নয়ন বন্ডের লাশ দেখাতে পুলিশের হিমশিম, জনতার মিষ্টি বিতরণ

387

আলোকিত সকাল ডেস্ক

গত কয়েকদিন ধরে দেশজুড়ে শুধু একটাই আলোচনা চলছিল। স্ত্রীর সামনে স্বামীকে খুন। আর তাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল শ খানেক লোক। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসল না। এ নিয়ে উত্তাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। রিফাত শরীফের (২২) মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে চলছিল শোকের মাতম।

অবশেষে রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে দায়ের করা মামলার প্রধান অভিযুক্ত নয়ন বন্ড (২৫) পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। আজ মঙ্গলবার (২ জুলাই) ভোর সোয়া ৪টার দিকে বরগুনার পুরাকাটা এলাকায় পুলিশের সাথে গোলাগুলির ঘটনা হয় বলে জানা যায়। এ ঘটনায় এএসপি সহ ৪ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে।

এদিকে নিহত সাব্বির হোসেন নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডের মরদেহ দেখতে বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে ঢল নেমেছে সাধারণ মানুষের। সেই ঢল সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকেও। পরে লাইনে দাঁড় করে কয়েক হাজার সাধারণ মানুষকে নয়ন বন্ডের মরদেহ দেখার সুযোগ করে দেয় পুলিশ। এ সময় নয়ন বন্ডের মরদেহ দেখতে আসা সাধারণ মানুষের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করা হয়।

গণমাধ্যমে নয়ন বন্ডের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরপরই বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গ ও এর আশপাশ এলাকায় অবস্থান নেয় উৎসুক সাধারণ মানুষ। পরে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাস্থল থেকে সকাল ৭টার দিকে নয়ন বন্ডের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে আসে পুলিশ। সেই থেকে দুপুর ১২টা ২০ মিনিট এই রিপোর্টে লেখা পর্যন্ত নারী-পুরুষসহ কয়েক হাজার মানুষ নয়ন বন্ডের মরদেহ দেখেছে বলে জানিয়েছে মর্গ প্রাঙ্গণ দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা।

নয়ন বন্ডের মরদেহ দেখতে আসা ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রিফাত শরীফকে কীভাবে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে তা ভিডিওতে দেখেছি। কিন্তু নয়ন বন্ড কীভাবে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে তাতো দেখতে পারিনি। তাই ওর গুলিবিদ্ধ মরদেহ দেখতে এসেছি।

বরগুনার নারী নেত্রী ও উন্নয়ন কর্মী হোসনে আরা হাসি গণমাধ্যমকে বলেন, নয়ন বন্ডের মৃত্যুর খবর নিঃসন্দেহে স্বস্তির। এ স্বস্তি শুধু আমার একার নয়, পুরো বরগুনাবাসীর। তবে নয়ন বন্ডকে জীবিত অবস্থায় গ্রেফতার করা সম্ভব হলে ওর বাহিনী সম্পর্কে সব তথ্য পেয়ে পুলিশ বাহিনীটিকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারতো।

এ বিষয়ে বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. হুমায়ুন শাহীন খান বলেন, পুলিশের করা নয়ন বন্ডের মরদেহের সুরতহাল রিপোর্টটি আমরা এখনো পাইনি। এই রিপোর্ট পেলেই আমরা নয়ন বন্ডের মরদেহের ময়নাতদন্ত শুরু করব।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ভোর রাত ৪টার দিকে বরগুনা সদর থানার পুলিশ নয়ন বন্ডকে গ্রেফতারের জন্য ওই গ্রামে যায়। ওই গ্রামের খলিল মাস্টারের বাড়ির সামনে গেলে নয়ন বন্ড ও তার সহযোগীরা পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় পুলিশও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে। এতে ঘটনাস্থলে নয়ন নিহত হন। হামলায় বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহজাহান মিয়াসহ চার পুলিশ সদস্য আহত হন। এদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

পূর্ব বুড়িরচর গ্রামের বাসিন্দা আবদুল বারেক ও কবির হোসেনের তথ্যমতে, ভোর রাত সোয়া ৪টার দিকে তারা বেশ কিছু গুলির শব্দ শুনতে পান। এতে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। ভোর ৫টার দিকে তারা খলিল মাস্টারের বাড়ির দরজার সামনে বাঁধের ঢালে এক যুবকের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। পুলিশ তাঁর লাশ ঘিরে রেখেছিল।

বরগুনার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবির মোহাম্মদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, সন্ত্রাসী নয়ন বন্ড পালিয়ে ওই এলাকায় অবস্থান করছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে একদল পুলিশ পূর্ব বুড়িরচর গ্রামে অভিযান চালায়। পুলিশের অবস্থান টের পেয়ে নয়ন ও তার সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি ছুড়লে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। পরে একজনের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এটা নয়ন বন্ডের লাশ বলে স্থানীয় লোকজন শনাক্ত করে।

ওসির তথ্যমতে, ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি তাজা গুলি, তিনটি রামদা ও তিনটি গুলির খোসা জব্দ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বুধবার (২৬ জুন) বরগুনার কলেজ সড়কের ক্যালিক্স কিন্ডারগার্টেনের সামনে দিনে দুপুরে স্ত্রীর আয়েশা আক্তারের সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে দুর্বৃত্তরা। এই হামলার ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্ত্রী মিন্নিকে বরগুনা সরকারি কলেজে নিয়ে যান রিফাত। কলেজ থেকে ফেরার পথে মূল ফটকে নয়ন, রিফাত ফরাজীসহ আরও দুই যুবক রিফাত শরীফের ওপর হামলা চালান। এ সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন তারা। রিফাত শরীফের স্ত্রী মিন্নি দুর্বৃত্তদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুতেই হামলাকারীদের থামানো যায়নি। তারা রিফাত শরীফকে উপর্যুপরি কুপিয়ে রক্তাক্ত করে চলে যান। পরে স্থানীয় লোকজন রিফাত শরীফকে গুরুতর আহতাবস্থায় উদ্ধার করে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে রিফাত শরীফের মৃত্যু হয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments