ধানের গোলায় কান্না

180

আলোকিত সকাল ডেস্ক

কমেই চলেছে ধানের দাম। চাল আমদানির পথ রুদ্ধ করতে কর বাড়ানো, রপ্তানিতে প্রণোদনা, খোদ কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার সিদ্ধান্ত, ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো, মন্ত্রীদের হুমকি-ধামকি-হুঁশিয়ারি কোনো পদক্ষেপই কাজে আসছে না। গত এক সপ্তাহে নওগাঁ, কুষ্টিয়া, বগুড়ায় মণপ্রতি ধানের দাম কমেছে ২০-১০০ টাকা। যে সব কৃষক ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি না করে পরে দাম বাড়বে এ আশায় যারা গোলায় ধান রেখে দিয়েছিলেন তাদের কান্না আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

এ মৌসুমে বোরোর বাম্পার উৎপাদনে কৃষকের ভাগ্যে নেমে আসে চরমতম দুর্ভোগ। উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ধান বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছিলেন তারা। কোথাও কোথাও মনপ্রতি ধানের দাম নামে ৪৫০ টাকার নিচে। কৃষকদের এ দুরাবস্থার পেছনে ধান-চাল ক্রয়ে সরকারের যে নীতি এবং সিন্ডিকেটনির্ভর বাজার ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বছরের পর বছর ধরেই কৃষকদের স্বার্থপরিপন্থী এ ব্যবস্থা চলে আসছে দেশে। সমালোচনার মুখে ধানের দাম বাড়াতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয় সরকার। এর মধ্যে বিদেশ থেকে চালের আমদানি বন্ধে ৫৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১০ লাখ টন চাল রপ্তানির। ফড়িয়া, মধ্যস্বত্বভোগী নয় সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেড় লাখ টন থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টন করা হয়। সরকারি এসব উদ্যোগের কারণে খোলাবাজারে ধানের দাম কিছুটা বাড়ে। কিন্তু জুলাইয়ের শুরু থেকেই এ দাম আবার কমতে শুরু করে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ হারে আমদানি শুল্ক বসানোর কারণে সাধারণ মানুষের খাওয়ার উপযোগী চাল আমদানি বন্ধ করা গেছে। অন্যদিকে সরকার চাল রপ্তানিতে ২০ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করলেও ব্যবসায়ীরা এক মেট্রিক টন চালও রপ্তানি করতে পারেনি। সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে গত ২৫ এপ্রিল থেকে ২৬ টাকা দরে দুই ধাপে ৪ লাখ টন ধান সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা আড়াই মাসেও প্রথম ধাপের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। খোদ খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার স্বীকার করেছেন ধান ক্রয় কার্যক্রম সন্তোষজনক নয়। প্রথম দফায় ঘোষিত দেড় লাখ টন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রায় এখনো পূরণ হয়নি। খোদ কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের ঘোষণা দেওয়া হলেও রাজনৈতিক প্রভাবশালী, মিলকল মালিক, ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট এবং খাদ্যগুদামের কর্মকর্তাদের অসহযোগিতায় তার সুফল পাচ্ছে না কৃষক। বছরের পর বছর বাজারের নিয়ন্ত্রক এ সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় মন্ত্রী-এমপিরাও। ফলে সরকারের তরফ থেকে উদ্যোগ নেওয়ার পরও বাজারের পরিস্থিতি তেমন বদলায়নি। বরং চলতি জুলাই মাসের শুরু থেকেই ধানের দাম পড়তির দিকে।

খোলা কাগজের নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, গত এক সপ্তাহে জাতভেদে নওগাঁর বাজারে প্রতিমণে ধানের দাম কমেছে ২০-৩০ টাকা। সরকারিভাবে ধানক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও কৃষকের ঘরে এখনো অনেক ধান জমা রয়েছে। খাদ্য গুদামের কর্মকর্তাদের অহযোগিতা দলীয় প্রভাবের কারণে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধানক্রয় সফল হচ্ছে না। বর্তমানে নওগাঁর খোলা বাজারে কৃষকরা খাটো ১০ জাতের ধান বিক্রি করছেন প্রতিমণ ৫১০ থেকে ৫২০ টাকা। ২৯ জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৫৪০ থেকে ৫৬০ টাকায়। হাইব্রিড জাতের ধান ৫৬০ থেকে ৫৮০ টাকা, লতা কাটারি ৬১০ থেকে ৬০৩ এবং জিরা শাইল জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৬৩০ থেকে ৬৭০ টাকা মণ।

কু?ষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, জুলাই মাসের শুরু থেকে এখান ধানের বাজারে আবারও দাম নিম্নমুখী। সব ধরনের ধানে প্রতি মনে ৫০ থেকে ৭০ টাকা দাম কমেছে। যে সব চাষি ধান বিক্রি না করে বাড়িতে রেখে দিয়েছিলেন তাদের আরও লোকসানে পড়তে হচ্ছে। ফলে কৃষকের দুর্ভোগ উঠেছে চরমে। এ পরিস্থিতিতে যেসব ধান ব্যবসায়ীরা কিছুদিন আগে চড়া দামে ধান কিনেছিলেন তাদেরও লোকসান গুনতে প্রতি মনপ্রতি ১০০-১৫০ টাকা। গত এক সপ্তাহে বাজার ভে?দে চিকন ধান মণপ্রতি ৭০০-৭২০টাকা, মাঝা?রি ৬৬০-৬৮০ ও মোটা ধান ৬০০-৬২০ টাকা দ?রে বিক্রি হ?চ্ছে।

বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলায় ধরনভেদে ধানের দাম কমেছে ৫০-১০০ টাকা। গত ২ মে থেকে এ জেলায় ধান-চাল সংগ্রহ শুরু হয়। জেলায় মোট ১৪ হাজার ৮৯৬ টন ধান এবং ৭৮ হাজার ৩৫৪ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এ পর্যন্ত মাত্র ৪ হাজার ২০০ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। আর চাল সংগ্রহ হয়েছে ৫৫ হাজার টন।

বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা প্রতিনিধি জানান, এক মাসের ব্যবধানে ধানের খোলা বাজারে দাম মণপ্রতি কমেছে প্রায় ১০০ টাকা। একমাস আগে মিনিকেট জাতের ধানের বাজার ছিল মণপ্রতি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা। এখন দাম কমে সেটা দাঁড়িয়েছে ৬০০-৬৮০ টাকা।

দুপচাঁচিয়া উপজেলার মোস্তাপুর গ্রামের কৃষক আবদুল জলিল ও তিশিগাড়ী গ্রামের কৃষক আবদুল বারিক জানান, ইরি-বোরো মৌসুমের শুরুর দিকে বিভিন্ন হাটবাজারে জিরাশাইল (চিকন) ধান ৭০০-৮০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে সেই ধানের দাম প্রতি মণ ৬৫০-৭২০ টাকায় নেমেছে। তারা জানান, যে বিআর-২৮ ধান ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে সেটার দাম এখন মণ প্রতি ৬০০ টাকা। আদমদিঘীতে মণপ্রতি দাম কমেছে ৫০-৮০ টাকা।

চলতি বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা যেখানে ১ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হয়েছিল সেখানে উৎপাদন হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫-২০ লাখ মেট্রিক টন বেশি। বাম্পার এ ফলন কৃষকের জন্য উল্টো গলার কাঁটা হয়ে ওঠে। বিস্ময়করভাবে পড়ে যায় ধানের দাম। কৃষকরা নিজেদের জমিতে আগুন ধরিয়ে প্রতিবাদ করেন। উপায়ন্তর না দেখে সরকার সিদ্ধ চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেয়। ২০ শতাংশ প্রণোদনাও ঘোষণা করা হয়। চাল ব্যবসায়ীরা সরকারকে চিঠি দিয়েই রপ্তানির ব্যাপারে আগ্রহের কথা জানান। কিন্তু আড়াই মাসেও চাল রপ্তানি শুরু করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। সরকারি পর্যায়ে ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইনে চাল রপ্তানির কথা চললেও আশাপ্রদ কোনো অগ্রগতি হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাল রপ্তানির এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা কঠিন। কেননা বিশ্ববাজারে এখন ধানের দাম কম।

ধানের দাম যাতে বাড়ে এবং কৃষক যাতে লাভবান হতে পারে সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুটি পরামর্শ দেন। তিনি আরও বেশি ধান কেনার পরামর্শ দেন। সেই সঙ্গে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে মিলারদের মাধ্যমে চাল করার পরামর্শও দেন। প্রধানমন্ত্রীর এ পরামর্শের পর আগের দেড় লাখ টনের সঙ্গে আরও আড়াই লাখ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ২৫ এপ্রিল থেকে এ কার্যক্রম শুরু হলেও এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ২৫ শতাংশও বাস্তবায়ন হয়নি। অবশ্য চাল কেনার ক্ষেত্রে যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল সেটার ৬০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন হয়েছে। সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান ও চাল সংগ্রহ চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।

সরকারি পর্যায়ে ধান সংগ্রহের এ করুণচিত্রের পেছনে ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী রাজনীতিক ও খাদ্য গুদাম কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট দায়ী বলে অভিযোগ করছেন কৃষকরা। ধান সংগ্রহের এ ধীর নীতির প্রভাব পড়েছে বাজারে। এর ফলে যারা ক্ষেত থেকে ধান তুলে সুবিধাজনক সময়ে বিক্রি করবে বলে গোলায় তুলেছিল তাদের কান্না চওড়া হচ্ছে।

সারা দেশে ধান সংগ্রহ সন্তোষজনক নয় স্বীকার করলেও এর পেছনে কৃষি দফতরের গড়িমসি ও পর্যাপ্ত গুদাম না থাকাকে দায়ী করছেন খাদ্যমন্ত্রী। ধানের দাম বাড়াতে প্রয়োজনে আরও ধান সংগ্রহ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সিন্ডিকেটের বিষয়ে সরাসরি স্বীকার না করলেও সংশ্লিষ্টদের প্রতি তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এই বলে যে, ধান সংগ্রহে রাজনৈতিক নেতাকর্মী কিংবা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির অন্যায় প্রভাব বরদাশত করা হবে না। সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ও স্বজনপ্রীতি-মুক্ত থেকে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান কিনতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনা না বদলানো গেলে কৃষকের কান্না থামার নয়। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ না হওয়ায় বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন খরচ বেশি। ধান, চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে নীতিটাও কৃষকবান্ধব না হয়ে ব্যবসায়ীবান্ধব। সে কারণে কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার চেয়ে মিলারদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহের দিকেই ঝোঁক বেশি। গত কয়েক দশকে রাজনৈতিক প্রভাবশালী, মিল মালিক ও খাদ্য গুদাম কর্মকর্তাদের একটা শক্তিশালী সিন্ডিকেট চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এবারে খোদ কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য এ পরিমাণ অনেক কম। এরপরও মণপ্রতি ১০৪০ টাকা দরে ধানের দামের সুফল খুব কম কৃষকই পাচ্ছেন।

এক্ষেত্রে বাগড়া বসাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেট। কৃষকদের কাছ থেকে আগে থেকে কম দামে ধান কিনে ওই কৃষকের মাধ্যমেই তারা সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে বেশি দামে ধান বিক্রি করছে। এতে শুভঙ্করের ফাঁকিতে পড়ছেন কৃষকরা। এরপরও হাতেগোনা ভাগ্যবান যেসব কৃষক সরকারি দরে ধান বিক্রির সৌভাগ্য আসবে বলে আশায় ছিলেন তাদের বিড়ম্বনা বেড়েই চলেছে। কেননা এ সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে সরকারি নির্দেশনার পরও নানা অজুহাতে ধান সংগ্রহ চলছে ধীরনীতিতে। ফলে বাজারে সৃষ্টি হয়েছে একটা কৃত্রিম সংকট। যার ফলে খোলাবাজারে ধানের দাম কমছেই।

আলোকিত সকাল/এসআইসু

Facebook Comments