ফেসবুক-ইউটিউবে নিয়ন্ত্রণ: কী চাইছে সরকার, কতটুকু পারবে?

275

আলোকি সকাল ডেস্ক

ডাক ও যোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, গুজব রোধে আগামী সেপ্টেম্বর থেকেই ফেসবুক ও ইউটিউব নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জন করবে সরকার।

মন্ত্রী বলেন, আমরা আশা করছি, দ্রুতই ফেসবুক-ইউটিউব নিয়ন্ত্রণ বা এ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা অর্জন করব। আগামী সেপ্টেম্বরের পর এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা যাবে। তখন ফেসবুক-ইউটিউবে ইচ্ছামতো কিছু প্রচার করা যাবে না।

তিনি বলেন, এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হচ্ছে, যেকোনো ওয়েবসাইটকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এটা বড় অর্জন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন স্ট্যাটাস দেওয়া হয় বা ভিডিও প্রচার করা হয়, সেগুলোর ব্যাপারে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।

কিন্তু কীভাবে কাজ করা হবে, এ নিয়ে ডাক ও যোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ও প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির সঙ্গে কথা বলেছে লন্ডন ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা।

ডাক ও যোগাযোগ মন্ত্রী বলেন, ‘ফেসবুকের সঙ্গে আমার দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হয়েছে। ফেসবুক সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের আইন মেনে চলার অঙ্গীকার করেছে।’

কিন্তু ফেসবুকে বা ইউটিউবে কেউ কিছু পোস্ট করলে কি বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ সেটা ব্লক করতে পারবে? ফেসবুক কি সরকারকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে? এই প্রশ্নে মন্ত্রী বলছেন, ‘ফেসবুক যদি বাংলাদেশে তার প্রচলন রাখে, তাহলে ফেসবুক বাংলাদেশের আইনকানুন মেনে চলবে না, সেটা কেমন করে হবে? আমার দেশে কি হবে, আমার দেশে কি হবে না, আমার দেশের মানুষ কি দেখবে বা দেখবে না, সেই সিদ্ধান্ত কি আমি নেব না?’

এতদিন পর্যন্ত যা ছিল তা হলো এই: ফেসবুকে কোন কিছু আপত্তিকর বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী মনে করলে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি তা ফেসবুককে জানায়, এবং তার পর ফেসবুক পদক্ষেপ নেয়। বাংলাদেশের সরকার এখন তার চেয়ে বেশি কোন ক্ষমতার কথা বলছে?

মোস্তাফা জব্বার বলছেন,‘এখন পর্যন্ত পর্ন বা অন্য ক্ষতিকর ওয়েবসাইট বন্ধ করতে পারে সরকার। তবে ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমে কোন ক্ষতিকর উপাদান বন্ধ করতে হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করতে হয়। অনেক সময় তারা ব্যবস্থা নিলেও তাতে সময় বেশি লাগে। আবার অনেক সময় তারা কোন ব্যবস্থা নেয় না।’

তিনি জানান, ‘এই সমস্যা সমাধানে সরকার এসব কনটেন্ট রোধ করার সক্ষমতা অর্জন করার ব্যবস্থা নিয়েছে।’

কিভাবে এটা করা হবে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমেই সেটা করা হবে।

‘ফেসবুক নিশ্চয়ই বাংলাদেশের আইন মেনে চলবে। সেই সঙ্গে আমাদের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলো দৃশ্যমান না থাকতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা হবে। সেটাই প্রযুক্তির মাধ্যমে করা হবে।’

‘সেই প্রযুক্তি এলে এসব কনটেন্ট যাতে দেশে দেখা না যায়, সেই ব্যবস্থা করা যাবে। সম্পূর্ণ ফেসবুক বন্ধ না করে সেখানকার খারাপ কনটেন্ট অপসারণ করা হবে। আমরা যেটাই চাইবো, সেটাই করা যাবে।’

বাংলাদেশের সরকার কেন এই উদ্যোগ নিচ্ছে, এ প্রশ্নে মন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি মনে করেন, বাংলাদেশের কেউ পর্ন দেখবে আর সরকার সেটা মেনে নেবে? বাংলাদেশে কেউ জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটাবে, আর সরকার সেটা হতে দেবে?’

‘আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো, যাতে জনগণ নিরাপদে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। প্রযুক্তিতে অসম্ভব বলে কিছু নেই।’

কিন্তু পর্ন বা জঙ্গি কর্মকাণ্ডের বাইরে সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রতিরোধেও এই ব্যবস্থা কাজে লাগানো হতে পারে, এরকম একটি আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।

জব্বার বলছেন, ‘তেমন কোন ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেনি। বাংলাদেশ সরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বাকস্বাধীনতা রক্ষা করে থাকে। সেই অধিকার কারো ক্ষুণ্ণ করা হয়নি।’

কিন্তু ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করার জন্য মামলা হয়েছে, বলে জানালে তিনি বলেন, ‘সেটার জন্য আদালত আছে, আইন আছে। সেটার সাথে এই ব্যবস্থার কোন সম্পর্ক নেই।’ এ নিয়ে আশংকার কোন কারণ নেই বলে তিনি জানান।

এভাবে নিয়ন্ত্রণ কতটা সম্ভব?

প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির বলছেন, এভাবে নিয়ন্ত্রণ করাটা অসম্ভব না, আবার খুব সহজও না।

তিনি জানান, বেশ কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেকটা থার্ড পার্টির মতো ফেসবুক বা ইউটিউবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙ্গে নিয়ন্ত্রণ নেয়া হয়ে থাকে। তখন এসব থার্ড পার্টি কনটেন্ট দেখতে পারে, নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘কিন্তু সমস্যা হলো, কোন ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো কোন সংস্থাই চায় না, তাদের নিজেদের বা গ্রাহকদের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হোক। আর শুধু সরকারই নয়, অনেক সময় বিজনেস কোম্পানিগুলোও মার্কেটিং এর জন্য গ্রাহকদের তথ্য চুরি করে। ফলে তারা কয়েকমাস পরপরই এসব সিকিউরিটি আপগ্রেড করে।’

‘তখন যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রবেশ করতো, তারা আর ঢুকতে পারে না। তখন তাদের আবারো অনেক খরচ করে নতুন প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে হয়। বাংলাদেশ সরকারকেও দেখা যাবে, এখন তারা সফল হলেও কয়েকমাস পরে আর তারা ফেসবুকে ঢুকতে পারছে না। তখন তাদের নতুন করে প্রযুক্তি সংগ্রহ করতে হবে।’

তিনি জানান, বিশ্বের অনেক দেশের সরকারই এভাবে চেষ্টা করেছে। অনেকে চেষ্টা করে একসময় হাল ছেড়ে দিয়েছে।

কারণ পুরো ব্যাপারটি অনেক ব্যয়বহুল বলে তিনি জানান। এ জন্য কয়েকশো কোটি টাকা বিনিয়োগ শুরু হয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments