বরগুনায় ভীতির রাজত্ব কায়েম করেছিল নয়ন বন্ড

489

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনায় দিনে দুপুরে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ নয়ন। সহযোগী সন্ত্রাসীদের নিয়ে গঠন করা একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম ‘০০৭ বন্ড গ্রুপ’। এই গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড রিফাত ফরাজী আর লিডার হচ্ছে সাব্বির আহম্মেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড।

জেমস বন্ডের আদলে গড়া এই সন্ত্রাসী গ্রুপের শেষ শব্দ বন্ডের সঙ্গে মিলিয়েই নিজের নামের পেছনে বন্ড লাগিয়েছে নয়ন। এই গ্রুপের একটি ফেসবুক গ্রুপও আছে। সন্ত্রাস, মাদক চোরাকারবার, ছিনতাই, হত্যা, কুপিয়ে আহত করার মতো বহু ঘটনা ঘটিয়েছে নয়ন। বরগুনায় সে এক ভীতির রাজত্ব কায়েম করেছিল।

নয়ন বন্ডের বাড়ি বরগুনা সরকারি কলেজের পিছনে। কলেজকে কেন্দ্র করে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলো সে। নিরীহ পথচারী, কিংবা সাধারণ মানুষ তার এলাকা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতেন। কলেজের অনেকে জানিয়েছেন যে, নয়ন সরকারি বরগুনা কলেজের ছাত্র নয়। কিন্তু, সে ছাত্র না হলেও কীভাবে কলেজ ও এর আশপাশে এ ধরনের বাহিনী গড়ে তুলছিল তার কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এই বাহিনীর অন্যতম অপারেশনাল সদস্য- রিফাত ফরাজী ঘটনার আগের রাতে মেসেঞ্জারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সকাল ৯টায় কলেজ গেটে আসার নির্দেশ দিয়েছিল। যে অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে আসতে হবে তার ছবিসহ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

নয়নের ‘বন্ড বাহিনী’ ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে মিলিত হয়ে অস্ত্র হাতে অতর্কিত হামলা করতো। বলা হচ্ছে- পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী এই বাহিনী রিফাত শরীফের হত্যার ঘটনা ঘটায়।

বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন জানিয়েছেন, নয়ন বন্ডের বিরুদ্ধে পুলিশ আগেও অভিযান চালিয়েছিল। সর্বশেষ ২০১৭ সালে তাকে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশ তাকে বার বার গ্রেপ্তার করলেও কিছুদিন পরেই সে বের হয়ে এসেছে।

বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, সব আসামি অবশ্যই ধরা পড়বে। আসামিদের ধরতে সব বর্ডার ও গেটেওয়েতে ইতোমধ্যে এলার্ট জারি করা হয়েছে। বাসে, লঞ্চে সর্বত্র নজরদারি ও তল্লাশি চলছে। অচিরেই তারা পুলিশের জালে ধরা পড়বে।

নয়ন বন্ডকে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ ২০১৭ সালে সর্বশেষ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশের খাতায় মাদক চোরাকারবারি হিসেবে তার নাম থাকলেও গত ২ বছরে থেকে সে তার নিজের বাড়িতেই মাদকের আখড়া চালিয়ে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে- উঠতি বয়সী ও বখাটেরা নিয়মিত তার বাড়িতে যেতো মাদক সেবনের জন্য।

তবে মামলা প্রধান আসামি নয়ন বন্ড মঙ্গলবার (২ জুলাই) ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হলেও প্রধান অপর দুই আসামি রিফাত ফরাজী ও তার ছোট ভাই রিশান ফরাজী এখনো পলাতক।

উল্লেখ, গত বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের মূল ফটকের সামনের রাস্তায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম করা হয় রিফাত শরীফ নামের এক তরুণকে। এ সময় বরগুনা সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রী আয়েশা সিদ্দিকা তার স্বামীকে রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালান। কিন্তু সন্ত্রাসীরা তাকে (রিফাত) উপর্যুপরি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায়। বিকেল তিনটার দিকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রিফাতের মৃত্যু হয়। জনবহুল এলাকায় এমন নৃশংস হামলার ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভের ঝড় ওঠে।

পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে নিহত রিফাতের বাবা বরগুনা সদরের বড় লবণগোলার বাসিন্দা আবদুল হালিম শরীফ বাদী হয়ে বরগুনা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় বরগুনা শহরে চিহ্নিত সন্ত্রাসী সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড এবং তার সহযোগী রিফাত ফরাজী ও তার ছোট ভাই রিশান ফরাজীসহ ১২ জনকে আসামি এবং আরও চার থেকে পাঁচজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।

এ মামলায় সোমবার পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে চন্দন (২১), মো. হাসান (১৯), অলিউল্লাহ (২২) টিকটক হৃদয় (২১) এজাহারভুক্ত আসামি। ঘটনার পরের দিন সকালে চন্দনকে, সন্ধ্যার মো. হাসান গ্রেপ্তার করা হয়। রোববার বরগুনা থেকে অলিউল্লাকে (২২) এবং ঢাকা থেকে টিকটক হৃদয়কে (২১) গ্রেপ্তার করা হয়। অন্য পাঁচজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা হলেন নাজমুল ইসলাম (১৮), সাগর (১৯), তানভীর (২২), কামরুল হাসান ওরফে সাইমুন (২১)। অপর একজনের নাম পুলিশ প্রকাশ করেনি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments