নেপথ্যে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব

309

আলোকিত সকাল ডেস্ক

চরম নৃশংসতা দেখছে, দেখেই চলেছে জাতি। ফেনীর নুসরাত- বরগুনার রিফাত- যশোরে কিশোর শাহীন আলম- ঠাকুরগাঁওয়ের নার্স তানজিনা আক্তার- সর্বশেষ চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন দলের যুবলীগকর্মী মহসিনকে নিজ দলের কর্মীরাই পিটিয়ে গুরুতর আহত করার ঘটনাও দেখছে জাতি। শুধুই কি এসব?

এ জাতি দেখেছে- কুমিল্লার তনু হত্যাকাণ্ড, গুলি করে মেরে হত্যার অসংখ্য ঘটনা, পেট্রলবোমার আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনা, হত্যা করে ইটের বোঝা বেঁধে জলে ডুবিয়ে গায়েব করে দিতে চাওয়ার ঘটনা, নাড়িছেঁড়া আদরের সন্তান জন্মদাত্রীর মাথা থেঁতলে দিচ্ছে শিলপাটায় ঠেসে ধরে, ঘুমন্ত বাবা-মাকে বুকে ছুরি চালিয়ে হত্যা করছে সন্তান।

এ কোন সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে বর্তমান সভ্য নামক সমাজের এ জাতি? অবক্ষয়ী সমাজের ন্যায় বর্তমান সমাজব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার তোষণে সৃষ্ট নৃশংসতায় নিজেকেই আজ প্রশ্ন করছে মানুষ। নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে অদম্যগতিতে সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে! শুধু রাজনীতির চারণক্ষেত্রে নয়, ঘরে ঘরেও চলছে নিপীড়ন-নির্যাতন।

সহিংসতা থেকে নৃশংসতায় রূপ নিচ্ছে পারিবারিক কুটকীর্তিও। কেবল যে মদ্যপ স্বামীই স্ত্রীকে পেটাচ্ছে, তাই নয়- শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে শারীরিক নির্যাতনের। যৌন নিপীড়ন থেকেও রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি শিশুরা। আর গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রী কর্তৃক গৃহকর্মী নির্যাতনের হারও বাড়ছে সমানতালে।

সর্বস্তরে এভাবে অবক্ষয়ে ঘটে চলেছে নৈতিক মূল্যবোধের। কেন এ আগ্রাসী মনোভাব? কেন এ ভায়োলেন্স? কেন এ নিষ্ঠুরতা? কেন অহরহ ঘটছে এমন নৃশংসতম সহিংসতা? এমন প্রশ্নের উত্তর তো মিলছেই না বরং সমাজে ভয়ংকররূপে বেড়েই চলেছে নৃশংসতা। এতে রাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার নির্বিকারতাকেই দায়ী করছে অনেকে।

মানবাধিকার পরিস্থিতির ব্যত্যয় ঘটছে এবং তা বন্ধে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রীয় ভূমিকাকেই দুষছে সংশ্লিষ্টরা। বরগুনার রিফাত হত্যার ঘটনায় আইন ও সালিসকেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নুর খান লিটন আমার সংবাদকে বলেন, জামিনের সহজলভ্যতার কারণে বেপরোয়া অপরাধীরা হয়ে উঠছে আরও অধিক বেপরোয়া।

জামিনের সহজলভ্যতার কারণ হিসেবে বলছেন, পুলিশের পোক্ত তথ্য উপস্থাপন না করার কারণেই আদালতে জামিন পাচ্ছে অপরাধীরা। এছাড়া তিনি বলেন, রাষ্ট্র আজ জাতির প্রতিবাদী স্বত্বাকে রোধ করার চেষ্টা করছে। যে কারণে অন্যায়ের শুরুতেই প্রতিবাদহীনতার কারণে সহিংসতা রূপ নিচ্ছে নৃশংসতায়।

সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, অপরাধের ধরন, ভিকটিমের ন্যাচার, অপরাধ সম্পাদনের কলাকৌশল, রাজনৈতিক ক্ষমতার সংশ্লিষ্টতা ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা বর্তমান সমাজকে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে নৃশংসতার উচ্চ মোকামে। সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও তার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি স্বকীয়তা অনুযায়ী ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়, তবে মানুষের অপ্রত্যাশিত আচরণই নৃশংসতার রূপ ধারণ করে।

আইন মানুষের আচরণকে শাস্তির ভয়ে নিয়ন্ত্রণ করে আর সামাজিক সমপ্রীতি, মূল্যবোধ, পারস্পরিক স্নেহ-প্রীতি মানুষের আচরণকে সমাজ উন্নয়নের ধারায় পরিচালিত করে।

নিয়মের খাতিরে আইন মানা নাগরিক সমাজের উন্নত বৈশিষ্ট্যের লক্ষণ। আর শাস্তির ভয়ে আইন মানা নাগরিকসমাজের বেশধারী চৌর্যবৃত্তিমূলক আচরণের প্রকাশ। বর্তমান সময়ের অপরাধগুলো বিচারহীনতার আবরণে হারিয়ে যাচ্ছে এবং নতুন ঘটনা বা অপরাধ পুরনোকে ভুলিয়ে দিচ্ছে।

অপরাধ প্রতিরোধে অপরাধ বিজ্ঞান ও বিচার শাস্ত্রের মোদ্দাকথা— বিচার না হলে অপরাধের মাত্রা বাড়ে, মনুষ্যরূপী পাষণ্ড নিত্য-নতুন অপরাধ সৃষ্টি করে সমাজের রিদম বিনষ্ট করে তৈরি করবে অপরাধ বা অন্ধকার জগৎ।

সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া সকল সমষ্টি-পরিবারে সমভাবে ক্রিয়াশীল নয়? আমাদের সমাজব্যবস্থায় সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া মূলত পরিবারব্যবস্থার ওপর ভর করে চলমান। তবে অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানও কমবেশি দায়িত্ব পালন করে।

উন্নয়নের চলমানতায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে স্বচ্ছ গণতন্ত্রের ঘাটতি যেখানে অপরাধ প্রশ্রয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সেখানে সকল নিয়মনীতিকে হটিয়ে রাজনীতির নিষ্ঠুর ও পাষাণ খেলায় সমাজ ও মানুষকে জাপটে ধরে।

বর্তমানে দেশের অধিকাংশ অপরাধের পেছনে কিংবা অপরাধের বিচার না হওয়া কিংবা অপরাধীদের আইন-কানুনকে তোয়াক্কা না করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাই জোরালো ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সমাজ বিজ্ঞানীরা।

গণতান্ত্রিক ভাবধারায় রাজনীতির ব্যবহার মানুষের আচরণে আইনের স্পষ্ট উপস্থিতি তৈরি করে। কারণ শান্তি ও শৃঙ্খলার অব্যাহত জয়যাত্রা প্রস্তুত করাই রাজনীতির লক্ষ্য। কিন্তু রাজনৈতিক শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে রাজনীতির মদদপুষ্ট কতিপয় ব্যক্তি সমাজক অতিষ্ঠ করে তুলছে।

রাজনীতি যেখানে প্রতিরোধ করবে সেখানে যদি লাগাম খুলে দেয়। খুলে দেয় সামাজিক অমান্যতার দুয়ার। যে কারণে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অপরাধ বাড়ছে। বাড়ছে বিচারহীনতায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির অতি বাড়াবাড়ি।

এতে সমাজের শৃঙ্খলার কাঠামোতে আবদ্ধ মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলে। তৈরি হয় পারস্পরিক অবিশ্বাসের প্রশস্ত রাস্তা। যেখানে যার যা কিছু মনে হয় তাই করে। বিনষ্টের পথে সমকাল। মানুষের মানবিকতা হারিয়ে যায় অনন্তকালের গোপন কোঠরে।

সম্প্রতি সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক উস্মা প্রকাশ করে বলেন, আলোচিত হত্যামামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের দীর্ঘসূত্রতা বিদ্যমান। নিম্ন আদালতে দ্রুত বিচার হলেও কিন্তু চূড়ান্ত বিচার করে দণ্ড কার্যকর করা যাচ্ছে না।

বরগুনার আলোচিত রিফাত হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে, কিন্তু সামাজিক অবক্ষয় হয়েছে। মানুষের মধ্যে পশুবৃত্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। দুদিন আগে রিফাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

যারা ভাইরাল করেছে, কেউই আক্রান্ত ব্যক্তিকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে যাচ্ছে না। এ রকম ঘটনা দ্রুততম সময়ে বিচার করা উচিত। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিচারের কথা বলছেন। এ ধরনের ঘটনার বিচার হচ্ছে। বিশ্বজিৎ হত্যা, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, সিলেটে পায়ুপথে বাতাস দিয়ে হত্যার ঘটনায় নিম্ন আদালতে বিচার হয়েছে।

নুসরাত হত্যার বিচার চলছে। মানুষ দ্রুত রায় কার্যকর দেখতে চায়। নিম্ন আদালতে সফলভাবে রায় হচ্ছে, কিন্তু উচ্চ আদালত— হাইকোর্ট-আপিল বিভাগে আটকে থাকছে। নিম্ন আদালতের রায় পেয়েই বলা যাবে না ঘটনার বিচার হয়েছে।

দ্রুত বিচারকাজ শেষ করার জন্য আইন সংশোধনের দরকার নেই। মামলা উচ্চ আদালতে গেলে অ্যাটর্নি জেনারেলকে পেপার বুক দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। হাইকোর্টকে স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল দিতে দেখা গেলেও মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে উদ্যোগী হতে দেখা যাচ্ছে না।

সম্প্রতি বরগুনার রিফাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেখা যায়— এখনো পর্যন্ত পুলিশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত গ্রুপের কয়েকজনকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হলেও মূলহোতারা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যেখানে পুলিশ ঘটনার পরপরই জানিয়েছে, জড়িত কেউ পার পাবে না।

এদিকে এ ঘটনায় স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের দুই নেতার আশীর্বাদপুষ্টতার কথা ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। পূর্বেও এ হত্যায় জড়িত নয়ন গ্রুপের সদস্যরা বারবার মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়েও সহজেই জামিন পেয়ে যায়।

রাজনৈতিক নেতাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আলোচনায় আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতোমধ্যে অপরাধীদের আবারো পার পাওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে পোস্ট দিচ্ছেন সারা দেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীরা। কেউ কেউ বলছেন, অতীতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

যেখানেই ক্ষমতাসীন নেতাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল সেখানেই বিচারহীনতা উপস্থিত। এর আগে ফেনীর নুসরাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মূলহোতা মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের সঙ্গে জড়িত ছিল ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা। আসামি গ্রেপ্তার হলেও বিচার প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। অথচ হুমকি পেয়ে এখনো আতঙ্ক নুসরাতের পরিবারে।

ঠাকুরগাঁওয়ে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করায় বখাটে ভাতিজার ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যায় ভানজিনা আক্তার নামে এক নার্স।

গত ২০ জুন সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে কর্মস্থল সালন্দর বেসরকারি সংস্থা গ্রামীণ চক্ষু হাসপাতালে যাওয়ার পথে পেছন থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পিঠে, বুকে, হাতে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে তার সম্পর্কিত ভাইয়ের ছেলে মোহাম্মদ জীবন। এর কারণ স্কুলছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করায় শাসন। অপরাধীকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

যশোরের কেশবপুরের গোলাঘাটা দাখিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহীনকে গত শুক্রবার মাথায় আঘাত করে ভ্যান ছিনতাই করে নেয় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার পর রক্তাক্ত কিশোর বসে আছে, তাকিয়ে অপলক দৃষ্টিতে।

হামলার সময় প্রাণ বাঁচাতে দুর্বৃত্তদের কাছে কাকুতি-মিনতি করেছিল যশোরের ওই কিশোর শাহীন আলম। কিন্তু নিস্তার মেলেনি। চেতনা থাকা অবস্থায় মাঝে মাঝেই চিৎকার দিয়ে শাহীন বলে উঠছিল, এত করে কলাম, আমারে মারিস না। ওরা কয় তোর নিস্তার নেই। শাহীন এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে।

নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের বাইরে ঠায় বসে আছেন তার মা মোসাম্মত খাদিজা। তিনি জানান, চেতনা থাকা অবস্থায় মাঝে মাঝেই চিৎকার করে উঠত শাহীন। বলে উঠত, দুর্বৃত্তদের কাছে তার মিনতির কথা।

আহত শাহীন স্বজনদের শুধু এটুকুই বলতে পারছিল। শাহীনকে গত শনিবার রাতে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। রাতে অপারেশন শেষে তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

শাহীনের মা খাদিজা বলেন, শুক্রবার সকাল সাতটার সময়ে শাহীন ভ্যান নিয়ে বাহির হয়। দুপুরে গ্রামের মেম্বার ফোন করে শাহীনের কথা জানায়। প্রথমে শুনেছিলাম ও মারা গেছে। পরে ওরে আমরা খুলনা হাসপাতালে নিয়ে যাই। পথের মধ্যেই বারবার চিল্লায়ে উঠতেছিল, এত করে কলাম, আমারে মারিস না। ওরা কয় তোর নিস্তার নেই।

একইভাবে নিস্তার মেলেনি ক্ষমতাসীন দলের যুবলীগের কর্মী মো. মহসিনেরও। একই সংগঠনের কর্মীদের নির্মম পিটুনীতে গুরুতর আহত হয়েছেন তিনি। রোববার বিকালে চট্টগ্রামের আকবর শাহ থানার বিশ্ব কলোনি এলাকার এন-ব্লকে এ ঘটনা ঘটে। মহসিনকে পেটানোর ভিডিও গতকাল সোমবার সকাল থেকে ফেসবুকে ভাইরাল হলে জড়িতদের শনাক্ত করে পুলিশ।

তাদের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, হামলাকারীরা সবাই যুবলীগের কর্মী। অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের হাতে হামলার শিকার হন মহসিন। ঘটনার আগের দিন গত শনিবার তিনি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান।

বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছেন। তার বিরুদ্ধে মারামারির তিনটি মামলা আছে। তিনি নগরের উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সরওয়ার মোর্শেদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। গ্রেপ্তারা হলেন— মো. সাজু, মো. তারেক, বেলাল হোসেন, মো. মিরাজ ও মো. মাসুদ। তারা সবাই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল আলম জসীমের অনুসারী।

ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, একটি গলির মুখে যুবলীগকর্মী মহসিনকে অতর্কিতে এসে মারধর শুরু করে আট থেকে দশজনের একটি দল। তাদের কাছ থেকে মহসিন পালানোর চেষ্টা করলেও চারপাশ থেকে রড ও লাঠি দিয়ে তাকে পেটানো অব্যাহত থাকে। মারধর থেকে বাঁচতে মহসিন একজনের পা ধরে রাখেন।

ওই যুবকের নাম চৌধুরী জুয়েল। পা ধরেও পিটুনি থেকে রক্ষা পাননি মহসিন। পরে মৃত ভেবে তাকে রেখে চলে যান হামলাকারীরা। ভিডিও ফুটেজ দেখে তুহিন, রাব্বী, পারভেজ, ফারহান ও খোকন নামে আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কিন্তু ঘটনার পর দলের নেতাদের মধ্যেই এ নিয়ে চলে টানাপড়েন।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল আলম জসীম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মহসিনের লোকেরাই তাকে মারধর করেছে।

নগরের আকবর শাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসীম উদ্দিন বলেন, এক যুবককে নির্দয়ভাবে পেটানোর ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। নিজেদের মধ্যে কোন্দলের জেরে এই মারামারির ঘটনা। গ্রেপ্তার আসামি সাজুর কাছ থেকে ঘটনায় সময় হাতে থাকা একটি লম্বা ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর নগরের সদরঘাট থানার নালাপাড়া এলাকায় নগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। ওই দিনই হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে নগরের লালখান বাজার এলাকার এক বড় ভাইয়ের নির্দেশে এই খুনের ঘটনা বলে গ্রেপ্তার আসামিরা জবানবন্দিতে জানিয়েছেন।

বর্তমানে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে। অথচ এখনো সেই বড়ভাইকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা যায়নি। সুদীপ্তের বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস বলেন, ছেলে হারানোর ঘটনায় বিচার না হলে লাশের সংখ্যা বাড়তে থাকবে।

এমন হুঙ্কারেই সমাজে একের পর এক ঘটনা বেড়েই চলেছে এবং নৃশংসতা বাড়ছে বলে মনে করছে অনেকে।

এ অবস্থার পরিত্রাণ সম্ভব যদি সমাজ ও রাজনীতির ফাংশনগুলো মানুষকে মানুষ ভেবে গতিশীলতা লাভ করে, মানবিকতার জয়গানকে তাজা করে তোলে। মানুষ চিরকাল মানুষের দিকে এগিয়ে যাবে— এটাই মানবতার অন্তর্নিহিত শপথ।

চ্ছ রাজনীতি ও সমাজ কাঠামোর পরিপুষ্ট বিকাশই পারে মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে। আর মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ মানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ।

এই প্রত্যাশা মানুষের সহজাত কাম্য, সমাজ কাঠামো ও রাজনৈতিক ক্রিয়া-কৌশল মানুষকে সেই যাত্রায় সহযোগিতা করবে। যে সহযোগিতায় মানুষ এগিয়ে যাবে মানবতার পাশে, নিজেকে দাঁড় করাবে সমপ্রীতির রূপকার ও বন্ধনের সংযোগকারী প্রক্রিয়ায়— এমনটাই মনে করছেন সামজ বিজ্ঞানীরা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments