ফুটবলের যত অবিশ্বাস্য ফলাফল

269

আলোকিত সকাল ডেস্ক

৯০ মিনিটের ফুটবলে জয় পরাজয় নির্ধারণ হয় গোল ব্যবধান হিসেব করে। নির্ধারিত সময় শেষে যেই দল গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকে সেই দলই জয় উদযাপন করে। অতীতের ফুটবল আর আধুনিক ফুটবলের মাঝে পার্থক্যটা শুধু কিছু নিয়মকানুনে। শুধু জয় পরাজয়ের হিসেব বহু আগে থেকে পরিচালিত হচ্ছে একই নিয়মে। কিন্তু কখনো কখনো এই জয় পরাজয়ের হিসেবটা অপ্রত্যাশিত কিংবা অবিশ্বাস্য হয়ে উঠে। শক্তিশালী বড় দলগুলোও বড় ব্যবধানে পরাজিত হয় মধ্যম সারির দলগুলোর বিপক্ষে। আবার ছোট দলগুলো চমক দেখিয়ে জায়গা করে নেয় ভক্তদের মনে। খোঁজাখুঁজি করলে জয় পরাজয়ে গোলের এমন অপ্রত্যাশিত পার্থক্যের অনেক নজির পাওয়া যায়। তবে সেসবের মধ্যেও কিছু ম্যাচের ফলাফল ছিলো একেবারেই অবিশ্বাস্য। চলুন জেনে নেয়া যাক এমনই কিছু ম্যাচ সম্পর্কে।

ব্রাজিল ১ : ৭ জার্মানি (২০১৪)

২০১৪ সাল, বেলো হরিজন্তের সবুজ গালিচায় এক বুক আশা নিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে মাঠে নামে স্বাগতিক ব্রাজিল। সর্বশেষ বিশ্বকাপ জেতার পরে এক যুগ ইতোমধ্যেই পার হয়ে গেছে ব্রাজিলের। সেই কারণেই হয়তো জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনাল ম্যাচটি জিতে ফাইনাল নিশ্চিত করা ব্রাজিলের জন্য অত্যাবশ্যক ছিলো। কিন্তু কে জানতো, সেদিনের সন্ধ্যাটি সেলেসাওদের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে কালো অধ্যায় রচনা করবে!

ম্যাচের শুরু থেকে জার্মানদের প্রেসিং ফুটবলে কোনঠাসা হয়ে পড়ে ব্রাজিলিয়ান রক্ষণভাগ। প্রথম ২৯ মিনিটের মধ্যেই ৫ গোল হজম করে বসে স্বাগতিকেরা। এ যেন অবিশ্বাস্য স্কোরবোর্ড! কোনো অসুস্থ মানুষও হয়তো প্রথমে দেখে বিশ্বাস করতেন না এটি। কিন্তু বেলো হরিজন্তের সেই সন্ধ্যায় সত্যিই এমনটি ঘটেছিলো। মুলার, ক্লোসা, ক্রস আর সামি খেদিরার গোলে ৫:০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করে জার্মানি।

দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়ে ১০ মিনিটের ব্যবধানে ব্রাজিলের জালে আরও দুটি গোল যোগ করে ৭:০ তে ব্যবধান বাড়ান আন্দ্রে শুর্লে। ম্যাচের শেষ মিনিটে একটি গোল পরিশোধ করেন ব্রাজিলের অস্কার। কিন্তু অস্কারের সেই গোলে পাওয়ার মতো কিছুই ছিলো না সেলেসাওদের। ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ডেভিড লুইজ, অস্কাররা। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিলের এমন পরাজয় সেদিন কোনো ফুটবল ভক্তই মেনে নিতে পারেননি।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ৮ : ২ আর্সেনাল (২০১১)

গত এক যুগে ওল্ড ট্রাফোর্ড সর্বশেষবার বড় জয় উদযাপন করেছিলো ২০১১ সালে আর্সেনালের বিপক্ষে। আর্সেনালের সমর্থকদের কাছে সেই সন্ধ্যাটির স্মৃতি এখনো কাঁদায়। কারণ আর্সেন ওয়েঙ্গারের অধীনে এর আগে এমন লজ্জাজনক পরাজয়ের সম্মুখীন হয়নি দলটি। তবে সেদিনের পরাজয়ের সুনির্দিষ্ট কারণও রয়েছে, ইনজুরির কারণে দলের কয়েকজন প্রধান তারকা সেই ম্যাচটিতে অনুপস্থিত ছিলেন। যার ফলে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ভাঙ্গাচোরা দল নিয়েই ম্যানইউর বিপক্ষে মাঠে নামে ঘানার্সরা।

দুর্বল আর্সেনালকে সামনে পেয়ে সেই ম্যাচে জ্বলে উঠেন ওয়েন রুনি। একে একে তিনটি গোল করেন তিনি। ম্যানইউর হয়ে সেদিন আরও দুটি গোল করেন ইয়াং। এছাড়াও একটি করে গোল করেন নানি, পার্ক এবং ওয়েলব্যাক। অন্যদিকে, আর্সেনালের হয়ে গোল দুটি করেন ওয়ালকট এবং রবিন ফন ফার্সি। শেষ বাঁশি যখন বাজে তখন ওল্ড ট্রাফোর্ডে ম্যাচের ফলাফল ছিলো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেট ৮:২ আর্সেনাল।

রিয়াল জারাগোজা ৬ : ১ রিয়াল মাদ্রিদ (২০০৬)

২০০৬ সালে রিয়াল মাদ্রিদ স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়। অথচ সেই সময় রিয়ালে ছিলো সময়ের সেরা তারকাদের একাংশ। ওই ম্যাচেও রিয়ালের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন রোনালদো লিমা, বেকহাম, রবার্তো কার্লোসরা। ম্যাচটি ছিলো কোপা দেলরের সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগ। প্রথম ম্যাচে নিজেদের মাঠে ৪:০ গোলের ব্যবধানে জিতে দ্বিতীয় ম্যাচ খেলতে জারাগোজায় পাড়ি জমান গ্যালাক্টিকোসরা।

অ্যাওয়ে ম্যাচে এমন অপ্রত্যাশিতভাবে পরাজিত হবেন তা স্বপ্নও ভাবেনি রিয়ালের তারকারা। ওই দিন জারাগোজার হয়ে একাই ৪টি গোল করেন আর্জেন্টাইনা তারকা দিয়েগো মিলিটো। সেই সাথে জোড়া গোল আসে জারাগোজার এওয়ার্থনের পা থেকে। অন্যদিকে, রিয়ালের হয়ে একমাত্র গোলটি করেন ব্রাজিলিয়ান তারকা জুলিও সিজার বাপতিস্তা। গ্যালাক্টিকোসদের কাছে রিয়ালের ওই পরাজয়টি এখন অবধি প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ অধ্যায়ের সবচেয়ে লজ্জাজনক পরাজয়।

ফুলহাম ৪ : ১ জুভেন্তাস (২০১০)

রয় হজসনের ফুলহামের কথা মনে পড়ে? আপনি যদি ২০১০ এর দশকে নিয়মিত ফুটবল ম্যাচ দেখে থাকেন তবে সেই সময় ইউরোপা লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে ফুলহামের অবিশ্বাস্য জয়ের কথা অবশ্যই শুনে থাকবেন। তুরিনে প্রথম লেগে ১-৩ গোলে পরাজিত হয়ে পশ্চিম লন্ডনে অনুষ্ঠিত সেকেন্ড লেগে জুভেন্তাসকে আতিথ্য দেয় ফুলহাম। বলতে গেলে ম্যাচটি ছিলো ফুলহামের জন্য আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটে গোল করে জুভেন্টাসকে এগিয়েও রাখেন ত্রেজগেউট। কিন্তু এর মিনিট কয়েক পরে ফুলহামের হয়ে প্রথম গোলটি করেন জামোরা। ওই গোলের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন রয় হজসনের শিষ্যরা। এরপর বাকিটা ইতিহাস হয়ে রইলো। পশ্চিম লন্ডন থেকে ফুলহামের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটা মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছাতে থাকলো সারা দুনিয়ায়। গেরার ৩৯ এবং ৪০ মিনিটের গোলে হোম এবং অ্যাওয়ে ম্যাচের হিসেবে সমতায় পৌঁছায় ফুলহাম। অতঃপর দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান ঘটে ম্যাচের ৮২ মিনিটে। দেম্পসির গোলে জয় নিশ্চিত করে ফুলহাম।

বার্সেলোনা ৬ : ১ পিএসজি (২০১৭)

২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রাউন্ড অব সিক্সটিনের দ্বিতীয় লেগে নাটকীয় জয় পায় ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা। এমএসএন ত্রয়ীর দাপুটে পারফরম্যান্সের কল্যাণে সেদিন ক্যাম্প ন্যুতে পিএসজির বিপক্ষে নিজেদের ইতিহাসের সেরা কামব্যাক উপভোগ করেন বার্সেলোনার সমর্থকরা। যদিও প্রথম লেগে প্যারিসে ০:৪ গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয়ে ফিরেছিলেন মেসি, নেইমার, সুয়ারেজরা।

৪ গোলে পিছিয়ে থেকে বার্সেলোনা কামব্যাক করবে তা হয়তো স্বপ্নেও ভাবেনি দলের সমর্থকরা। কিন্তু সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করলেন মেসি, নেইমার ও সার্জিও রবার্তো। ম্যাচের তৃতীয় মিনিটে পিএসজির জালে প্রথম বল জড়ান লুইস সুয়ারেজ। অতঃপর একটি ওউন গোল এবং ৫০ মিনিটে মেসির করা পেনাল্টি গোলে ব্যবধান কমায় বার্সেলোনা। যদিও ৬২ মিনিটে কাভানির গোলে আবারো পিছিয়ে পড়ে স্বাগতিকরা। কিন্তু ৮৮ ও ৯০ মিনিটে নেইমারের গোলে ব্যবধান সমান করে বার্সেলোনা। অতঃপর অতিরিক্ত মিনিটে সার্জিও রবার্তোর গোলে জয় সুনিশ্চিত হয় বার্সেলোনার। প্রথম লেগে ০:৪ গোলে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় লেগে ৬:১ গোলে জয়লাভ করা সেই ম্যাচটি ক্যাম্প ন্যুতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। যদিও সেই ম্যাচে রেফারির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলো পিএসজি। কিন্তু দিনশেষে ফলাফল বার্সেলোনাকেই জয়যুক্ত করেছিলো।

আস/এসআইসু

Facebook Comments