ধর্ষণের উৎসবে বাংলাদেশ আর কত?

223

আলোকিত সকাল ডেস্ক

খবরের কাগজ নেয়া ছেড়ে দিয়েছেন? কোথায় বসবেন, টিভির সামনে? ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। প্রয়োজনেই আসবেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে? উপায় নেই। শুধু ধর্ষণ আর খুনের খবর। নয় মাসের শিশুর জন্যও বাংলাদেশ নিরাপদ না।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে ৬৩০ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ সময় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ নারীকে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ছয় মাসের প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে যৌন হয়রানি ও সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যা, পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, গৃহকর্মী নির্যাতন, অ্যাসিড নিক্ষেপসহ নারী নির্যাতনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে সাতজন।

এছাড়া, ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ১০৫ নারীর ওপর। আসক বলছে, গত ছয় মাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১২৭ নারী। এর মধ্যে যৌন হয়রানির কারণে ৮ জন আত্মহত্যা করেছেন। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৩ নারী ও ২ পুরুষ নিহত হয়েছেন। এছাড়া, হয়রানি ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ১২৪ নারী-পুরুষ। আসকের প্রতিবেদনে আরো বলেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুদের হত্যা এবং নির্যাতনের সংখ্যা আশঙ্কাজনক। গত ছয় মাসে ৮৯৫ শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১০৪ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, ৪০ শিশু আত্মহত্যা করেছে, নিখোঁজের পর এক শিশু এবং বিভিন্ন সময়ে ১৭ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া, রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়েছে ৪১ শিশুর।

এই যে হিসাব, এসবের সাথে যে অপরাধীদের নাম জড়িত, তারা কারা? খবরের দিকে যাওয়া যাক তবে। কান্দাপাড়া এলাকার অক্সফোর্ড হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক আরিফুল আপত্তিকর ছবি তুলে ও গোপন ভিডিও ধারণের মাধ্যমে ২০-এর অধিক ছাত্রীকে ব্ল্যাকমেইল করে। তিনি এ সুযোগে শিক্ষার্থীদের একাধিকবার ধর্ষণ করেন। খবর আরো ফতুল্লার মাহমুদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১২ ছাত্রীকে ধর্ষণ, ধর্ষণ চেষ্টা ও যৌন হয়রানির অভিযোগে এক মাদ্রাসা শিক্ষককে আটক করেছে র‍্যাব। আটক শিক্ষকের নাম আল-আমিন। এক উপসচিব ধর্ষণ করেছেন তার ছাত্রীকে, যখন তিনি শিক্ষকতা করতেন। এটাও সাম্প্রতিক ঘটনা।

পৃথিবীর উন্নত দেশ, যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ষণের শাস্তি ধর্ষিতার বয়স এবং ধর্ষণের মাত্রা বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। রাশিয়ায় ধর্ষণের শাস্তি সর্বোচ্চ ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। জনসংখ্যায় বিশ্বের বড়দেশ চীনে ধর্ষণের শাস্তি মেডিক্যাল পরীক্ষার পর ধর্ষণ প্রমাণিত হলে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদিআরবে ধর্ষণের শাস্তি শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে জনসমক্ষে শিরশ্ছেদ। দক্ষিণ আফ্রিকায় ধর্ষণের শাস্তি ২০ বছরের কারাদণ্ড। মঙ্গোলিয়ায় ধর্ষককে ধর্ষিতার পরিবারের হাতে তুলে দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মালয়েশিয়ায় ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশ আফগানিস্তানে ধর্ষণের শাস্তি ৪ দিনের মধ্যে ধর্ষককে গুলি করে হত্যা।

যেসব দেশে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড সেসব দেশে ধর্ষণের ঘটনা অনেকাংশে কমে গেছে। ভারতেও এসেছে নতুন অধ্যাদেশ। নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ১২ বছরের নিচে শিশু ধর্ষণের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। ১২ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত মেয়েদের ধর্ষণের জন্যে কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। আমাদের দেশে অপরাধীরা ধরা পড়ছে অনেক জায়গায়। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আসছে না কেন এখনো?

চারপাশে লোকজন প্রতিবাদী হবার বদলে গুটিয়ে যাচ্ছে। সবাই যার যার নিজেদের মেয়ে সন্তানকে বা বোন-ভাগ্নিকে সুরক্ষা দিলেই পার পেয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছে। কিন্তু ধর্ষণ এখন প্রবল আকার ধারণ করছে। এখান থেকে মুক্তি পেতে চাইলে সরকারের এগিয়ে আসতে হবে। কঠোরতম শাস্তি কার্যকর করার মাধ্যমে দৃষ্টান্ত রাখতে হবে। তারপর সচেতনতা বাড়াতে হবে শিশু থেকে শুরু করে বড় মেয়েদের মধ্যেও। আর অবশ্যই ছেলে ও পুরুষদের যারা বিকৃত রুচির বলে মনে করা হয় কিংবা সন্দেহ হয় তাদের যাপিত জীবনে, তাদের প্রতি কড়া নজর রাখতে হবে। মেয়েদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তুলতে হবে ছেলেদের। এসব শুধু মুখের কথায় থাকলে চলবে না। কাজে প্রমাণ দিতে হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments