দ্রুত শেষ করতে হবে মামলার তদন্ত

156

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সম্প্রতি রাজধানীসহ সারাদেশে একের পর এক ঘটছে শিশু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে অত্যন্ত পৈশাচিক ও নির্মমভাবে। গণমাধ্যমে প্রচারিত এসব ঘটনার খবর স্মরণ করলে বুক কেঁপে ওঠে। অস্থির হয়ে ওঠে মন। এসব ঘটনা দেশের মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে।

গত ৭ জুলাই রাজধানীর ওয়ারীতে সামিয়া আফরিন নামে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়। চলতি মাসে নারায়ণগঞ্জে ১২ ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে। এসব ঘটনায় সরকার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছে।

সূত্র জানায়, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করার মামলা যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ হয়, সেই ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। শিশু, নারী নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে পুলিশ সদর দপ্তরে ডেকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হচ্ছে। তদন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ করতে দেওয়া হচ্ছে নানা পরামর্শ। এ ছাড়া দেশের কোনো এলাকায় শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনার খবর জানার পরপরই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হচ্ছে। আসামি গ্রেফতার ও তদন্তের সার্বিক বিষয় নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে নেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কৃষ্ণপদ রায় সমকালকে বলেন, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলোর তদন্তে নিবিড় মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে যেসব মামলা মনিটরিং সেলে রয়েছে সেখানে আলোচনা করা হয়- কতদূর তদন্ত এগিয়েছে। কোনো মামলার তদন্ত সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে তদন্ত কর্মকর্তাকে জবাবদিহির মধ্যে আনা হচ্ছে।

খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে সিনিয়র পুলিশ সদস্যদের তা তদারকি করে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা

বলা হচ্ছে। তদন্ত ঠিকমতো এগোচ্ছে কি-না, আসামি গ্রেফতার হচ্ছে না- এ ব্যাপারে তারা খোঁজ নিচ্ছেন। ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার কথা বলা হলেও অনেক সময় তার আগেও চার্জশিট দাখিল করা হচ্ছে বলে তিনি জানালেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, সর্বশেষ অপরাধ পর্যালোচনা সভায়ও বলা হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে করতে হবে। এ ধরনের ঘটনা দ্রুত আমলে নিয়ে তা যথাযথভাবে তদন্ত করার পরামর্শ আসে। এ ছাড়া দেশের কোনো এলাকায় ধর্ষণের ঘটনার তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সেখানে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, অনেক সময় ধর্ষণের কিছু ঘটনা সামনে আসে না। আগেই তা ধামাচাপা পড়ে যায়। আবার কিছু ঘটনা গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে মিটমাট করা হয়। ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে প্রভাবশালী কেউ জড়িত থাকলে অনেক সময় তার তদন্ত শেষ করতে বিলম্ব হতে দেখা যায়। তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্যেও অনেকে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে আপস করার চেষ্টা করে। অনেক সময় ভয় ও হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। সালমা আলী আরও বলেন, ধর্ষণের ঘটনার তদন্ত দ্রুত শেষ না হলে আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বারবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও তদন্ত প্রক্রিয়া বাধার মুখে পড়ে। যেটা কুমিল্লার কলেজছাত্রী তনুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে।

সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, দেশের কোন জেলায় কতটি ধর্ষণ মামলা তদন্তাধীন রয়েছে তার তালিকা হালনাগাদ করছে পুলিশ সদর দপ্তর। চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে পৃথক পৃথক দিনে ঢাকায় ডেকে তদন্তের খুঁটিনাটি বিষয়ে চুলচেরা বিশ্নেষণ করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় আসামিদের কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়ার কথা বলা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বিলম্বে পাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয় না। এমন ঘটনা রয়েছে মামলার তদন্ত চলাকালে আসামি পক্ষের চাপে পড়ে বাদী সমঝোতা করে ফেলেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) ১৫টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ‘শিশু অধিকার লঙ্ঘন’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে উঠে আসে- চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৯৬ শিশু। ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪০৮টি সংবাদ বিশ্নেষণ করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) বলছে, একই সময়ে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৩৯৯টি শিশু।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা কেবল আইন প্রয়োগ করে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনা ও শিশুকে সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠার মতো পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া জরুরি। সামাজিক অবক্ষয় রোধে সচেতন সকলের যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখা জরুরি। এর আগে বিভিন্ন সময় দেশের নানা প্রান্তে ধর্ষণের জড়িতদের ‘গুলিবিদ্ধ’ লাশ পাওয়া গিয়েছিল। কয়েকজনের মৃতদেহের সঙ্গে ‘হারকিউলিস’ লেখা ছিল। সর্বশেষ গত রোববার চট্টগ্রামের আনোয়ারায় লিসান আহমেদ নামে এক যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। সে আনোয়ারায় কোরিয়ান ইপিজেডের এক পোশাক কর্মীকে গণধর্ষণের ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী বলে জানা গেছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে- ‘ছিনতাইয়ের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে গোলাগুলিতে লিসান নিহত হয়।’

আস/এসআইসু

Facebook Comments