বর্ষায় অপ্রতুল প্রস্তুতি

223

আলোকিত সকাল ডেস্ক

টানা কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই বর্ষায় তলিয়ে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রাম। খাল, নদী-নালা ও আশপাশের বিল-ঝিল ভরাট এবং দখল হওয়ার কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ফি বছরই জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে এ দুই প্রধান শহর। এতে অন্তহীন ভোগান্তিতে পড়ছেন নাগরিকরা। কিন্তু বর্ষাকালকে ঘিরে দুই নগরীর কোনোটাতেই আগাম প্রস্তুতি চোখে পড়ছে না।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে প্রস্তুতির দাবি করা হলেও তা এতটাই অপ্রতুল যে, নাগরিকদের ভোগান্তির তিল পরিমাণও লাগব হচ্ছে না। গত কয়েকদিনে চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার চিত্র দেখে শঙ্কার বুক দুরু দুরু করা শুরু করেছে রাজধানীবাসীর। কারণ গত কয়েক বছরে ঢাকা শহরের খোলা জায়গা ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে বিপুল পরিমাণ ভবন গড়ে উঠেছে। আরও নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। এসব নির্মীয়মাণ ভবনের কাজে ব্যবহৃত মাটি বৃষ্টির ঢলের সঙ্গে গিয়ে জমা হয়েছে ড্রেনে। ফলে মাটি জমে অকেজো হয়ে পড়েছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা।

এ ছাড়া মেট্রোরেল নির্মাণ, সড়ক সংস্কার, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানিল লাইনের কাজের জন্য বছরের প্রায় প্রতিটি দিনই ঢাকার কোনো না কোনো এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ির কাজ তো রয়েছেই। এসব কাজের জন্য রাজধানীর অনেক এলাকায় সরু ও সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়েছে ছোট-বড় রাস্তা। বষ্টির জল জমে এসব রাস্তায় তৈরি হচ্ছে তীব্র জলাবদ্ধতা। এবারের বর্ষায় এগুলো আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে এবং অন্তহীন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলেই আশঙ্কা করছেন নগরবাসী।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের হওয়া বৃষ্টিপাতে প্রায় অচল হয়ে পড়েচিল রাজধানী। মাত্র তিন-চারদিনের হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিতেই নগরীর ধানম-ি, মোহাম্মদপুর, শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক, খিলগাঁও, বাসাবো, মানিকনগর, গুলিস্তান, নিউমার্কেট, আরামবাগ, রাজারবাগ, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, কারওয়ান বাজার, মতিঝিল, রামপুরা, বাড্ডা, মহাখালী, বনানী, গুলশান, কালাচাঁদপুর, জোয়ার সাহারা, মিরপুর-১, মিরপুর-১০ ও ১১, কচুক্ষেত, কুড়িলসহ বিভিন্ন এলাকা এবং এর অলিগলি ও প্রধান সড়কগুলোতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে অফিসগামী চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের পড়তে হয়েছিল চরম ভোগান্তিতে।

ওই ঘটনার পর নগরবিদরা বলেছেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষের টানাপড়েন, একক ও সমন্বিত কর্তৃপক্ষ না থাকায় রাজধানীবাসী জলাবদ্ধতার এমন অভিশাপ থেকে রেহায় পাচ্ছে না। তা ছাড়া জলনিষ্কাশনের জন্য রাজধানীর অধিকাংশ খাল দখল ও ভরাট হয়ে গেছে। নতুন নালা ও নর্দমা নির্মাণ এবং পুরনো নর্দমা পরিষ্কারের কোনো উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে না ড্রেনেজের ব্লক সারানোর কোনো উদ্যোগ। এমন কি দখল বা ভরাট হওয়া নালা ও খালগুলো উদ্ধারেও কার্যকর কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ফলে বর্ষা মৌসুমে রাজধানীর বাসিন্দাদের কোনো ভোগান্তি পোহাতে হবে তা ধারণারও অতীত।

রোববার রাত থেকে সোমবার বেলা ২টা পর্যন্ত, মাত্র দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সৃষ্ট ভয়াবহ জলাবদ্ধতা রাজধানীবাসীর ভোগান্তির ধারণাকে কিছুটা পরিষ্কার করেছে বলে মনে করছেন অনেক। অপেক্ষাকৃত উঁচু হওয়ার পর চট্টগ্রামের মতো শহর বৃষ্টি পানিতে তলিয়ে গেছে। সেখানে ঢাকার অবস্থা আরও বেগতিক হবে এমন আশঙ্কাই বদ্ধমূল হচ্ছে। বৃষ্টিতে চাটগাঁর ওয়াসা মোড়, ষোলোশহর, নন্দনকানন, মেহেদিবাগ, প্রবর্তক, অক্সিজেন মোড়, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, বহদ্দারহাট, বাঁদুড়তলা, পাঁচলাইশ, শুলকবহর, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, বাকলিয়া, হালি শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে গেছে এসব স্থান।

ভারীবর্ষণে চট্টগ্রাম শহর ও বিভাগের কয়েকটি জেলা বিশেষ করে খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসের শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে পাহাড়ধসে কয়েকজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বাসিন্দাদের।

চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা অবশ্য আগেই করেছিলেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মেগা প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি আশানুরূপ না হওয়ায় আসন্ন বর্ষায় জলাবদ্ধতার শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, শুধু বিপদ কানের কাছে এলেই প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনগুলোর তোড়জোড় শুরু হয়। আগাম প্রস্তুতির কোনো বালাই থাকে না। অথচ ঢাকা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোতে বর্ষায় নাগরিক ভোগান্তি লাগবে আগাম প্রস্তুতির কথা দরকার বলে মনে করেন নগর বিশারদরা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, বর্ষায় জলাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে তারা আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ বছর জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮০৪ কোটি টাকার বাজেট করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এ টাকা ব্যয় করবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা ওয়াসা। এর মধ্যে রাস্তা, ফুটপাত ও ড্রেন সংস্কারে ডিএসসিসির খরচ ধরা হয়েছে ৫৮৪ কোটি টাকা। একই খাতে ১৮০ কোটি টাকা ব্যয় করবে ডিএনসিসি। এছাড়া খাল পুনঃখনন ও পরিষ্কারে ঢাকা ওয়াসা ব্যয় ধরেছে ৪০ কোটি টাকা। এর বাইরে সংস্থাগুলোর নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কারের কাজেও ব্যয় হবে কয়েক কোটি টাকা।

নতুন ড্রেনেজ নির্মাণ বা সংস্কারের কাজ মূলত ওয়াসার। তাই ড্রেনেজ লাইন থেকে আসা পানি ওয়াসা পাম্পিং করে বের করে দিলেই নগরীতে জলাবদ্ধতা থাকবে না বলে জানান ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন তার ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্ষার পানি ওয়াসার পাম্প হাউস পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। সমস্যা যেটা হয় যে, ওয়াসা এ পানিগুলোতে দ্রুত বের করে দিতে পারে না। এজন্য ওয়াসার পাম্প বাড়াতে হবে। বৃষ্টি হলে পাম্পগুলো দিয়ে ঠিকমতো পাম্পিং হচ্ছে কি-না সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ওয়াসা যদি ঠিকমতো পানি পাম্প আউট না করে তাহলে জলাবদ্ধতা হবেই।

এদিকে বিগত সময় শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও তার কোনো দৃশ্যমান কাজ দেখতে পায়নি নগরবাসী। এমন অভিযোগ করেছেন মিরপুর-১০-এর বাসিন্দা আবুজার রহমত উল্লাহ। তিনি বলেন, এখানকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। সামান্য বৃষ্টিতেই মিরপুর ১০, ১ ও ১১ এলাকাগুলো পানিতে ডুবে যায়। গত এপ্রিল মাসে এলাকা পরিদর্শন করে উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম আশ্বাস দেন কয়েকদিনের মধ্যেই এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করবেন। কিন্তু কোনো উদ্যোগ তো চোখে পড়লো না। এবারের বর্ষায় একটু ভারী বৃষ্টি হলে কী অবস্থা দাঁড়াবে সে চিন্তায় এলাকার মানুষের ঘুমই হারাম হয়ে গেছে। কারণ প্রতি বছর একই ভোগান্তি আর কত সইতে পারে মানুষ।

শান্তিগর এলাকার বাসিন্দা মঞ্জুর বলেন, বর্ষা এলেই শান্তিনগর এলাকার লোকজন ভয়ে থাকেন। কারণ প্রতি বছরই এখানে পানি জমে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, স্কুলগামী ছেলেমেয়ে, চাকরিজীবী প্রত্যেকেরই ভোগান্তির শেষ থাকে না। স্যুয়ারেজের লাইনগুলোর বেহাল অবস্থা। আধাঘণ্টা বৃষ্টিতেই গোটা এলাকা তলিয়ে যায়। এত এত টাকা বাজেট হয়, পরিকল্পনা হয়, কই কোনো কাজ তো হতে দেখি না। দেখি শুধু একবার ফ্লাইওভারের নামে একবার পানির লাইনের নামে আরেকবার বিদ্যুতের লাইনের জন্য রাস্তা খোঁড়া হয়। তাতে মানুষের ভোগান্তি বাড়ে, কমে না। ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হওয়ার পর ভেবেছিলাম শান্তিনগরের দুঃখ শেষ হবে, কিন্তু দুঃখ দুঃখই রয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা আর কমাতে পারেনি কেউ।

বিশিষ্ট নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যাপারে রাজধানী ঢাকায় কোনো একক সংস্থা নেই। একাধিক সংস্থা কাজ করে। তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। অথচ চাইলে ঢাকার সার্বিক সমস্যা সমাধানে একটা সুপার অথরিটি তৈরি করা যায়, যারা সুশাসন, পরিচালন ও সমন্বয়ের জন্য সর্বোচ্চ ক্ষমতা নিয়ে কাজ করবে। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে এরকম অথরিটি আছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে কী কী বিষয় প্রাধান্য পেতে পারে তা এ অথরিটি বসেই ঠিক করতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সংস্থাগুলোর কাজের গতি খুব মন্থর। এ ক্ষেত্রে গত বছরের অভিজ্ঞতা তারা কাজে লাগিয়ে এবার কাজের গতি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। জনগনের ভোগান্তির বিষয়টি মাথায় রাখে না তারা। সে জন্য ড্রেনের কোথায় ব্লক হয়েছে সেটা বের করে দ্রুত ঠিক করার চেয়ে নতুন লাইন তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। ড্রেনেজের ব্লক ছাড়াতে মনোযোগী নয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments