পাঠাও-উবার মোটরসাইকেল চালকদের নির্ধারিত পোশাকের চিন্তা-ভাবনা

231

আলোকিত সকাল ডেস্ক

পাঠাও-উবারসহ বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং কোম্পানির আওতাভুক্ত মোটরসাইকেল চালকদের নির্ধারিত পোশাক চান সাধারণ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী এবং বেশ কিছু যাত্রী। সাধারণ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের মধ্যে নির্ধারিত পোশাকের দাবি বেশি জোরালো। তবে রাইড শেয়ারিং আওতাভুক্ত মোটরসাইকেল চালকদের মাঝে নির্ধারিত পোশাক ব্যবহারে আপত্তি আছে। এদিকে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো পাঠাও-উবার মোটরসাইকেল চালকদের নির্ধারিত পোশাকের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। সম্প্রতি বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

পেশায় ব্যবসায়ী ওমর ফাহাদের বাসা ঢাকার মাতুয়াইলে। প্রতিদিনই তিনি ব্যবসায়িক কাজে নিজের মোটরসাইকেলে চলাফেরা করেন। তিনি বলেন, রাইড শেয়ারিং মানে আমি কোথাও যাচ্ছি, সুযোগ থাকলে অ্যাপের মাধ্যমে কাউকে নিয়ে যাব। এতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে- রাইড শেয়ারিংয়ের আওতাভুক্ত মোটরসাইকেল চালকদের অধিকাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো, ফুল টাইম রাস্তায় থাকেন, মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, অনেকে অ্যাপও ব্যবহার করেন না। এ অবস্থায় রাইড শেয়ারিং আর থাকল কোথায়?

ওমর বলেন, যদি তারা সিএনজিচালিত অটোরিকশার পদ্ধতিতেই চলতে স্বাচ্ছন্দ্য পান, তাহলে তাদের মতো নির্ধারিত পোশাক দেয়া বাঞ্ছনীয়।

ফেসবুকভিত্তিক মোটরসাইকেল কমিউনিটি বিডি বাইকার্স ক্লাবের (এডমিন) রবি কিরণ দৈনিক জাগরণকে বলেন, বর্তমানে দেখা যায় রাইড শেয়ারিং আওতাভুক্ত মোটরসাইকেলগুলো অ্যাপ ছাড়া চলছে। চালকরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রীদের ডাকছেন। এতে যাত্রীরাও বিভ্রান্ত হন। অনেক সময় যাত্রীরা যেকোনো মোটরসাইকেল দেখলেই মনে করেন- এটা বুঝি পাঠাও বা উবার। তারা ডাক দেন, সেই মোটরসাইকেল চালককে ঠিক যেভাবে সিএনজি অটোরিকশা বা রিকশাচালককে ডাকা হয়। প্রায়ই দেখা যায়, যাকে পাঠাও-উবার মনে করে ডাকা হলো, তিনি তা চালান না। সেক্ষেত্রে সেই মোটরসাইকেল চালক মনোক্ষুণ্ন হতে পারেন, বা ডাক দেয়া যাত্রীর সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে কথা কাটাকাটিও হতে পারে। রাইড শেয়ারিং আওতাভুক্ত মোটরসাইকেল চালকদের যদি নির্ধারিত পোশাক থাকত, তাহলে এসব ঘটনা সহজে এড়ানো যেত।

মোটরসাইকেলের সাধারণ চালক রায়হান শরীফ বলেন, খুব বিপদে আছি। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হয়ত মোবাইল ফোন খুলে দেখছি, হঠাৎ লোকজন জিজ্ঞাসা করে, ‘পাঠাও নাকি, যাবেন নাকি?’ এমনকী পেছনের আরোহীর জন্য হেলমেট দেখলেও একইভাবে জিজ্ঞেস করে, ডাক দেয়। এ কারণে অতিরিক্ত হেলমেট নেয়াই বাদ দিয়েছি। তারপরও মুক্তি মিলছে না।

মোটর সাইকেলের সাধারণ চালক হাজি আবু বকর বেশ উত্তেজিত সুরে বলেন, যে অবস্থা শুরু হইছে, একসময় যে সিএনজি অটোরিকশা-লেগুনা চালাত, বাসের হেল্পারি করত, সে এখন চালায় পাঠাও-উবার। তারা সেসময় যাত্রীদের সঙ্গে যে রুক্ষ আচরণ করত, সেটা পাঠাও-উবার যাত্রীদের সঙ্গেও করে। এতে যাত্রীরা মনে করেন- মোটরসাইকেল চালক মাত্রই এমন দুর্ব্যবহার করেন। যেটা আমাদের মতো শৌখিন মোটরসাইকেল চালক বা যারা মোটরসাইকেল দিয়ে রাইড শেয়ার করেন না, তাদের জন্য মানহানিকর ও অপমানজনক। যদি নির্ধারিত পোশাক থাকত, তাহলে মানহানিকর ও অপমানজনক হওয়ার বিষয়টি আসত না।

প্রায় দুই বছর ধরে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করে রাজধানীতে চলাফেরা করেন ইমরান হোসেন সবুজ। তিনি বলেন, দিনদিন অবস্থা নিচের দিকে যাচ্ছে। অনেকে অ্যাপে যেতেই চায় না। আবার প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী বিকাশ বা কার্ড পেমেন্ট গ্রহণ করতে চায় না। জানি অপরাধ, তারপরও নিরুপায় হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মোটরসাইকেল ডেকে বলি, যাবে কি-না। কখনো দেখা যায়, অনেক মোটরসাইকেল চালক দুর্ব্যবহার করে জানান, তারা পাঠাও-উবার নন।

ব্যাংক কর্মী ফরহাদুল ইসলাম বলেন, রাইড শেয়ারিং আওতাভুক্ত অধিকাংশ মোটরসাইকেল চালক অ্যাপে যান না। তারা যাত্রী ডাকেন, অপেক্ষা করেন। সিএনজি অটোরিকশা দেখলে না হয় বোঝা যায় বা এর চালকের নির্ধারিত পোশাক দেখলে বোঝা যায়- তাদের ডাকতে পারি। কিন্তু যেকোনো মোটরসাইকেল চালককে তো ডাকতে পারি না। তাদের মোটর সাইকেলেও কিছু লেখা থাকে না অথবা চালকদের নির্ধারিত পোশাকও নেই। বোঝার সুবিধার জন্য রাইড শেয়ারিং আওতায় থাকা মোটরসাইকেলের গায়ে কিছু লেখা বা চালকদের নির্ধারিত পোশাক থাকা এখন সময়ের দাবি।

নির্ধারিত পোশাক চান না চালকরা :
বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) বেলা ৩টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের কাছে কিছু মোটরসাইকেল দেখা গেল। এসবের চালকরা অ্যাপ ছাড়া যাত্রীর খোঁজে ছিলেন। তাদের একজন আবদুর রহমান। তিনি দুই বছর ধরে মোটরসাইকেল দিয়ে রাইড শেয়ার করছেন, এর আগে সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালাতেন। একটু কৌশল করে আবদুর রহমানকে বলা হয়- আপনাদের জন্য তো নির্ধারিত পোশাক দেবে কোম্পানি। এগুলো গায়ে না দিয়ে মোটরসাইকেল চালাতে পারবেন না। পুলিশ ধরলে মামলা দেবে।

জবাবে আবদুর রহমান বলেন, ‘পোশাক পিন্দুম না।’

‘সমস্যা কী?’ এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বাড়িতে জানে সিএনজি চালানো ছেড়ে দোকানদারি করি। পোশাক পরা অবস্থায় পরিচিত কেউ যদি মোটরসাইকেল দিয়া খ্যাপ মারতে দেহে, বাড়ি থিকা চাপে পরুম।’

বনানী স্টার কাবাবের সামনে যাত্রীর জন্য অপেক্ষারত মোটরসাইকেল চালক রনজু মিয়া বলেন, ‘ড্রেস থাকলে পুলিশে আরও বেশি জ্বালাইব। এখন তো চিনতে পারে না। তখন চিইন্না ফালাইব।’

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পাভেল তালুকদার। তিনি বলেন, আসলে দেখেন, আমি তো ছাত্র। পড়ার কিছু খরচ, হাত খরচ তোলার জন্য রাইড শেয়ার করি। এটা বাসায় জানে না। ড্রেস দিলে তো মানুষজন চিনে ফেলবে, বন্ধুরা ভাল চোখে দেখবে না, বাড়িতে জেনে যাবে।

সাধারণ মোটরসাইকেলের চালক হারুন, বাসা মোহাম্মদপুরে। চাকরি করেন মতিঝিলে অবস্থিত একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় একজন নিয়ে যান, ফিরে আসার সময় একজন নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, আমি তো অ্যাপের বাইরে কাউকে তুলি না। আর আমি তো সিএনজি অটোরিকশা চালকদের স্টাইলে মোটর সাইকেলে ট্রিপ দিই না। নির্ধারিত পোশাক পরে রাইড শেয়ার দিলে, তা আমার জন্য মানহানিকর হবে।

রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো যা বলছে :
‘সহজ’ ডটকমের কল সেন্টারের কর্মী ফারজানা দৈনিক জাগরণকে বলেন, আমাদের অ্যাপ ব্যবহার করে যারা রাইড শেয়ার করছেন, তারা তো অফিসে যাওয়ার পথে বা নির্ধারিত গন্তব্যে যাওয়ার পথে কাউকে নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে চালকদের জন্য নির্ধারিত ড্রেস কোড করার পরিকল্পনা আমাদের নেই।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অ্যাপের বাইরে যারা যাত্রী পরিবহন করেন, তারা নিজ পরিবহন দিয়ে করেন, সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু বলার নেই।

রাজধানীর বনানীতে ‘পাঠাও’ এর প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দায়িত্বশীল কারও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। একজন সাধারণ কর্মী জানান, চালকদের নির্ধারিত পোশাকের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনা নেই। তবে পাঠাওতে রেজিস্ট্রেশন করা কোনো মোটরসাইকেল চালক যদি অ্যাপ ছাড়া যায়, এটা যদি যাত্রী প্রমাণ দিতে পারেন, তাহলে সেই চালকের রেজিস্ট্রেশন আজীবনের জন্য বাতিল করা হয়।

সহজ এবং পাঠাওয়ের মতো একই জবাব পাওয়া যায় ‘উবার’ এর ঢাকা অফিস থেকে।

নিয়ন্ত্রণকারীরা কী বলছে :
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) থেকে তেমন কোনো জবাব পায়নি দৈনিক জাগরণ। শনিবার (১৩ জুলাই) দুপুরে সংস্থাটির পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) লোকমান হোসেন মোল্লাকে কয়েক দফা ফোন করেও সাড়া মেলেনি। ইঞ্জিনিয়ারিং ও এনফোর্সমেন্ট শাখার পরিচালক পদের নিচের পদধারী একাধিক কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত পোশাক নিয়ে আমরাও ভাবছি। কেননা, কোম্পানিগুলো মুখে রাইড শেয়ারিং বললেও বাস্তবে তা হচ্ছে না।

কবে নির্ধারিত পোশাক বাস্তবায়ন করার পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে- সে বিষয়ে জবাব পাওয়া যায়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এর ট্রাফিক বিভাগের একজন ডিসি দৈনিক জাগরণকে বলেন, পাঠাও-উবার মোটরসাইকেল চালকদের নির্ধারিত পোশাক আসলেই দরকার। তাদেরকে পর্যবেক্ষণে আমাদের সুবিধা হবে, নৈরাজ্যজনক কিছু হওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে। বিআরটিএর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকে এটি উপস্থাপনের বিষয়ে আমরা ভাবছি। সবচেয়ে বড় কথা কোম্পানিগুলো নামে রাইড শেয়ারিং, কাজে তা নেই। কোম্পানিগুলো নিজেরাই নিজেদের মোটরসাইকেল চালকদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments