প্যাকেজ আন্দোলনের সমর্থকরাও বিলীন

282

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক, বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক, জোটের বৈঠক করেও নির্বাচন-পরবর্তী সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি বিএনপি।

অন্যদিকে বন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তিতে ১৭ মাসেও কার্যত ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন মির্জা ফখরুলরা।

এরই মধ্যে বামপন্থি নেতার ঐক্য-প্রগতির স্লোগানে বিরোধী দলীয় চরিত্র নষ্ট হয়ে গেছে তিনবারের ক্ষমতায় থাকায় দলটির। দলের ভেতরেই যে নেতৃত্ব নিয়ে টানাটানি, অসন্তোষ এটিও আর গোপন নেই। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট।

মাঠপর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, বিএনপিতে জিয়া পরিবারের আদর্শের চরম সংকট চলছে। কেননা জিয়া পরিবারের বিশ্বস্ত অন্যতম ব্যক্তি কর্নেল অলি আহমদ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ফখরুলদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর একটা অংশ মনে করছে ড. কামাল-ফখরুলরা একটা এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই কাজ করছেন।

শুধু বিএনপি নয়, এই দলের রাজচরিত্রে অসন্তুষ্ট হয়ে সঙ্গ ত্যাগ করেছেন জোটের অন্যতম সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং ঐক্যর নেতা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও! রাগ-ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন মাহমুদুর রহমান মান্নাও।

দলে জোটের সবাই চায় খালেদা জিয়ার মুক্তি, সবার থেকে আসে আন্দোলনের প্রস্তাবনা আর দলের মহাসচিব থেকে আসে কৌশলের বাণী!

কখনো বলা হয়, নির্বাচনে অংশ নিলে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবে, শপথ গ্রহণ করলে খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলতে পারে এমন আশ্বাসে বারবার ধোঁকা খেয়ে এক সময়ে যারা প্যাকেজ আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন আজ তারাও বিলীন হয়ে গেছেন এই দল থেকে।

এখন ফের শীর্ষ নেতাদের ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে, আগামী ঈদুল আজহার আগেই অর্থাৎ দেড় মাসের মধ্যে বন্দি খালেদা জিয়া মুক্তি পেতে পারেন। আন্দোলনের প্রয়োজন হবে না, প্যারোলে মুক্তিও চাওয়া লাগবে না, আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়া বের হয়ে আসবেন।

যদিও বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, বিদেশিদের আশ্বাসে বিএনপি যদি খুশি হয়ে সত্যিই মনে করে খালেদা জিয়া বের হয়ে যাবেন তাহলে তা ভুল সমীকরণে
থাকা হবে। কেননা, এই সরকারের সামনে রয়েছে বড় দুটি চ্যালেঞ্জ।

একটা হচ্ছে- বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, আরেকটি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। স্বাভাবিকভাবেই মুক্তির আশা করা যায় না। আর যদি সমঝোতায় বের হন তাহলে খালেদা জিয়ার আপসহীন নেত্রীর বড় অর্জনও নষ্ট হয়ে যাবে।

দলের অনেকের কাছেই তথ্য রয়েছে, ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়ালে বিএনপির যোগাযোগের বিষয়টি।

ধারণা করা হচ্ছে, হয়তো বিএনপির সঙ্গে সরকারের এমন সমঝোতা হতে পারে যে, খালেদা জিয়া মুক্তি পেলে তাকে চিকিৎসার জন্য সুকৌশলে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হবে। আর দেশে থেকে বিএনপি কোনো ধরনের আন্দোলন করতে পারবে না।

তবে খালেদার মুক্তিতে অন্য একটি সমীকরণ দেখছেন বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবীরা। ক্ষমতাসীন সরকারের সংসদে বিরোধী দলীয় অবস্থানে রয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দল জাতীয় পার্টি।

বয়সের ভারে সেই এরশাদ এখন ভালো নেই। রয়েছেন আইসিউতে। একেবারেই মৃত্যুশয্যায়। তার দল থেকেও বলা হচ্ছে, এরশাদ আইসিউতে এখনো জীবিত আছেন, তিনি সুস্থ এটা বলা যাবে না।

সে ক্ষেত্রে এরশাদের দুর্ঘটনার সঙ্গে খালেদা জিয়ার মুক্তির একটা সম্পৃক্ততা থাকবে। যেহেতু ক্ষমতাসীনদের একতরফা শাসনে বিরোধী দলের ভূমিকা একেবারেই মৃত। হঠাৎ করে যদি এরশাদও হারিয়ে যান তাহলে ক্ষমতাসীন সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় একটা চাপের সম্মুখীন হবে।

তাই আগে থেকেই কৌশলে একটা সমঝোতায় খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিলে বিএনপি যদি একটু চাঙ্গা থাকে তাহলে সরকারের ঘরেই লাভের হিসেব বেশি থাকবে।

সবমিলিয়ে বিএনপির হাইকমান্ড থেকে দলের শীর্ষ নেতাদের কাছে একটা ইঙ্গিত রয়েছে আগামী কুরবানি ঈদের আগেই খালেদা জিয়া মুক্তি পেতে পারেন।

তবে এমন ইঙ্গিতেও দলের ওপর আর আস্থা রাখছেন না দীর্ঘ সময় ধরে যারা প্যাকেজ আন্দোলনের দাবি জানিয়ে আসছেন।

দলের অনেক নেতারই দাবি, বিএনপির এখন যে নেতৃত্ব তা দিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

তাই এতদিন যারা একটা সবুজ সময়ের জন্য মাঠপর্যায়ে ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন তারাও আস্তে আস্তে নরম হয়ে রাজনীতি থেকে সাময়িক দূরে সরে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য আর সংসারে মনোযোগী হচ্ছেন। তারেক জিয়ার অর্থ সাপোর্টে রয়েছেন এমন একজনের সঙ্গে কথা হয় দৈনিক আমার সংবাদের।

তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, এখন বিএনপিকে যদি আল্লাহ বিশেষভাবে কোনো শক্তি না দেয়, তাহলে বিএনপির চলমান ভূমিকায় খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন, আর তারা কৌশলে বিদেশিদের কাছে গিয়ে অভিযোগ করে এই সরকারকে হটিয়ে দেবেন— এটা অন্তত বিশ্বাস হয় না।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, এখন খুব একটা খারাপ আছি তাও বলা যাবে না। ব্যবসার দিকে আগের চেয়ে একটু মনোযোগী, পরিবারকে সময় দিচ্ছি।

দলের মধ্যে শীর্ষরা বিভক্ত, নিজ দলের কর্মীদের ওপর নেই আস্থা। বিএনপির ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেক বিজ্ঞরাই দল ত্যাগ করছেন। এর মাধ্যমে বিএনপি যে বিরোধী দলীয় দল হিসেবে একটা পরিচয় আছে সেটিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তাছাড়া এখন দলের মধ্যে জিয়া পরিবারের আদর্শের বড় সংকট দেখা দিয়েছে। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এমন নেতৃত্ব শূন্য হয়ে আসছে। বামপন্থি নেতা ফখরুলকে দিয়ে দলের আদর্শ বাস্তবায়ন যে করা অসম্ভব এটা সবারই জানা। এমন ইঙ্গিত বিজ্ঞরাও দিয়েছেন।

বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের একজন হচ্ছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য তিনি। অথচ বিএনপির এই নেতার মুখেই শোনা গেল কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ব্যর্থতার কথা।

গয়েশ্বর রায়ের মতে, খালেদা জিয়া দলের মধ্যে সৎ, নির্ভীক ও সাহসী লোক তৈরি করতে পারেননি। বিএনপি নেত্রী হিসেবে এটাই তার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

খালেদা জিয়ার চারপাশে থাকা মানুষগুলোর মধ্য থেকে সৎ পরামর্শ দেয়ার মতো লোক তৈরি হয়নি। আর এ কারণেই বিএনপির নেতারা সংকট মোকাবিলা করতে ভয় পাচ্ছেন।

আর সেই সুযোগ নিয়ে সরকার খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি নেয়ার ব্যাপারে উস্কানি দিচ্ছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী বিএনপির ছয়জন সদস্য সম্পর্কে গয়েশ্বর বলেন, বিএনপির নির্বাচিতরা বলছেন, জনগণের ইচ্ছে, সংসদে যেতে তাদের চাপ আছে।

সুতরাং দল বললে তারা প্রস্তুত এবং তাদের কাপড়-চোপড়ও প্রস্তুত রয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম, তারা বলবেন দল বললে আমরা যাব, অন্যথায় যাব না। খালেদা জিয়া মুক্তি পেলে আমরা সংসদে যাব, অন্যথায় যাব না। এই কথাগুলো শুনতে চেয়েছিলাম।

এদিকে এখনো দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ১৭ মাস ধরে কারাভোগ করছেন বেগম খালেদা জিয়া। দলীয় প্রধানকে মুক্ত করতে ঢিলেঢালা আন্দোলন কর্মসূচি দেয়া হচ্ছে বিএনপির তরফে।

ছক বেঁধে বেঁধে বা প্যাকেজ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার কোনো পদক্ষেপ না থাকলেও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাষ্য, এ মুহূর্তে খালেদা জিয়ার মুক্তিই তাদের প্রধান লক্ষ্য।

এ লক্ষ্যে আইনগত লড়াই ও রাজপথের আন্দোলনসহ যা কিছু করা প্রয়োজন- তার সবই করবেন। তিনি আরও মনে করেন, আজকে খালেদা জিয়ার মুক্তি আমরা চাচ্ছি এ কারণে যে, তার মামলাগুলো সম্পূর্ণভাবে সাজানো।

দ্বিতীয়ত, একই ধরনের মামলায় সরকারের অনুসারীদের জামিন দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদেরকে জামিন দিচ্ছেন না। দেশনেত্রীকে জামিন দেয়া হচ্ছে না। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি।

এ প্রসঙ্গে ফখরুল আরও বলেন, আজকে বেগম খালেদা জিয়াকে যে মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে, একই ধরনের মামলা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ছিলো ১/১১-এর সময়।

সেই ১৫টা মামলা তারা খারিজ করে দিয়েছে, বাতিল করে দিয়েছে। অথচ খালেদা জিয়ার জামিন না দিয়ে তার বিরুদ্ধে উল্টো নতুন করে আরও মামলা যোগ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি একটা গণদাবি, সাধারণ মানুষের দাবি, দলমত নির্বিশেষে সবাই বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চায় এবং গণতন্ত্রের মুক্তি চায়।

আলোকিত সকাল/এসআইসু

Facebook Comments