প্রস্তুতি শেষই হচ্ছিল না সাকিবের!

258

আলোকিত সকাল ডেস্ক

মাঠে কিংবা টিভিতে শুধু ব্যাট-বলের লড়াইটাই দেখা যায়। এর পেছনের মেহনত দর্শকদের আর জানা হয় না। স্কয়ার কাট কিংবা ড্রাইভ, কাভার ড্রাইভ আর পুল কী সুন্দর খেলেন সাকিব আল হাসান। তবে রানপ্রসবা এই শটগুলো খেলার জন্য শীর্ষ এ ক্রিকেটারকে কতটা কষ্ট করতে হয় জানেন? সৌভাগ্য যে গতকাল বার্মিংহামের এজবাস্টনে ঢুকে সেটা আরেকবার দেখার সুযোগ হয়েছে। ননস্টপ ড্রিল করে গেছেন একেকটা শটের, নির্ধারিত নেটে এবং এরপরে আলাদা করে সাইড নেটে।

সকালের নেটে বোলারদের আধাঘণ্টা খেলেছেন সাকিব। কোনো ঢিলেমি নয়, ম্যাচ পরিস্থিতি কল্পনায় এঁকে ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজেছে তাঁর প্রতিটি শট। এজবাস্টনের মূল মাঠের সঙ্গেই নেট থেকে ঘর্মাক্ত তিনি বেরোতেই মনে হলো আজকের পালা বুঝি শেষ। কিন্তু কিসের কি! নেট থেকে হেঁটে সোজা স্টেডিয়ামের মূল মাঠে জাতীয় দলের ট্রেনার মারিও ভিল্লাভারায়েনকে ডেকে নিলেন সাইড নেটে। প্রথমে ভারী বল দিয়ে কয়েক রাউন্ড ড্রাইভ খেলেছেন সাকিব। এরপর পুল কয়েক রাউন্ড এবং সবশেষে কাভার ড্রাইভ। দেখে অবাক লাগছিল, যে শটগুলো স্বচ্ছন্দে খেলেন সেগুলোর জন্য আলাদা ড্রিল করার কি দরকার আছে?

একটা সময় দরকার হতো না সাকিব আল হাসানের। বিশেষ করে ম্যাচের আগের দিন তো তাঁকে মনে হতো নিছকই পর্যটক! এ নিয়ে বেশ নাখোশই ছিলেন চন্দিকা হাতুরাসিংহে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ম্যাচের আগের দিন নেটে সময় বাড়িয়ে দেন সাকিব। কতটা নিজের ইচ্ছায় কিংবা কোচের চাপাচাপিতে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে স্টিভ রোডসের জমানায় তাঁকে বিশেষ নির্দেশিকা ধরিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। তবু আজকাল নেটে অন্য যে কারোর চেয়ে বেশি তৎপর সাকিব। ২০১৯ বিশ্বকাপকে টার্গেট করে সেই আয়ারল্যান্ড সফর থেকেই অবিশ্বাস্য মনোযোগী তিনি নেটে, সেটা ম্যাচের আগের দিনের ঐচ্ছিক অনুশীলনেও।

নিয়মিত নেটে তো আর বিশেষ ড্রিল হয় না। নেট বোলার বল করেন কিংবা ডগস্টিক দিয়ে বল ছোড়েন কোচিং স্টাফের সদস্যরা। বিশেষ ড্রিলটা তাই সবাইকে করতে হয় নিয়মিত ব্যাটিং অনুশীলনের পরে সাইড নেটে। সে পর্বে মূলত দুর্বলতার জায়গাগুলো নিয়েই ঘষামাজা হয় বেশি। কিন্তু সাকিবকে দেখা যাচ্ছে পছন্দের শট নিয়েই কাজ করছেন।

এবং এটাই ২০১৯ সালের সাকিব আল হাসান। দুর্বলতা নিয়ে কাজ করার ফাঁকতালে না আবার শক্তির পাল্লায় ধুলো জমে। প্রস্তুতির কোনো সেক্টর যেন অবহেলায় প্রতিপক্ষের দখলে চলে যায়। দেখে-টেখে তাঁর নব্য একটা ক্রিকেট দর্শন বারবারই কানে বাজে, ‘আমি শুধু কষ্টই করে যেতে পারি। ফল আমার হাতে নেই।’ তবে কে না জানে যে, কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে—দুদিন আগে কিংবা পরে। সাকিব অবশ্য নগদেই পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের আগে গমগমে সংবাদ সম্মেলনে তাই অবধারিতভাবে সাকিবের প্রসঙ্গ উঠেছে, তুলেছেন ভারতের এক সাংবাদিক। উত্তরে মাশরাফি যা বলেছেন, তাতে সাকিবের অবর্ণনীয় কষ্টের সুফল আছে, ‘সাকিব শুধু আমার দলেরই না, আমি মনে করি এই বিশ্বকাপেরই সফলতম ক্রিকেটার। আশা করি বাকি দুটি ম্যাচও ও ভালোভাবে শেষ করবে।’

এই ভালোভাবে শেষ করার বিষয়টি সাকিবের হাতে নেই। অন্তত তিনি সেভাবেই সাজিয়েছেন তাঁর ক্রিকেটীয় মনস্তত্ত্বের জগেক। ‘আমি সব সময়ই চেষ্টা করি দলের জন্য কন্ট্রিবিউট করতে। হবে কি হবে না, সেটা নিয়ে ভাবি না’ বলা সাকিব এটাও মনে করেন যে, সব শেষ আইপিএল মৌসুমে হাড়ভাঙা খাটুনি তাঁকে সাহায্যও করছে দুহাত ভরে, ‘ফিটনেস সব সময়ই সাহায্য করে। ফিটনেস ইস্যুতে আমি এখন অনেক ভালো বোধ করছি। হয়তো এটা আমাকে ভালো খেলতে সাহায্যও করছে।’

এরই মধ্যে ৪৭৬ রান ও ১০ উইকেট নিয়েছেন তিনি। বাকি দুই ম্যাচে কী হবে, তাঁর কিংবা কারোরই জানা নেই। ক্রিকেটের সঙ্গে ভাগ্য এতটাই জড়াজড়ি করে থাকে যে কোনো খেলোয়াড়ই বাজি ধরে মাঠে নামেন না। সে তিনি সাকিব আল হাসান হলেও। শুধু আত্মবিশ্বাসটাই সঙ্গী থাকে সবার। শরীরী ভাষায় সে প্রকাশও আছে সাকিবের। তাঁর হয়ে যা সংক্রমিত কমবেশি পুরো দলেও।

জনমনে একটা বিশ্বাস যে, এবারের আইপিএলে উপেক্ষাই তাতিয়ে দিয়েছে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারকে। তিনি নিজে অবশ্য কখনোই মুখ ফুটে এটা বলেননি, বলার লোকও নন। তবে বড় খেলোয়াড়ের আত্মসম্মানবোধ তো সাকিবের থাকারই কথা। তাই প্রতিপক্ষ যখন ভারত, তখন বাড়তি তাড়না তাঁকেও ছুঁয়ে যাওয়ার কথা। ‘আমার কাছে সব ম্যাচই সমান’, পুনঃপুন এমনটা বলে আসা সাকিবের কাছে তাই ভারত ম্যাচের রোমাঞ্চ সংক্রান্ত প্রশ্ন করার মানে নেই। তবে বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমে ভারত ম্যাচ বাড়তি রোমাঞ্চ ছড়ায় সেই আদিকাল থেকেই। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ মানেই বাড়তি এক্সপোজার।

সাকিবের অবশ্য এবারের বিশ্বকাপে বাড়তি প্রচারণার দরকার নেই, এরই মধ্যে পেয়ে গেছেন যে! তবে সব সঁপে দিয়ে কষ্টের সুফল যদি না পান, তাহলে ধরে নিতে হবে ক্রিকেটের ভাগ্যদেবী বিরূপ ছিলেন আজ।

তেমনটা হলে ‘কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে’—পুরনো এই বিশ্বাসেও যে চোট লাগবে জোর। মনে হবে ওসব ছেলে-ভোলানো গালগল্প মাত্র!

আস/এসআইসু

Facebook Comments