প্রস্তুতিহীন উদ্যোগে ভোগান্তি চরমে

210

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দুই শিশুসন্তান নিয়ে বনশ্রী থেকে রিকশাযোগে মালিবাগ সাউথ পয়েন্ট স্কুলে যাচ্ছিলেন গৃহবধূ নূরজাহান সামিনা। তবে রামপুরা টিভি সেন্টার পার হতেই তা আটকে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী এ সড়কে সকাল থেকে রিকশা চলাচল বন্ধ জানিয়ে তাদের হেঁটে কিংবা বিকল্প কোনো যানে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর পরামর্শ দেয় পুলিশ। এ অবস্থায় নিরুপায় হয়ে রিকশা ছেড়ে দিয়ে বাসস্টপেজে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন তারা। তবে ২০ মিনিট পর ছালছাবিল পরিবহনের একটি বাস এলেও সেখানে অপেক্ষমাণ অন্য যাত্রীদের সঙ্গে হুড়োহুড়ি করে শিশুসন্তানদের নিয়ে তাতে চড়তে ব্যর্থ হন। পরে টিপটিপ বৃষ্টিতে ভিজে দু’সন্তানসহ হেঁটেই স্কুলে যান। যদিও সেখানে পৌঁছে জানতে পারেন বাম দলের অর্ধদিবস হরতালের কারণে স্কুলে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ অবস্থায় প্রায় চার গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে অলিগলির পথ ঘুরে রিকশায় বাসায় পৌঁছান।

একই ধরনের ভোগান্তির শিকার হন রামপুরা মহানগরের বাসিন্দা সুরাইয়া আয়েশা। তিনি হাজীপাড়ার একটি ব্যাংকে বিদু্যৎ বিল দিতে রিকশাযোগে রামপুরা প্রধান সড়কে আসার পর পুলিশ তাকে রিকশা থেকে নেমে যেতে বাধ্য করে। এ অবস্থায় তিনি হেঁটে সেখানে যেতে বাধ্য হন।

সুরাইয়া জানান, বেশ কিছু সময় তিনি বাসস্টপেজে দাঁড়িয়ে থাকলেও স্বল্প দূরত্বে যাওয়ার কথা শুনে পরিবহন শ্রমিকরা তাকে বাসেই উঠতে দেয়নি। তাই উপায়ান্তর না পেয়ে তাকে হেঁটেই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে।

শুধু নূরজাহান কিংবা সুরাইয়াই নন, এ পথের শত শত রিকশাযাত্রীকে রোববার সকাল থেকে দিনভর নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

অন্যদিকে কুড়িল থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কের দু’পাশে রড-সিমেন্ট, টিন-বোর্ড, গস্নাস-থাই এবং চাল-আটাসহ বিভিন্ন পণ্যের যেসব পাইকারি দোকান রয়েছে, তারা পড়েছে আরও ভয়াবহ বিপাকে। দোকান মালিকরা জানান, রোববার সকাল থেকে দিনভর অধিকাংশ দোকানেই কোনো বেচাবিক্রি হয়নি। কেননা ৫-১০ ব্যাগ সিমেন্ট, ২-৪ পিস টিন কিংবা বোর্ড বা দুয়েক বস্তা চাল-আটা কিনে ক্রেতারা তা রিকশা-ভ্যানে স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারেনি। অথচ অল্প মাল নিয়ে কাছাকাছি দূরত্বে মিনি ট্রাকে নিয়ে যাওয়াও অসম্ভব। তাই ক্রেতাদের অনেকে পণ্য কিনেও সুবিধামতো পরিবহন না পাওয়ায় পরে তা ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছেন। এ অবস্থায় প্রধান সড়ক সংলগ্ন পাইকারি দোকানিদের ব্যবসা অনেকটাই লাটে উঠেছে।

মধ্যবাড্ডার প্রগতি সরণি সংলগ্ন মেসার্স দেলোয়ার এন্টারপ্রাইজের মালিক সাঈদ হোসেন জানান, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত তার অন্তত ২০ জন ক্রেতা পণ্য কিনেও পরিবহন সংকটের কারণে তা ফেরত দিয়ে গেছেন। ক্ষুব্ধ এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘মধ্যবাড্ডা থেকে দু’বস্তা চাল কিংবা আটা কিনে আফতাবনগর কিংবা বনশ্রীর মুদি দোকানিরা তো আর ট্রাক ভাড়া করবে না। বাসেও তো এসব পণ্য পরিবহন করবে না। তাহলে কি ক্রেতারা এসব মাল মাথায় করে দোকানে কিংবা বাড়িতে নিয়ে যাবে? কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই প্রশাসনের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নগরবাসীকে ভীষণভাবে ভোগাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে নগর প্রশাসনের এ ধরনের অপরিকল্পিত উদ্যোগে শুধু দোকান মালিকই নন, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষও নানাভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তাদের ভাষ্য, যানজট নিয়ন্ত্রণে রোববার সকাল থেকে রাজধানীর কুড়িল বিশ্ব রোড থেকে রামপুরা, খিলগাঁও হয়ে সায়েদাবাদ; গাবতলী থেকে আজিমপুর এবং সায়েন্সল্যাব থেকে শাহবাগ পর্যন্ত এ তিন রুটে রিকশা চলাচল বন্ধ করা হলেও এসব সড়কে বিআরটিসি কিংবা নগর সার্ভিসের অন্য কোনো পরিবহনের পর্যাপ্ত গাড়ি নামানো হয়নি। এছাড়া স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা যাতে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে এজন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রধান সড়ক সংলগ্ন ফুটপাতও চলাচল উপযোগী করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তাই এসব সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ হওয়ার পর সাধারণ মানুষকে ঝুঁকি নিয়েই ব্যস্ত সড়কের পাশ দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। এতে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা আরো বেড়েছে।

এদিকে তিন রুটে রিকশা চলাচল বন্ধ ঘোষণা বাস্তবায়নের প্রথম দিন রামপুরা-বাড্ডা, মানিকনগর-সায়েদাবাদ ও খিলগাঁও-মুগদা প্রধান সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট সক্রিয় থাকলেও গাবতলী থেকে আজিমপুর এবং সায়েন্সল্যাব থেকে শাহবাগ এই দুই সড়কে এ ধরনের তৎপরতা ততটা চোখে পড়েনি। তাই সকাল থেকে এসব সড়কে পর্যাপ্ত রিকশা চলাচল করতে দেখা গেছে। যদিও এসব সড়কে নিয়মিত রিকশায় চলাচল করেন, এমন অনেককেই রোববার সকালে বাসে কিংবা বিকল্প কোনো পরিবহনে চড়ে কর্মস্থলসহ বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছেছেন- এমন খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে ঘোষণা দিয়েও রোববার এসব সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধে কেন পর্যাপ্ত তৎপরতা দেখানো হয়নি, এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের কেউ সরাসরি কোনো কথা বলতে চাননি। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রোববার বাম দলের হরতাল থাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এ দিন তারা কিছুটা নিষ্ক্রিয় থেকেছে। তবে রিকশা চলাচল বন্ধে সোমবার থেকে তারা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামবে।

ফুটপাত দখলমুক্ত এবং এসব সড়কে পর্যাপ্ত বাস-মিনিবাস কিংবা বিকল্প যান চলাচলের ব্যবস্থা না করে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হলে সাধারণ জনগণ ভোগান্তিতে পড়বে কি না, এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি।

যদিও ঢাকা মহানগর ট্রাফিক বিভাগের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দাবি, রাজধানীর প্রধান দুই রুটসহ এই তিন সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ হলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই যানজট কেটে যাবে। এতে যানবাহনের গতি বাড়তে, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পরিবহন সংকটও কমাতে সহায়তা করবে। নগরবাসীও বাস-মিনিবাস কিংবা বিকল্প যানে চড়তে অভ্যস্ত হবে। পাশাপাশি শিগগিরই ফুটপাত দখলমুক্ত করার জোরালো উদ্যোগ নেবে পুলিশ। ওই কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাজধানীর এই তিন রুটে রিকশা চলাচল বন্ধ করা সম্ভব হলে নগরবাসী নানাভাবে উপকৃত হবে। পাশাপাশি নগরীর সৌন্দর্যও বাড়বে।

এদিকে নগরীর দীর্ঘ তিন রুটে রিকশা চলাচল বন্ধ, এসব সড়ক সংলগ্ন ফুটপাত দখলমুক্ত এবং পর্যাপ্ত বাস-মিনিবাস চালু করার বিশাল কর্মযজ্ঞ আদৌ সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নগরবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। তাদের আশঙ্কা, এসব পথে রিকশা চলাচল হয়তো বন্ধ হবে; তবে ফুটপাত দখলমুক্ত কিংবা স্বল্প দূরত্বে যাত্রী বহন করা বাস-মিনিবাসের সংখ্যা বাড়ানোর কাজ বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘ সময় লাগবে। আর এ সময়টুকু সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও চরমে পৌঁছবে। এ ধরনের বিশাল পরিকল্পনা হাতে নেয়ার আগে ‘গ্রাউন্ড ওয়ার্ক’ করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তারা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments