বর্ষণে আর কতকাল ডুববে চট্টগ্রাম

230

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা। চার ঘণ্টার টানা ও ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম শহরের অর্ধেকেরও বেশি এলাকা গতকাল পানিতে তলিয়ে যায়; কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় জলাবদ্ধতার মুখে পড়ে বন্দরনগরী। নিচু এলাকাগুলো কোমরপানিতে নিমজ্জিত হয় আর আন্দরকিল্লার মতো পাহাড়ি এলাকার সড়কগুলোতে জমে যায় হাঁটুসমান পানি। দিনভর বৃষ্টির কারণে নিচু এলাকার বেশিরভাগ বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করায় সেসব এলাকায় বসবাসকারীদের অন্তহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জলাবদ্ধ নগরবাসীর প্রশ্ন, বর্ষণে আর কতকাল ডুববে চট্টগ্রাম, আর কত দুর্ভোগ পোহাতে হবে আমাদের?

প্রবল বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ভূমি ও দেয়ালধসের খবর পাওয়া গেছে। তবে আগে থেকেই পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী লোকজনদের প্রশাসন সরিয়ে নেওয়ায় প্রাণহানি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। রাঙামাটি জেলার কাপ্তাইয়ে পাহাড়ধসে এক শিশুসহ দুজন মারা গেছে। এ ছাড়া বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক হয়ে সারাদিনই যান চলাচল ছিল বন্ধ, যা সন্ধ্যার পর স্বাভাবিক হয়।

দুপুরের পর বৃষ্টিপাত কিছুটা কমলেও পানির কারণে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর মধ্যে সিডিএ অ্যাভিনিউ ও পোর্ট কানেকটিং সড়কে দিনের বেশিরভাগ সময়ই যান চলাচল করতে পারেনি। বাকলিয়ার তিনটি ওয়ার্ড ও হালিশহর এলাকা সারাদিন ডুবেছিল কোমরপানিতে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের সামনের প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, চকবাজারের বড় অংশ বরাবরের মতোই পানিতে ডুবে যায়। আগ্রাবাদে মা ও শিশু হাসপাতালের প্রবেশপথ ও আশপাশের এলাকায় ছিল কোমরপানি। হাসপাতালটির ওয়ার্ডগুলোতেও বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে। ফ্লোরটিতে শিশু বিকাশকেন্দ্র, অটিজম চিকিৎসাকেন্দ্রসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা রয়েছে। তবে হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. নূরুল হক বলেন, ভারী বর্ষণ ও পানির তোড় দেখে আমরা তড়িঘড়ি বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে রোগীদের ওপরের তলায় স্থানান্তর করে ফেলেছি। হাসপাতালে পানি ঢুকে পড়লেও চিকিৎসাসেবা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি রোগীদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রাম শহরের ক্রমবর্ধমান জলাবদ্ধতা নিরসনে তিন বছর আগে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার একটি মেগাপ্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ২০১৭ সাল থেকে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। এটি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সিডিএর সঙ্গে যৌথভাবে সেনাবাহিনীকেও সম্পৃক্ত করা হয়। ২০২১ সালের মধ্যে প্রকল্পটি কাজ শেষ হওয়ার কথা। তবে গত তিন বছরে প্রকল্পের কোনো কাজ দৃশ্যমান হয়নি। প্রথম বছর সরকার বরাদ্দ দেয় ৫০০ কোটি টাকা। ওই টাকায় বরাদ্দকৃত কাজ যথাসময়ে শেষ হয়নি। পরবর্তী বছর ৩৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজ করতে না পারায় সেই অর্থ সরকারের কাছে ফেরত যায়। এ সময় সিডিএর পক্ষ থেকে নিয়োগকৃত প্রকল্প পরিচালক আহমদ মইন উদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রকল্পে সময় না দিয়ে এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে ঘন ঘন যুক্তরাষ্ট্র সফরের অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে প্রকল্পের শুরুর দিকে কয়েকটি খালে খননকাজ শুরু করা হলেও পরবর্তী সময়ে আর গতি পায়নি। উপরন্তু গত তিন বছরে নগরীর বেশিরভাগ খাল-নালা ভরাট হয়ে যায়। এতে করে নগরীতে বৃষ্টি হলে সেই পানি দ্রুত সরে না গিয়ে জলাবদ্ধতায় রূপ নেয়। মেগাপ্রকল্পটি গ্রহণ করার আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন প্রতিবছর রুটিন কাজ হিসেবে নগরীর খাল-নালা নিয়মিত খনন ও সংস্কার করত। সিডিএর প্রকল্প নেওয়ার পর থেকে সেটিও বন্ধ।

দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব না দিয়ে সংস্থাগুলো একে অপরের ওপর দোষ চাপায়। সিডিএর চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ আমাদের সময়কে বলেন, আমরা সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। কিন্তু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকেও (চসিক) রুটিন কাজ হিসেবে ছোট ছোট নালাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। নয়তো পানি অপসারণ হবে না। সারা শহরে চসিকের ৮০-৯০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করেন। তারা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলে পরিস্থিতি আরও ভালো হতো। সিডিএর পক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগের ব্যাপারে তিনিও শুনেছেন স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।
‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনর্খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের পরিচালক লে. কর্নেল শাহা আলী আমাদের সময়কে বলেন, চট্টগ্রাম শহরে ৩৬টি ছোটবড় খাল আছে। আমরা মাত্র ১৩টিতে কাজ করছি। তাই প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান হতে সময় লাগবে। তিনি বলেন, আজ (গতকাল) নগরীর বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। সেখানে আমাদের লোকজন পানি সরিয়ে দিতে কাজ করছে। পানি সরে যাওয়ার পথে কোথায় কোথায় বাধা, আমরা তা চিহ্নিত করছি। ভবিষ্যতে প্রকল্প বাস্তবায়নে এটি কাজে লাগবে।

তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের যান্ত্রিক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুদীপ বসাক আমাদের সময়কে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজটি সারাবছরই করতে হয়। সিডিএ মেগাপ্রকল্প গ্রহণের পর থেকে সিটি করপোরেশন নালা পরিষ্কার ছাড়া অন্য কাজ করছে না। কারণ এ জন্য আমাদের বাজেটও নেই। খালগুলো নিয়মিত খনন না করায় সেগুলো আবর্জনা ভরে জমাট বেঁধে গেছে। দেখা গেছে, সিডিএর প্রকল্পের আওতায় একটি সেতুর আশপাশে স্কেবেটর দিয়ে কিছু আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছে; পুরো খাল পরিষ্কার হয়নি। তিনি বলেন, প্রবল বৃষ্টিতে জলজট হয়। কিন্তু তা দ্রুত সরে না গেলে নগরীতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। আমরা এবার বৃষ্টির পানি দ্রুত সরতে দেখছি না।

চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের দায়িত্বরত কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম আমাদের সময়কে বলেন, চট্টগ্রাম, গত সোমবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত রের্কড করা হয়েছে ১৮৮ দশমিক ৬ মিলিমিটার। চলতি মৌসুমে এটাই ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। গতকাল সোমবারও ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রামে কোথাও কোথাও পাহাড় ধসের শঙ্কা রয়েছে। সেই সঙ্গে ভারী বর্ষণসহ বজ্রপাতও হতে পারে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

আলোকিত সকাল/এসআইসু

Facebook Comments