ফের মাঠে এমএলএম প্রতারকচক্র

247

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এমএলএম ব্যবসার নামে প্রতারকচক্র আবারো সক্রিয়। দেশের সহজ-সরল ও বেকার যুবক-যুবতীদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রায় দুই ডজন ‘এমএলএম প্রতারক’ কোম্পানি গা ঢাকা দিয়েছিল।

এসব প্রতারচক্র হুন্ডির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচার করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা সপরিবারে বিদেশেও পাড়ি জমিয়েছে। আর অসহায় মানুষকে নিঃস্ব করে লুটে নেওয়া টাকায় গড়ে তুলেছে নিরাপদ আবাস, অভিজাত জীবন।

এসব এমএলএম প্রতারকদের মধ্যে কয়েজজন গডফাদার গ্রেপ্তার হয়ে জেলখানায় বন্দি রয়েছে। আর প্রতারকচক্রের গডফাদার ডেসটিনির চেয়ারম্যান কারাগারে থেকেই পুনরায় প্রতারণার ব্যবসা চালানোর চক্রান্তে লিপ্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এই চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় ‘লাইফওয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে এমএলএম কোম্পানি মাঠে নেমেছে। র‍্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাঝে মধ্যে গ্রেপ্তারও করছে।

গত বৃহস্পতিবার টঙ্গী এলাকায় অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্রের ৩২ জনকে গ্রেপ্তার ও ৭০ জন ভুক্তভোগীকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এসময় প্রতারণার কাজে ব্যবহূত বিপুল নথিপত্র জব্দ করে র্যাব।

সূত্র জানায়, ১৯৯০ সালের দিকে জিজিএন, ইউনিপেটুইউ, ডেসটিনি-২০০০, যুবক, ইউনিগেটটুইউসহ শতাধিক এমএলএম কোম্পানির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়ও আইসিএল নামক কোম্পানির প্রতারকচক্র ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা বাধা-নিষেধ উপেক্ষা করে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করে। অবশেষে চক্রটি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে গা-ঢাকা দেয়। এরপর গ্রেট ইন্টারন্যাশনাল নামক একটি এমএলএম কোম্পানির কর্মকর্তারা প্রায় ২৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়।

রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশ এলাকায় নয়টি শাখার মাধ্যমে তারা এ প্রতারণা চালায়। গ্রেট ইন্টারন্যাশনালের প্রতারণায় সর্বস্বান্ত মানুষজনের বুক চাপড়ানো আহাজারিও কারো হূদয় ছুঁতে পারেনি।

অল্প দিনে অধিক লাভের লোভ দেখিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চল থেকেই অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ইজেন ও স্পিক এশিয়া মাল্টি লেভেল নামের হায় হায় কোম্পানি। আবার
ইন্টারনেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ৫০টি বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলেই প্রতিদিন দেড় ডলার করে পাবেন।

মাসে ৪৫ ডলার, যা বর্তমানে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় পৌনে ৪ হাজার টাকা। কেবল সাড়ে ৭ হাজার টাকার বিনিময়ে সদস্য হলেই কমপক্ষে ১২ মাস এ ডলার আয়ের সুযোগটি পাওয়া যাবে।

এমন লোভনীয় প্রস্তাব ছড়িয়ে দিয়েই নামসর্বস্ব ইন্টারনেটভিত্তিক এমএলএম কোম্পানি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

বেকার তরুণ, যুবক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গৃহবধূরাও এই প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন। নিত্যনতুন কৌশলে নিরীহ মানুষজনের তিল তিল করে জমানো সঞ্চয় লুটে নেওয়ার দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যাচ্ছেই না।

সূত্র জানায়, বহু স্তরবিশিষ্ট বিপণনব্যবস্থা বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানির বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নতুন নয়। তাদের বিরুদ্ধে মুদ্রাপাচারের অভিযোগও রয়েছে। এ ধরনের ১৫৬টি এমএলএম প্রতিষ্ঠানের তালিকা গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে।

শুধু তাই নয়, বহুল আলোচিত ডেসটিনি-যুবক কাছে প্রতারিত ব্যক্তিরা এখনো তাদের জমাকৃত টাকা ফেরত পায়নি। বছরের পর বছর ধরে ডেসটিনির প্রতারিত গ্রাহকরা আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন। অথচ এক টাকাও ফেরত পাননি।

এইসব হায় হায় কোম্পানির নামে কেনা সম্পত্তিগুলো বেহাত অবস্থায় পড়ে আছে। অন্যান্য সহায়-সম্পদও বেহাল অবস্থয় পড়ে আছে। অনেক সম্পদ রয়েছে জবরদখলকারীদের কবজায়। বিভিন্ন ব্যাংকে ডেসটিনি গ্রুপের ৫৩৩টি হিসাবও জব্দ অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে। এঅবস্থায় লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর মাথায় হাত পড়েছে।

আরেক বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) প্রতারণায় পড়ে অর্থ খুইয়ে যারা তা উদ্ধারের জন্য সরকারের পদক্ষেপের আশায় ছিলেন, তারাও দিন দিন চরম হতাশার মুখে পড়েছেন। যুবকের প্রতারিত ৩ লাখ ৪ হাজার গ্রাহক।

তাদের দাবির পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকা। যুবকের কার্যক্রম বন্ধের দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও গ্রাহকদের অর্থ দেওয়ার কোনো উপায় বের করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

‘স্বল্প সময়ে বেশি সুদ পাবে’— প্রচারণা চালিয়ে যুবক সারা দেশে মানুষের কাছ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পর আত্মসাত করে। এরপর গত ২০০৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যুবকের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

এদিকে প্রতারকচক্র থেমে নেই। বিভিন্ন নামে এমএলএম ব্যবসা চালিয়ে আসছে। টঙ্গী এলাকায় ‘লাইফওয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড’ নামক ভুয়া এমএলএম কোম্পানিতে র্যাব অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এসময় তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহূত বিভিন্ন প্রকার নথিপত্র জব্দ করেছে।

র‍্যাব জানায়, বিভিন্ন এমএলএল কোম্পানি প্রতারণার মাধ্যমে দেশের সাধারণ জনগণের নিকট থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এজন্য সরকার এমএলএম কোম্পানির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।

তারপরও বিভিন্ন এমএলএম কোম্পানি নানা পন্থায় প্রতারণার মাধ্যমে বেকার যুবসমাজকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগের ভিত্তিতে র‍্যাব ১১-র একটি দল গত ৪ জুলাইল টঙ্গীর মধুমিতা রোড হতে ‘লাইফওয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড’ নামক ভুয়া এমএলএম কোম্পানিতে অভিযান চালিয়ে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার ও ৭০ জন ভুক্তভোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাছির হায়দান খান (৫৫), পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন (৪৫), পরিচালক ও শিক্ষক মো. আবু নছর (৫০), মার্কেটিং অফিসার মো. বাবুল হোসেন (৩১), ম্যানেজার মো. লুৎফর রহমান (৪০), মার্কেটিং মো. সেলিম রেজা (৩২), প্রশিক্ষক মো. জালাল আহম্মদ (৪০), অফিস সহকারী মো. শাহীন (২৪), মো. সিরাজ (২৫), ডিস্ট্রিবিউটর মো. সাজ্জাদ (২২), মো. মামুন খন্দকার (৩৪), মো. সাকিল (৩০), মো. নাজমুল হক (২৪), শ্রী পলাশ সরকার (২৪), মো. মাসুদ রানা (২২), মো. তালহা (২৪), মো. ছাইদুর (২২), মো. আ. রহমান (২৪), জেভিয়ার জেংচাম (২৩), মো. সাকিব (২৩), এ্যালবিন (২১), মো. রহিম বাদশা (২১), বাপন (২৫), মো. রুবেল হোসেন (২৭), শিপন রায় (৩২), মো. আমিনুর রহমান (২৫), মো. তাছলিম উদ্দিন (২৯), মো. জাহিদুল ইসলাম (২২), মো. শওকত হোসেন (২১), মো. আরাফাত (২০), মো. আনোয়ার হোসেন (২৪) এবং মো. নাজমুল হক (২৬)।

গ্রেপ্তারকৃতরা ‘লাইফওয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড’ নামক ভুয়া এমএলএম কোম্পানি মাসিক ১৬ হাজার ও তদূর্ধ্ব টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতিসহ লোভনীয় অফার দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়। এরপর বেকার যুবক-যুবতীদের ফাঁদে ফেলে।

কোম্পানির আর্থিক লাভ ও পণ্য বিক্রির কমিশনের আশ্বাসে বাধ্যতামূলক জামানত হিসাবে জন-প্রতি ৫৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। তারা নতুন সদস্য নিয়োগ দিতে পারলে তাকে কমিশন হিসেবে বেতন দেয়া হয়।

আর তা না দিতে পারলে খালি স্ট্যাম্পে আপসনামায় জোরপূর্বক স্বাক্ষর রেখে বের করে দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করলে ভাড়াটিয়া লোকজন দ্বারা আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতনও করে। র্যাব তাদের দখল থেকে ৭০ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেছে।

আর সুসজ্জিত অফিস থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহূত ৪০টি মোবাইল, ১টি কম্পিউটারের মনিটর, ১টি সিপিইউ, ১টি প্রিন্টার এবং বিপুল ভুয়া ডকুমেন্ট (ভর্তি ফরম, নিয়ম ও শর্তাবলি ফরম, পণ্য ক্রয়ের ভাউচার, আপসনামা, অঙ্গীকারনামা, সাপ্তাহিক হিসাব রেজিস্টার, স্পনসর নোট রেজিস্টার, টাকা জমার রশিদ, স্ট্যাম্প, হাজিরা বই ও পণ্য সরবরাহের চুক্তিপত্র) উদ্ধার করা হয়। র্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইংয়ের পক্ষ থেকে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments