বকেয়া পাওনা বনাম পুঁজির সংকট

17

৭১ কণ্ঠ ডেস্ক

অনেকটা খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা মূল্যবান কাঁচা চামড়া বেচাকেনা নিয়ে দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের মধ্যে। গতকাল শনিবার থেকে চামড়া কিনতে ট্যানারি মালিকদের নির্দেশ দিয়েছিল সরকার। ট্যানারি মালিকরা প্রস্তুতিও নিয়েছিল চামড়া কেনার জন্য, কিন্তু হঠাৎ বিগড়ে গেছে আড়তদাররা। তাদের দাবি, ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া ৪০০ কোটি টাকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত চামড়া বিক্রি করবে না। অন্যদিকে ট্যানারি মালিকরা বলছে, তাদের পুঁজির সংকট রয়েছে। বিসিক জমির মালিকানা না দেওয়ায় ব্যাংক থেকে আশানুরূপ টাকা পাওয়া যায়নি। এমন বাস্তবতায় চামড়া নিয়ে সংকট আরো ঘনীভূত হলো। চামড়া কেনাবেচা নিয়ে বিদ্যমান জটিলতা নিরসনে আজ রবিবার জরুরি বৈঠক ডেকেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চামড়া রপ্তানির যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেটি কিভাবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়েও সিদ্ধান্ত হবে আজকের বৈঠকে।

প্রতিবছরই ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদে চামড়ার দাম নিয়ে অরাজকতা তৈরি হয়। তবে এবারের ঈদে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চামড়ার দাম তলানিতে ঠেকেছে। এক লাখ টাকার একটি গরুর চামড়া ২০০ টাকায়ও বিক্রি হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও সিন্ডিকেটের কারণে চামড়ার বাজার ধস নেমেছে। চামড়াশিল্পের পরিস্থিতির দায় নিতে রাজি নয় সরকারি কোনো সংস্থাই। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে করণীয় নিয়েও কোনো আলোচনা দেখা যায় না শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে। বছরের পর বছর এভাবে কাঁচা চামড়ার দাম নিয়ে নৈরাজ্য চললেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয় কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবছরই একই ঘটনা ঘটছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। সোয়া কোটি পশুর চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করার কোনো পরিকল্পনা এখনো নেওয়া হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে চামড়া রাখার মতো কোনো স্থান ঠিক করা হয়নি। সারা দেশে বিসিকের প্লট থাকলেও সেখানেও চামড়া রাখার কোনো ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। যতটুকু হয়েছে ব্যক্তি খাতের হাত ধরে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবছরই কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারকে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুধু চামড়ার দাম বেঁধে দিয়ে দায় এড়াতে পারে না। অবশ্যই নির্ধারিত দামে কিনছে কি না তা নজরদারি করতে হবে। অন্যদিকে চামড়া খাতের প্রধান কাঁচামাল সংগৃহীত হয় কোরবানির ঈদে। তাই চামড়াশিল্পে সঠিকভাবে কাঁচা চামড়া সংগৃহীত হচ্ছে কি না তা অবশ্যই শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে নজরদারি করতে হবে। চামড়া খাতের স্থিতিশীল অবস্থা বজায় না থাকলে তার দায় উভয় মন্ত্রণালয়ের।’

বাণিজ্যসচিব মফিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কোরবানির পশুর চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। পরে জানতে পারি, সঠিক দামে বিক্রি হচ্ছে না। চামড়া সংগ্রহকারীদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে রপ্তানির আদেশ দিয়েছি। ট্যানারির মালিকরা সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে চামড়া কিনলে রপ্তানির আদেশ বাতিল করা হতে পারে।’ বাণিজ্যসচিব আরো বলেন, ‘চামড়ার দর, আমদানি-রপ্তানির বিষয় দেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু চামড়াশিল্প দেখাশোনার দায়িত্ব আমাদের নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করতে আগামীকাল (আজ রবিবার) ট্যানারির মালিক, আড়তদারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে।’

ঈদের দিন চামড়ার দাম নিয়ে যখন নৈরাজ্য চলছিল, তড়িঘড়ি করে তখন চামড়া রপ্তানির ঘোষণা দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে শনিবার থেকে সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে চামড়া কিনতে ট্যানারি মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু হঠাৎ গতকাল রাজধানীর পোস্তায় বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা পেলে তবে তারা চামড়া বিক্রি করবে। তার আগে নয়। ট্যানারির মালিকরা বেশ কয়েক বছর ধরে আড়তদারদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ না করায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে জানান সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান। এ ছাড়া সংগঠনের নেতারা সরকারের চামড়া রপ্তানি করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। গতকাল রাজধানীর পোস্তার আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ট্যানারির মালিকদের কাছে পোস্তার আড়তদারদের ৪০০ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে। কিন্তু তাদের বকেয়া পরিশোধ না করে সস্তা দামে চামড়া কিনতে এবার কৌশল করে চামড়ার বাজারে ধস নামিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ, মসজিদ ও মাদরাসা চামড়ার ন্যায্য দাম পায়নি। অনেকে চামড়া রাজধানীর পোস্তায় ড্রেনে ফেলে দিয়েছে। হাজি টিপু সুলতান জানান, শুধু পোস্তায় নয়, চট্টগ্রাম ও সিলেটে চামড়ার আড়তদারদের প্রায় ১২৫ কোটি টাকার বেশি টাকা পরিশোধ করেনি ট্যানারি মালিকরা। তিনি জানান, এবারের চামড়ার বাজারে কূটকৌশলের কারণে চামড়া সংগ্রহের মোট লক্ষ্যমাত্রার ২৫ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে যাবে। এর ফলে প্রায় সাড়ে তিন শ কোটি টাকার কাঁচা চামড়া নষ্ট হবে বলে তিনি মনে করেন। তাই আজ রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হবে ট্যানারির মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করা যায় কি না।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পোস্তার আড়তদারদের আলটিমেটাম হলো নগদ টাকা না হলে তারা চামড়া বিক্রি করবে না। এমন আলটিমেটামের কারণে রাজধানী থেকে কোনো চামড়া সংগ্রহ করা হয়নি। তবে ময়মনসিংহ ও যশোর থেকে চমড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। এখন আড়তদাররা যদি আমাদের কাছে চামড়া বিক্রি না করে, তাহলে আমাদের কী আর করার আছে।’

দেশের দ্বিতীয় রপ্তানি আয়ের খাত চামড়াশিল্পের ধস ঠেকাতে শিগগিরই রপ্তানি প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত বলে মনে করেন পোস্তার আড়তদার মতিউর রহমান। তিনি বলেন, এভাবে দেশের চামড়া নষ্ট করে ফেলার চেয়ে রপ্তানি হলেও ভালো। এতে করে চামড়ার বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। এতিমদের হক মেরে কেউ খেতে পারবে না। ধর্মীয় রীতি অনুসারে সামাজিক সুরক্ষায় বড় অবদান রাখে কোরবানির চামড়া। এবার কোরবানির চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়ায় স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ ছাড়া বঞ্চিত হয় দেশের কম ভাগ্যবান মানুষগুলো।

মতিউর রহমান বলেন, ৪০ বছর ধরে তিনি এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। চামড়ার এমন ধস কখনো দেখেননি। তাই এই শিল্পকে রক্ষায় শিগগিরই সরকারের নীতিমালায় পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। মতিউর রহমান বলেন, ট্যানারি মালিকদের ভয়ংকর এই ছোবল থেকে দেশের চামড়াশিল্পকে রক্ষায় লোকাল এলসি নীতিমালা করা যেতে পারে। তাদের প্রণোদনা না দিয়ে স্থানীয় পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তিন-চার কেজি করে লবণ সরবরাহ করে স্থানীয়ভাবেই দু-এক দিন চামড়া সংরক্ষণ করা যেতে পারে। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশে চামড়া সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে পারে সরকার।

চামড়া পাচারের আশঙ্কা করে মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল হোসেন বলেন, পাটশিল্পের পর এবার দেশের চামড়াশিল্পের ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রতিবছর কাঁচা চামড়া নিয়ে অপকৌশল হলেও সরকারের নীতিনির্ধারকদের টনক নড়ে না। এই সুযোগে ব্যাংকের টাকা লুট করে দামি গাড়ি আর বাড়ি করে। তিনি বলেন, এক লাখ টাকা মূল্যে একটি পশুর চামড়ার আয়তন ২৫ থেকে ২৮ বর্গফুট। সরকারের নির্ধারিত দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা হলেও কম করে হলেও এর দাম পড়ে এক হাজার ৪০০ টাকা। কিন্তু এবার সর্বোচ্চ বিক্রি হয়েছে চার থেকে পাঁচ শ টাকায়। অন্যদিকে ভারতের বাজারে প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়ার দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা চামড়া রাজধানীতে না এসে সীমান্ত দিয়ে পাচার হবে বলে তাঁর আশঙ্কা।

কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে ভবিষ্যতে হিমাগার স্থাপনে সরকারি পরিকল্পনার কথা জানিয়ে শিল্পসচিব আবদুল হালিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চামড়া সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা বাড়ানো হবে। পশু জবাই, পশুর চামড়া সংরক্ষণে প্রশিক্ষণ দেওয়া বাড়াতে সরকারি উদ্যোগ বাড়ানো হচ্ছে। কোরবানির পশুর চামড়ার দর নির্ধারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কোরবানির পশুর চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণে পর্যাপ্ত লবণ প্রয়োজন হয়। এবারের কোরবানির ঈদের আগেই লবণের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করি।’ তিনি বলেন, ‘আগামীকাল (আজ রবিবার) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জরুরি বৈঠক ডেকেছে। আমরা যাব। আমাদের কথা আমরা বলব।’

একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, আজ রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। এ বৈঠকে আড়তদারদের সঙ্গে ট্যানারির মালিকদের দূরত্ব কমাতে বিভিন্ন আলোচনা হবে। চামড়ার বাজারের অস্থিরতা দূর করতে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

ট্যানারি মালিকদের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা ও দাম কমার কথা বলা হলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments