পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের নেপথ্যে

431

শামীম শিকদার

বাংলাদেশে প্রতি বছর যতো মানুষের মৃত্যু হয় তার ২৮ শতাংশই মারা যায় পরিবেশ দূষণ জনিত অসুখবিসুখের কারণে। কিন্তু সারা বিশ্বে এধরনের মৃত্যুর গড় মাত্র ১৬ শতাংশ।পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংস্থার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, পরিবেশ দূষণের দিক দিয়ে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭৯ তম স্থান দখল করে আছে বাংলাদেশ। যেখানে ২০০৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৫ তম। অর্থাৎ গত এক যুগে দূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৫৪ ধাপ নিচে নেমেছে। শহরাঞ্চলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। দূষণের কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরিবেশ দুষণজনিত কারণে বাংলাদেশে যেখানে ২৮ শতাংশ মৃত্যু হয় সেখানে মালদ্বীপে এই হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ আর ভারতে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

পরিবেশ দূষণের বেশ কয়েকটি ভাগ রয়েছে। যেমন বায়ু দূষণ, মাটি দূষণ, পানি দূষণ, খাদ্য দূষণ ইত্যাদি। এর সবগুলোর ফলেই কোন না কোনভাবে মানুষ ক্ষতির শিকার হচ্ছে। পরিবেশ দূষণের ফলে দরিদ্র নারী ও শিশুরা ব্যাপকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে। কারণ তাদের বেশিরভাগই দূষিত এলাকায় বসবাস করেন। দূষিত এলাকায় বসবাসের ফলে গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভপাত ও মৃত শিশু প্রসবের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাচ্ছে এবং স্নায়ুবিক ক্ষতি হচ্ছে। ফুসফুসের নানা জটিলতা সহ ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়া, মাথাব্যথা, অ্যাজমা এবং নানাবিধ অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিতে পারে। কলকারখানার ধোঁয়া এবং যানবাহনের ধোঁয়া সহ সার কারখানা, চিনি, কাগজ, পাট এবং টেক্সটাইল মিল, টেনারীজ, গার্মেন্টস, কেমিক্যাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে প্রচুর পরিমাণ ধোঁয়া নির্গত হয় যা নিঃসন্দেহে বায়ু দূষণ করে যাচ্ছে। বেবি ট্যাক্সি, টেম্পু, মটর সাইকেল, ট্রলি প্রভৃতি টু-স্ট্রোক যাননবাহন থেকে অধিক ধোঁয়া নির্গত হয়। এছাড়া ঢাকা শহরের ৯০% যানবাহন ত্রুটিপূর্ণ যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে পানি দূষণে সাময়িক প্রভাবের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব অনেক বেশি পড়ে। বিশেষ করে শিল্প কলকারখানার বজ্য মানব দেহের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর। এসব পানি ব্যবহার চর্মরোগ, টাইফয়েড, জন্ডিস বা হেপাটাইটিসের মতো রোগ হতে পারে। এছাড়াও শব্দ দূষণ একটি মারাত্মক পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। বিশেষ করে শব্দ দূষণের কারণে নতুন প্রজন্ম মানসিক ও শারীরিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শব্দ দূষণের কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদরোগ, খিটখিটে মেজাজ, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বিঘ্নিত হওয়া, ঘুমের ব্যাঘাতসহ নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়। ‘শহর এলাকায় শব্দ দূষণের প্রকোপ গ্রামাঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি। ঘরের বাইরে, রাস্তায় বা কর্মস্থলেই নয়, ঘরে ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি থেকেও বিরক্তিকর শব্দ বের হয়। তাছাড়া, যানবাহনের জোরালো হর্ন ও ইঞ্জিনের শব্দ, যানবাহন, বিভিন্ন নির্মাণ যন্ত্র, কলকারখানা নির্গত শব্দ, নির্বিচার লাউড স্পিকারের শব্দ, অডিও ক্যাসেটের দোকানসহ বিভিন্নভাবে উচ্চ শব্দে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।’ মাটি দূষণের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে নানান রোগ। এর মধ্যে রয়েছে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের সমস্যা, ম্যালেরিয়া, কলেরা, আমাশয়, চর্ম ও পাকস্থলীর সংক্রামন সহ বহু অজানা রোগ।কারখানা বর্জ, বালাইনাশক, আগাছানাশক এবং অন্যান্য বর্জে মাটি দূষণ হয়ে থাকে। মানুষ এসব দূষিত মাটির সংস্পর্শে আসার ফলে রোগাক্রান্ত হয়।

পরিবেশ দূষণের কারণে আজ মানব সভ্যতার অস্তিত্ব বিঘ্নিত । এই গভীর সংকটের মোকাবিলা করার জন্য আমাদের প্রত্যেকেই সচেতন হতে হবে এবং নজর দিতে হবে যাতে পরিবেশের দুষণের মাত্রা না বাড়ে । বিজ্ঞান যতই উন্নত হোক বা প্রযুক্তিবিজ্ঞান যতই আমাদের উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যাক মানুষের জন্য সভ্যতা মানুষের হাতেই যদি বিনাশ হয় তাহলে কি লাভ? পরিবেশ দূষণের সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্ভিদের ভূমিকা অনেক বেশি। সবুজ উদ্ভি সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের খাদ্য নিজে প্রস্তুত করতে পারে । এই প্রক্রিয়ায় গাছ বাতাস থেকে কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে আর বাতাসে অক্সিজেন ছেড়ে দেয় । যে অক্সিজেন প্রাণীজগতের বাঁচার জন্য অপরিহার্য্য । তাই বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং সংরক্ষণ করতে হবে । তাহলে বাতাসে কার্বন-ডাই অক্সাইডের ভারসাম্য বজায় থাকবে । কলকারখানা থেকে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিয়ন্ত্রক যন্ত্রের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে । শব্দদূষণ কমানোর জন্য শব্দ নিরোধক যন্ত্রের ব্যবহারের উপর জোর দিতে হবে । রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সারের প্রয়োগ বেশি করে এবং কীটনাশকের পরিমাণ কমিয়ে মৃত্তিকা দূষণ রোধ সম্ভব । সর্বোপরি জনগনের সচেতনতার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারকে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

দৈনিক আলোকিত সকাল

০১৭৯৯৩৮৯০৫০

Facebook Comments