গঠনের জন্য যা গুছিয়ে আনা হয়েছে তা ভেস্তে যাক চান না লন্ডন নেতা।

এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, মিছিল-সমাবেশ ও মানববন্ধন করে বেগম খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করা যাবে না।

আন্দোলনের কৌশল পরিবর্তন করার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

দলের সিনিয়র স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেছিলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় বেগম জিয়ার জামিনের জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। কিন্তু তার সত্যিকারের মুক্তি আসবে আন্দোলনের মাধ্যমে।

রাজপথেই বেগম জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত হতে পারে। এ জন্য আমাদের সংগঠিত হয়ে কর্মসূচি দিতে হবে।

আমাদের এমন কর্মসূচি দিতে হবে, যাতে সরকার বেগম জিয়াকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া বেগম জিয়ার মুক্তির আর কোনো পথ নেই।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক বলেছেন, ‘আসুন আমরা সকল ভেদাভেদ ভুলে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনে রাস্তায় নামি, রাজপথ প্রকম্পিত করি।

রাজপথ দখলে নেয়ার সময় এসে গেছে। যতই অত্যাচার হোক, যতই নির্যাতন হোক, যতই মামলা-হামলা হোক— বিএনপির ঐক্য আরও জোরদার হচ্ছে। বিএনপির ভীত আরও শক্তিশালী হচ্ছে।’

কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন বেগবান করতে সহসাই দলটি কঠোর কর্মসূচি দেবে জানিয়ে ফারুক বলেন, ‘১৬ কোটি মানুষের প্রাণের নেত্রীর মুক্তির আন্দোলন বেগবান করতে সহসাই কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

গতকাল বরিশালের মহাসমাবেশে দেশবাসী লক্ষাধিক লোকের সমাগম দেখেছে। আগামীকাল চট্টগ্রামে হবে, ২৫ তারিখ হবে খুলনায়।

সেগুলোতেও লাখ লাখ লোকের সমাগম ঘটবে। আশা করবো সরকার তার আগেই বেগম জিয়ার মুক্তির ব্যবস্থা করবে। তা না হলে সারা দেশে যে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠবে সেই আন্দোলনের তোড়ে অবৈধ সরকারের গদি অবশ্যই নড়ে যাবে।’

আস/এসআইসু

Facebook Comments