বাংলার গর্বের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সাকিব

176

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বাংলার চার হাজার বছরের ইতিহাসে রয়েছে স্বর্ণখচিত অসংখ্য অধ্যায়। এই বাংলারই কিশোর ক্ষুদিরাম মাতৃসম জন্মভূমির জন্য হাসতে হাসতে গলায় ফাঁস পরেছিল। বিশ্বকে বিস্মিত করে জন্ম দিয়ে গিয়েছিল নতুন এক অধ্যায়ের; নতুন সূর্য আনতে নিজ জীবন তুচ্ছ করে নতুন পথে হেঁটেছিলেন এই বাংলারই সূর্যহৃদয় মাস্টারদা সূর্যসেন; সার্বভৌম বারোভূঁইয়া বাংলার ইতিহাসেরই মাথা না নোয়ানো এক অধ্যায়।

হাজার বছরের পথচলায় তিতুমীর, হাজী শরীয়ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের হাত ধরে এই বাংলা তাক লাগিয়ে দিয়েছে পৃথিবীকে। এ জন্যই সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ‘আমার পরিচয়’ কবিতায় উচ্চশিরে জানান দিয়েছিলেন, ‘আমি জন্মেছি বাংলায়, আমি বাংলায় কথা বলি।’ স্পন্দিত হৃদয়ে বলেছিলেন, ‘পরিচয়ে আমি বাঙালি, আমার আছে ইতিহাস গর্বের।’ বাংলার গর্বিত সেই ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যোগ করলেন সাকিব আল হাসান, আর এ পৃথিবী তাকিয়ে দেখল অবাক হয়ে।

এ জন্যই বিশ্ববরেণ্য ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরাম দুঃখ করে ম্যাচশেষে আতাহার আলী খানকে বলেছিলেন, ‘আজ যদি আমাদের একজন সাকিব থাকত!’ পাকিস্তানের সব কিছুই ছিল। ফাস্ট বোলার, অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান ও স্পিনার। শুধু একজন সাকিব ছিলেন না।
সাকিব যদি অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নিতেন, তা হলে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতেন। বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসিকে নিয়ে ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ বলেছিলেনÑ মেসি যদি জার্মানিতে জন্ম নিত, তা হলে কী হতো!

বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচে মাশরাফি বিন মোর্ত্তুজা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সাকিবের জন্য খারাপ লাগছে। ও যেভাবে পারফরম করেছে, এতে বাংলাদেশের সেমিফাইনালে থাকা উচিত ছিল।’ সাকিব বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে লড়াইয়ে নামেন। একজন যোগ্য সঙ্গীর অভাবে তিনি পারেননি। অ্যাকিলিসের মতো ট্রয়ে (ইংল্যান্ড) গিয়েছিলেন। স্বপ্নকে রেখে এসেছেন পেছনে। একজন অ্যাকিলিসকে যেমন পৃথিবী মনে রেখেছে, বিশ্বক্রিকেট মনে রাখবে একজন ‘আর্মি’-কে। পুরো দলের পারফরম্যান্সকে ছাপিয়ে ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়েছেন। ৬০৬ রান আর ১১ উইকেট নিয়ে নজর কেড়েছেন বিশ্ব ক্রিকেটের। বর্তমান যে অবস্থা ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন।

সাকিব হচ্ছেন ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো। কোনোভাবেই এই আলো আড়াল করা যায় না। ওয়াসিম আকরাম স্বীকার করেছেন। আরও অনেকে করবেন। ক্রিকেট বা ফুটবল তো একার লড়াই নয়। শেষ পাকিস্তানের ম্যাচেও সাকিব বুক চিতিয়ে লড়েছেন। একটা সময়ে রান রেট বেড়ে যাওয়ায় আগ্রাসী ব্যাটিং করতে বাধ্য হন। আর তা করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আউট হয়ে সাজঘরে ফেরত যেতে হয় তাকে। সাকিবের সঙ্গে নন-স্ট্রাইকে যারা ছিলেন, তাদের পরিস্থিতি এই টুর্নামেন্টে বরাবরের মতো করুণ। চাপটা গিয়ে পড়েছে সাকিবের ওপর।

তার পরও চেষ্টা করেছেন দলকে টেনে নিতে। বিশ্বমানের সব বোলারের বিপক্ষে লড়াইয়ে তিনি ছিলেন আদর্শ। সাকিব কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করেননি। অন্যরা কেন ভেঙে পড়ল! এই ‘কেন’র কোনো উত্তর নেই। শ্রীলংকাও স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে। বাংলাদেশ টপ ফোরের কারও সঙ্গে জিততে পারেনি। এডিটই দিনশেষে উপসংহার টেনে দিয়েছে।

সাকিব একজন সত্যিকারের যোদ্ধা। যখনই পারফরম্যান্স মনের মতো হচ্ছে না, তখনই গুরু সালাউদ্দিনকে ডেকে নিয়েছেন। থেমে যাওয়ার পাত্র নন। ২০২৩ বিশ্বকাপে হয়তো সাকিবই অধিনায়ক হয়ে ভারতে যাবেন। মাশরাফির ব্যাটন তো তার হাতেই শোভা পায়। সাকিব ‘মোর দ্যান রেডি’ হয়েই আসবেন।

বিশ্বকাপে সাকিবের রেকর্ডগুলো বাঁধাই করে রাখার মতো। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলছে ২০ বছর। এই আসরে বাংলাদেশের প্রথম ৫ উইকেট শিকারি সাকিব। সাকিবের করার কিছুই ছিল না। একাই সবটা উজাড় করে দিয়েছেন। বাংলাদেশ তো বিশ্বকাপে অনেক জায়গায় হেরেছে। সাকিব আরও অনেক হার ও লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়েছে। আফগানিস্তানের ম্যাচে সাকিব যদি এমন পারফরম না করতেন, কী হতো বলা মুশকিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অমন ভয়ঙ্কর বোলিংয়ে সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন। বাংলাদেশের এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা তো প্রথম ১০-২০ ওভারে উইকেট না পাওয়া।

ফাস্ট বোলারদের ব্যর্থতা কাঁধে নিয়ে বাংলাদেশ সফল হয়নি। ফাস্ট বোলাররা অবশ্য উইকেট পেয়েছেন, তবে অনেক দেরিতে। ক্যাচ মিসেরও খেসারত দিয়েছে বাংলাদেশ। ফিল্ডিং মিসে প্রচুর রান বেরিয়ে গেছে। সাকিবকে সুপারম্যান হতে হতো এখানে, নিজেই বোলিং করে যদি আবার বল কুড়িয়ে আনতে পারতেন!

তামিম গতকাল ফেসবুক থেকে ফ্যান পেজ সরিয়ে নিয়েছেন।
সাকিব বাংলাদেশের ‘সবেধন নীলমণি’। আজ তার পারফরম্যান্স নিয়ে জয়গান হচ্ছে ঠিকইÑ তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও অনেকবার দেখেছেন! শুভকামনা সাকিব, আগামীর জন্য শুভকামনা বাংলাদেশ!

আস/এসআইসু

Facebook Comments