বর্ষার ফলের বাজার

273

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বাংলা মাস আষাঢ়ের শেষ সময় এখন, ভরা বর্ষা। বর্ষার মৌসুমে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে নানা ধরনের মৌসুমি ফল। এগুলোর মধ্যে আছে আমড়া, পেয়ারা, জাম, লটকন, জাম্বুরা, জামরুল, ডেউয়া, কামরাঙা, কাউ, গাব ইত্যাদি। এই ঘনঘোর বর্ষাতেও বাজারে গ্রীষ্মের ফল আম, কাঁঠালও মিলছে। বিক্রেতারা জানান, লটকন সবচেয়ে বেশি আসছে নরসিংদী থেকে, আমড়া বরিশাল থেকে, জাম্বুরা রাজশাহী থেকে, আনারস টাঙ্গাইল থেকে ও জামরুল যশোর থেকে। বাজারে ফলের বিক্রেতারা বলছেন, অন্যান্য ফলের চেয়ে বর্ষার ফলের সরবরাহ ও চাহিদা দুটোই বেড়েছে।

দেশে ফলের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার পুরানো ঢাকার বুড়িগঙ্গার ধারে বাদামতলী ঘাট। দেশি-বিদেশি হাজারো ফলের গন্ধে ম ম করছে পুরো এলাকা। এখানেই কথা হয় বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর ফল আমদানি, রপ্তানি ও আড়তদার ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির মোহাম্মদ ফারুক সিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, দেশে ফলের উত্পাদন বাড়ছে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষায় দেশি ফলের আমদানি এতটাই বেড়ে যায় যে, বিদেশি ফলের আমদানি কমে যায়। তিনি জানান, বিদেশি ফলের দাম দিন দিন বাড়ছে। সরকারের ট্যাক্স বৃদ্ধিও কারণে বিদেশি ফল সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশি ফলের বাণিজ্যিক চাষ বৃদ্ধির দিকে সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন।

দেশি ফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে—এতে রাসায়নিকের ব্যবহার হয় খুব কম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেবারেই হয় না। তাই, নির্দ্বিধায় খাওয়া যায় এসব ফল। পুষ্টিবিদেরা জানান, বর্ষার ফল পুষ্টিগুণে ভরা। লটকনে ভিটামিন ‘সি’ আর ‘এ’ আছে। এই ভিটামিন চুল, দাঁত ও ত্বকের জন্য ভালো। এ ছাড়া আমড়া ও জাম্বুরায় ভিটামিন সি আছে। এই ফলও শরীরের জন্য উপকারী।

বাজারে ফল বিক্রেতারা বলছেন, অন্যান্য ফলের চেয়ে মৌসুমি ফলের সরবরাহ ও চাহিদা বেড়েছে। আর দেশি ফলের দামও মেলে ভালো। তারপরও কেন উত্পাদন কম? উত্তরে বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাষিদের উদ্বুদ্ধ করা এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবেই বাড়ছে না দেশি ফলের চাষ। আর কোটি কোটি ডলার খরচ করে প্রতি বছর আনা হচ্ছে বিদেশি ফল।

ফলের বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিদেশি আপেলের। প্রতি বছর গড়ে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে বিদেশি এই ফলের আমদানি। গত অর্থবছরেও প্রতিদিন গড়ে ৭ লাখ কেজি আপেল বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে। গত অর্থবছরে ২ লাখ ৫৭ হাজার টন আপেল আমদানি করা হয়। খুচরা বাজারের হিসাবে শুধু আপেলের বাজারই বছরে ৩ হাজার ৮৬০ কোটি টাকার। এই বাজারে থাই জাতের দেশি উত্পাদিত পেয়ারা ভাগ বসালেও বাজার থেকে হঠাতে পারছে না। পেয়ারার দাম কম পুষ্টিগুণ ভালো রাসায়নিকমুক্ত। এতে আপেলের আমদানি কমছে। কিন্তু তারপরেও আপেলের বাজার বিশাল। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশে ফলের উত্পাদন বেড়েছে ২১ লাখ কেজি। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশি ফল উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ৯৯ লাখ ৭২ হাজার কেজি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে গত অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ২১ লাখ কেজিতে।

এত দিন ফল উৎপাদন বাড়লেও বিদেশি ফলের আমদানি কমেনি। তবে এখন পরিস্থিতি পালটে যাচ্ছে। পাইকারি বিক্রেতাদের হিসাব মতে, গ্রীষ্ম ও বর্ষায় বিদেশি ফলের চাহিদা নেমে দাঁড়ায় ২০ শতাংশে। আর বাজারের ৮০ শতাংশ ফলের চাহিদা পূরণ করে দেশি ফল। বিদেশি ফল বেচাকেনার ভরা মৌসুমেও এখন পাওয়া যাচ্ছে দেশি ফল। এর মধ্যে প্রধান ফল হলো—নতুন নতুন জাতের পেয়ারা।

আরও পড়ুন: জোটের ভাঙা-গড়ার অস্থিরতা বিএনপিতে

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে পেয়ারার উত্পাদন হয় ৩ লাখ টন। গত অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৫ লাখ ৬ হাজার টনে। থাই পেয়ারা দ্রুত ফলন হওয়ায় উত্পাদন বাড়ছে দ্রুত। রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় পেয়ারা, আমড়া, লটকনের এখন ব্যাপক চাহিদা। বর্ষার ফলের দাম মোটামুটি হাতের নাগালেই আছে। লটকন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। গত বছর এটি বিক্রি হয়েছে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা। বাজারে আমড়া মানভেদে ৭০ থেকে ১০০ টাকা, পেয়ারা ৫০ থেকে ৭০ টাকা, জাম ৫০ থেকে ৮০ টাকা, জাম্বুরা প্রতিটি ৫০ থেকে ৮০ টাকা, আনারস ২০ থেকে ৪০ টাকা, ডেউয়া ১০০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। নিউ মার্কেটে ফলের দোকানদার শামসুল পাটওয়ারি বললেন, আষাঢ়ের শেষেও এখনো আমের চাহিদাই বেশি। এরপরেই বর্ষার ফলের চাহিদা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments