ফেসবুক বন্ধু আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?

271

-মোট কয়জন ফ্রেন্ড আছে আপনার?

– হাজার খানেক হবে! আপনার?

– এতো বেশি না, মাত্র বিশ-পঁচিশজনের মতো।

-আহা, আমি তো ফেসবুক ফ্রেন্ডের কথা বলছিলাম। এমনিতে তো দুই-তিনজন বন্ধু পাওয়াও কঠিন!

কথোপকথনটি কাল্পনিক, তবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের অনেকেরই ফেসবুকে বন্ধুর সংখ্যা হাজারের উপর। কারো কারো আবার ছাড়িয়ে গেছে পাঁচ হাজারের লিমিট। অনেককে আবার এই কথাও বলতে শোনা যায় যে, ‘বন্ধুসংখ্যা পাঁচ হাজার হয়ে যাওয়ায় নতুন রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করতে পারছি না!’ ফেসবুকে যেমন ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে বহুদিন পর খুঁজে পেয়েছি তেমনি কোনোদিন দেখা হয়নি অথচ চলনে-বলনে, চিন্তা-ভাবনায় পুরো আমার কার্বনকপি এমন বন্ধুও পেয়েছি বেশকিছু। আবার অচেনা মানুষ যেচে এসে কথা বলতে আসায় বিব্রতও হয়েছি বহুবার। এসব ভাবতে ভাবতেই ফেসবুক ফ্রেন্ডরা জীবনে আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ তা নিয়ে লিখে ফেললাম আজকের ব্লগ। আসলে বেশকিছু ব্যাপারে একটু চোখকান খোলা রাখলেই অভিশাপ নয়, জীবনে আশীর্বাদটাই মুখ্য হয়ে ওঠে এবং সেটাই হল আজকের বিষয়বস্তু :

ফেইক আইডি হতে সতর্ক হোন
‘নীল অপরাজিতা’, ‘স্বপ্নিল বালক’, ‘বর্ষার কদম’, ‘শীতের শিউলি’ এইসব উদ্ভট নামের অজস্র আইডিতে ফেসবুক সয়লাব। অসংখ্য ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টের মধ্যে কোনটা আসল, কোনটা নকল সবসময় ঠাহর করা যায় না। তবে সরাসরি পরিচিত কেউ না হলে এই ধরনের আজগুবি নামের আইডি এড়িয়ে চলা উচিত। অনেকেরই র‍্যানডম ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর অভ্যাস আছে। অনেকে আবার তা এক্সেপ্টও করে ফেলেন। তবে আমার পরামর্শ চাইলে বলবো, পরিচিত লোকের বাইরে কাউকে ফেসবুকে অ্যাড করা থেকে বিরত থাকুন। আর যদি নিতান্তই অ্যাড করতে হয় তবে Profile Picture, Bio, Mutual Friend- এসব দেখে নিশ্চিত হয়ে নিন। প্রোফাইল পিকচারে নায়ক-নায়িকা, মডেল, ফুল, বিড়াল কিংবা পুতুলের ছবি দেয়া আইডি হলে তা এড়িয়ে যাওয়াটাই ভালো হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের ফেইক আইডিগুলো সমস্যা সৃষ্টি করে। নানা ধরনের হুমকি দেয়া, রাত বিরাতে বিব্রতকর প্রশ্ন করা এসব হরহামেশাই ঘটছে, তাই সতর্ক থাকুন।

ব্যক্তিগত তথ্য দেয়া থেকে সতর্ক হোন
ফেসবুকসহ যেকোনো সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য দেয়া থেকে একশ হাত দূরে থাকা উচিত। যেখানে খুব ভাল বন্ধু, এমনকি পরিবারের লোকও কখনো কখনো শত্রু হয়ে ওঠে – সেখানে এ তো ফেসবুক ফ্রেন্ড! যদি আপনি নিয়মিত কারো সঙ্গে চ্যাটিং করেন, সেক্ষেত্রে অনেক সময়ই নিজের অজান্তেই অনেক স্পর্শকাতর তথ্য দিয়ে ফেলেন। বাসার ঠিকানা, ফোন নাম্বার, ফোনের পাসওয়ার্ড কিংবা বিকাশ নাম্বার। এগুলো সবই আপনার এবং একান্তই আপনার ব্যক্তিগত তথ্য। কোনো পরিস্থিতিতেই এসব তথ্য কোনো ভার্চুয়াল বন্ধুর সাথে শেয়ার করবেন না। ফেসবুকে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য কখনোই Public রাখবেন না। আপনার লোকেশন ফেসবুকে দিবেন না। ফ্রেন্ডলিস্টের কেউ সন্দেহজনক কোনো লিংক সেন্ড করলেও সেখানে ক্লিক করবেন না।

‘আমি কি তোমার বন্ধু না?’ কিংবা ‘তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?’ -এ ধরনের কথায় আবেগপ্রবণ হয়ে অনেকেই ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় নিজের অনেক ব্যক্তিগত তথ্য, ভিডিও বা ছবি শেয়ার করে ফেলেন। ফলাফল? রোজই পত্রিকায় অভিনব উপায়ে প্রতারণার নানা কাহিনী তো শুনছেনই!

হ্যাংআউটের ক্ষেত্রে সতর্ক হোন
আজকাল একটা ব্যাপার খুব দেখা যায়। বিশেষ করে বড় বড় শহরগুলোতে ‘Cool Dude’ সাজার চেষ্টায় মানুষ অপরিচিত, অর্ধ-পরিচিত মানুষের সাথে ঘুরতে বেড়িয়ে পড়ে। ফেসবুকের কল্যাণে মানুষ যাকে বলে ‘হ্যাংআউট’। মুঠোফোনে পরিচয়ের সূত্র ধরে অথবা ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্রে হ্যাংআউট করতে হলে অবশ্যই সাথে আপনার পরিচিত কাউকে রাখুন। সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দেবী’ সিনেমায় নীলুর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটিও ঠিক এই রকম। নীলু আর রানু দেখা করতে গিয়েছিল নীলুর এক ভার্চুয়াল বন্ধুর সাথে। রানু সাথে থাকায় বন্ধুটি সামনে আসেনি। কিন্তু একদিন একা দেখা করতে গিয়ে ঠিকই মানসিকভাবে অসুস্থ সেই বন্ধুর কবলে পড়তে হয় নীলুকে। এটা একটা উদাহরণ মাত্র। আমি বলছি না যে সব ভার্চুয়াল বন্ধুই খারাপ। ভালো না খারাপ সেটা বিবেচনা করে তবেই বিশ্বাস করা উচিত।

পাশের বন্ধুকে অবহেলা আর নয়
মেসেঞ্জারে সারাদিন টুং-টাং শব্দে আসা ম্যাসেজ, অজস্র নোটিফিকেশন, হাজারো লাইক, কমেন্ট, শেয়ারের মেলায় পাশে বসে থাকা বন্ধুটিকে আমরা বেমালুম ভুলে যাই। এটা ঠিক যে আমাদের অনেক একলা সময়ে ভার্চুয়াল বন্ধুরা টনিকের মতো কাজ করে, তবে স্কুল-কলেজ কিংবা পাড়ার বন্ধুর থেকে ফেসবুক ফ্রেন্ডকে বেশি গুরুত্ব দেয়াটা শুধু বোকামি নয় রীতিমত অন্যায়। সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে এই মানুষগুলোই আপনার পাশে দাঁড়াবে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে বসার আগে ডাটা-কানেকশন অফ করে নিন। সামনে কাউকে বসিয়ে রেখে মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়া একদমই ঠিক নয়। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, হাজার হাজার মাইল দূরের মানুষকে করেছে কাছের বন্ধু। কিন্তু এর চক্করে আমাদের পাশের বন্ধুগুলো হয়ে গেছে দূরের মানুষ। এমনটা কখন হয়েছে, তা যেন আমরা নিজেরাও জানি না!

বন্ধুত্বকে আগে বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিচার-বিশ্লেষণ
ফেসবুকে তুমুল আলোচিত মার্কিন তরুণী সারাহ কুন মাইকেল তার ফেসবুক ফ্রেন্ডকে ভালোবেসে বিয়ে করার জন্য হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ছুটে এসেছিলেন বাংলাদেশে। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে বরিশালের কাউনিয়ার দূরত্ব উপেক্ষা করে তিনি বেছে নিয়েছিলেন তার ভালোবাসার মানুষটিকে। এ ধরনের ঘটনা আজকাল প্রায়ই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। প্রবাস থেকে না হোক, দেশের ভিতরে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় এমন প্রেম কিংবা বিয়ের ঘটনা আমাদের আশেপাশেই প্রায়ই হচ্ছে। দীর্ঘদিন কথা বলতে বলতে কারোর প্রতি কোনো বিশেষ অনুভূতি জন্মানো খুবই স্বাভাবিক। তবে এই অনুভূতিকে চিরস্থায়ী রূপ দেয়ার জন্য আবেগের পাশাপাশি যুক্তি দিয়ে ভাবুন। তার পরিবার, পারিপার্শ্বিকতা, শিক্ষা, রুচি সবকিছু সম্পর্কে জানার পরই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। ক্ষণিকের ভালোলাগা যেন পরবর্তীতে আপনার আফসোসের কারণ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন।

সাইবার আইনের সুবিধা নিন
বর্তমানে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা যেন দিন দিন বেড়েই চলছে। এর মধ্যে ৭০ ভাগ ব্যবহারকারী সাইবার অপরাধের ঝুঁকিতে রয়েছেন। ব্যবহারকারীদের মধ্যে ২০ ভাগ কোনো না কোনোভাবে সাইবার অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং মাত্র ১০ ভাগ ব্যবহারকারী সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন। এতো সিকিউরিটি, এতো সতর্কতা অবলম্বন করার পরও আমাদের ভুল হয়েই যায়। ভুলে কাউকে হয়তো বিশ্বাস করে ফেলি, কোনো ফেইক আইডিকে আপন ভেবে মনের জানালা খুলে দিই কিংবা নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই কোনো সাইকোপ্যাথের বিকৃত মানসিকতার সম্মুখীন হই। সেক্ষেত্রে হতবুদ্ধি না হয়ে সবকিছুর প্রমাণসহ পুলিশের সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটের সাহায্য নিতে পারেন। প্রয়োজনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে রাখতে পারেন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনেও (বিটিআরসি) লিখিতভাবে জানিয়ে রাখতে পারেন। কারণ জিডি বা মামলা না করে কোনো প্রকার আইনি সহায়তা পাওয়া যাবে না।

অনলাইনে যেকোনো ধরনের হুমকি বা বিপদের মুখোমুখি হলে দেরি না করে সাইবার আইনের সাহায্য নেয়া উচিত। আমাদের দেশে বিশেষ করে মেয়েরা ফেসবুকে নানা ধরনের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে থাকে। যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ এমন পরিস্থিতিতে পড়েন, তাহলে একমাত্র সাইবার আইনই আপনাকে এ থেকে মুক্ত করতে পারে। মনে রাখবেন, যে ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘৃণ্য কাজ করতে পারে তার চাহিদার কোনো শেষ নেই। দু’দিন পরপরই সে আপনাকে নতুন নতুন কায়দায় ব্ল্যাকমেইল করতে থাকবে। তাই প্রশ্রয় না দিয়ে প্রথম থেকেই সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে আইনের সাহায্য নেয়াটাই সমীচীন।
নাই টেলিফোন, নাইরে পিয়ন, নাইরে টেলিগ্রাম

বন্ধুর কাছে মনের খবর ক্যামনে পৌঁছাইতাম?

আশ্চর্যজনকভাবে আজকাল টেলিফোন, টেলিগ্রাম অথবা ডাক বিভাগের সাহায্য ছাড়াই আমরা আমাদের মনের কথা পুরো পৃথিবীকে জানিয়ে দিতে পারছি। বন্ধুর কাছে মনের খবর তো যাচ্ছেই, নতুন নতুন বন্ধুও গড়ে উঠছে ফেসবুকের এই নীল সাদার দুনিয়ায়। এ বন্ধুত্বে যেন কোনো পিছুটান নেই, কোনো দায়িত্ব নেই। কেবলমাত্র ভালো সময় কাটাবার জন্য গড়ে ওঠা এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সবার জন্যই আশীর্বাদ হয়ে আসবে। দরকার শুধু নিজের প্রাইভেসী রক্ষা করার বিষয়গুলো সম্পর্কে একটু সচেতন হওয়া। আর এভাবেই ফেসবুক হয়ে উঠবে আপনার জন্য আশীর্বাদ!

হ্যাপী ফেসবুকিং!

আস/এসআইসু

Facebook Comments