বাংলাদেশের টিআরপিই যেন বেশি!

298

আলোকিত সকাল ডেস্ক

‘তুমি জ্যাকেটটা দিয়ে দিলে না কেন? তাহলে আমাদের একটা কপি হতো’, কলকাতার পরিচিত এক সাংবাদিক অনুযোগ করছিলেন। গতকাল সংবাদ সম্মেলনের পর স্বদেশি এক সাংবাদিকের সঙ্গে মাশরাফি বিন মর্তুজার খুনসুটি দেখে চমকিতও তিনি। আরেকজন সবার থেকে আলাদা করে নিয়ে গেলেন বাংলাদেশ অধিনায়ককে, ‘আর কেউ ফ্রেমে থাকবে না, উনার সঙ্গে আমার একার একটা ছবি চাই!’ তাঁর এই ‘স্বার্থপরতা’ দেখে ভারতীয় মিডিয়া খানিক বিরক্ত, মাশরাফিকে একটু দূরে সরে যেতে হলো বলে।

সাকিবের বিশ্বব্যাপী সাকিব আল হাসান হয়ে ওঠার পেছনের পরিশ্রমের মুহূর্তগুলো কারো দেখা হয় না। তেমনি বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচের আগে মাশরাফিকে ঘিরে ভারতীয় মিডিয়ার অনুরাগও পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। তাই এক জীবনে সুনীল গাভাস্কার-ইমরান খানের মতো তারকাদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া বর্ষীয়ান সাংবাদিকও বাংলাদেশ অধিনায়কের সঙ্গে আলাদা করে ছবি তুলতে চান। সর্বভারতীয় মিডিয়ার অভিন্ন রায়, ‘তোমাদের অধিনায়কটা বড্ড ভালো ছেলে।’

এমন অপত্য স্নেহ কিংবা ব্যবহারে স্টারসুলভ অবজ্ঞা নেই বলেই কিনা মাশরাফি অসম্ভব জনপ্রিয় ভারতীয় মিডিয়ার কাছে। পশ্চিমবাংলার সাংবাদিকদের টান আরো গভীর, সেটা অবশ্যই ভাষাগত কারণে। তাই ইংরেজির চেয়ে গতকাল মাশরাফিকে বাংলাতেই প্রশ্ন নিতে হয়েছে বেশি। সেসব প্রশ্নও প্রায় একমুখী। বাংলাদেশি সাংবাদিকদের স্বভাবতই ভারতকে হারানোর নানা কৌশল নিয়েই কথা বলতে হয়েছে মাশরাফিকে। ভারতের সাংবাদিকরাও দেখি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজ দলের দুর্বলতাকে টার্গেট করে বাংলাদেশের রণকৌশল জানতে অধিক আগ্রহী! মহেন্দ্র সিং ধোনি আর কেদার যাদবদের নিয়ে ভারতের নড়বড়ে মিডল অর্ডারকে আঘাত করার ছক কষেছেন কি না মাশরাফি? আবার ইংলিশদের ব্যাটে ভারতীয় স্পিনারদের নাজেহাল হওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশ অধিনায়ককে আশাবাদী করেছে কি না—প্রশ্ন উঠেছে ভারতীয় মিডিয়ার পক্ষ থেকেই।

তবে তিনি মাশরাফি বিন মর্তুজা অকারণ উত্তর দিয়ে ‘মাইন্ড গেম’ খেলার চেষ্টা করেননি। বরং ধোনির প্রতি গভীর ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ যেমন জানিয়েছেন, তেমনি ভারতের স্পিন বৈচিত্র্যের প্রতিও পূর্ণ সম্মান জানিয়েছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

কে একজন আবার প্রশ্ন করেছেন, ‘আপনি কি বছর দশেক পরে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন?’ বাংলাদেশ অধিনায়কের কৌতুককর উত্তর শুনে হাসির ফোয়ারা ছোটে সংবাদ সম্মেলন কক্ষে, ‘আপনি কি চান আমি মরে যাই? কক্ষনো না!’

আরেকজন প্রশ্ন করেন, এজবাস্টনের উইকেটে স্লোয়ার অনেক কার্যকর মনে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশও নিশ্চয় স্লোয়ার বেশি বেশি ব্যবহার করবে? শুনে দ্বিতীয়বার হাসালেন সবাইকে, ‘আমাদের সবার বলের গতিই তো স্লোয়ার!’

কেউ আবার ভারতের বিপক্ষে তাঁর সুখস্মৃতি উসকে দিয়েছেন। ২০০৪ সালে ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয়ে ম্যাচসেরা তিনি। ২০০৭ বিশ্বকাপ থেকে ভারতের বিদায় নিশ্চিত হওয়া ম্যাচেরও সেরা মাশরাফি। তাই ভারতের বিপক্ষে বাড়তি অনুপ্রেরণা নিয়েই তো নামার কথা বাংলাদেশ অধিনায়কের। মাশরাফির মনে অবশ্য আগের ম্যাচের স্মৃতিই প্রতিক্রিয়া ফেলে না। সেখানে যুগ পুরনো স্মৃতি কতটা অনুপ্রাণিত করবে আজ এজবাস্টনে, বলা মুশকিল। মাশরাফি নিজেও বর্তমানে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের কথাই বলেছেন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। ভবিষ্যৎ মানে, আজকের ম্যাচ। দুই দেশের মিডিয়া তাতেই খুশি।

সংবাদ সম্মেলনের চিরায়ত খোঁচাখুঁচি নেই। মনে হচ্ছিল সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজা কোনো জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন আর মনোযোগ দিয়ে শুনছেন নড়াইল-২ আসনের একঘর মানুষ! এজবাস্টনের প্রেস কনফারেন্স রুমের ক্ষমতা নেই সবাইকে ধারণের। চেয়ার একটাও খালি নেই, দাঁড়িয়ে সবাই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে। হাততালির শব্দ আর স্লোগানটাই শুধু ওঠেনি!

অবশ্য মাশরাফির সংবাদ সম্মেলনগুলোয় বরাবরই সুখী মানুষের ভিড় থাকে। কঠিন প্রশ্ন সামান্যই হয়। আর বাংলাদেশ অধিনায়ক এতটাই দক্ষতার সঙ্গে সবার মন বুঝে ‘হ্যান্ডল’ করেন যে চোখা প্রশ্নকর্তাকেও বিগলিত দেখায় পরবর্তী সময়ে।

ভারতীয় সংবাদকর্মীদের এমন সুখের দিন আর নেই। বাংলাদেশ ম্যাচের আগে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে আসেইনি দলের কেউ। ই-মেইলে পাঠানো হয়েছে এক দিন আগে ধারণকৃত দলের ব্যাটিং কোচ সঞ্জয় বাঙ্গারের ভিডিও বার্তা, যা পেয়ে বাংলাদেশের এক সাংবাদিক রসিকতা করে বলছিলেন, ‘এই লাদেন-মার্কা ভিডিও বার্তা কি ক্রিকেটে এর আগে কেউ পাঠিয়েছিল?’

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে এখন নিজ দেশের ব্যাটিং কোচও দূরের তারা। সেখানে মাশরাফিকে ধরা যায়, ছোঁয়া যায়, চাইলে হাত ধরে টেনে আলাদা করে নিয়ে ছবিও তোলা যায়। যা এক ছায়াতলে নিয়ে আসে বাংলাদেশ-ভারত মিডিয়া মহলকে।

পরিস্থিতি যা, তাতে মনে হচ্ছে আজ বাংলাদেশ জিতলে এঁরা উৎসব না করলেও অন্তত বিষণ্নতায় আক্রান্ত হবেন না! সহজাত সারল্য দিয়ে প্রতিপক্ষ সংবাদকর্মীদের অনেককে নিজের পক্ষে টেনে নিয়েছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। এখন বাকি থাকল একটা কাজই, যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সে কাজটির কথা তো সবারই জানা, ভারতের বিপক্ষে বহুল প্রতীক্ষিত জয়। কঠিন, তবে মোটেও অসম্ভব নয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments