বাল্যবিয়ের থাবায় হারিয়ে গেল দেশসেরা ৭ কিশোরী

2

দেশবার্তা নিউজ:কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি ইউনিয়নের বাঁশজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদে ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় কিশোরী স্মরলিকা দেশের সেরা খেলোয়াড় হয়েও বাল্যবিয়ের কারণে হারিয়ে গেল ফুটবল জগত থেকে।

একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, ২০১৮ সালের জানুয়ারি হতে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ১৯৭টি বাল্যবিয়ে সংঘটিত হয়েছে।

২০১৭ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপে হ্যাটট্রিক কন্যাখ্যাত দেশের সেরা খেলোয়াড় স্মরলিকা পারভীন। দলের পাশাপাশি হ্যাটট্রিক কন্যাখ্যাত সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে স্মরলিকা ও তার দল।

ফুটবল মাঠের পরিবর্তে স্মরলিকা ও তার দলের ৭ জন কিশোরী সংসার জীবনে মাঠে নেমে পড়েছে। উচ্চ বিদ্যালয়ের গণ্ডি না পেরুতেই বাল্যবিয়ের কালো থাবায় হারিয়ে গেল এই উদীয়মান তরুণী খেলোয়াড়দের জীবন।

কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাথরডুবি ইউনিয়নের সাবেক ছিটমহল দীঘলটারী দক্ষিণ বাঁশজানি গ্রামে স্মরলিকার বাড়ি। ২০১৭ সালে বাঁশজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দল ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে ২০ জন কিশোরীর দল সেই খেলায় অংশ নিতে ঢাকায় যায়।

বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সোনাদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৩-১ গোলে হারায় বাঁশজানি দল। সেখানে হ্যাটট্রিক করে অধিনায়ক স্মরলিকা। সেমিফাইনালে হেরে গিয়ে স্থান নির্ধারণী ম্যাচে চট্টগ্রামের বাঁশখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৪-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হয় বাঁশজানি দল। এখানেও হ্যাটট্রিক করে কিশোরী। পরিচিতি পায় নারী ফুটবলার গ্রাম হিসেবে।

স্মরলিকার নেতৃত্বে আসে নানান সাফল্যের মেডেল, ক্রেস্ট, কাপ। ভারত-বাংলাদেশ বিলুপ্ত ছিটমহলের নতুন বাংলাদেশিদের কাছে পাওয়া প্রথম উপহার আসে স্মরলিকা পারভীনের হাত ধরেই।

করোনার দুর্যোগে সম্ভাবনাময়ী এই দলের কোনো খোঁজখবর না রাখায় দরিদ্রতার কশাঘাতে বাধ্য হয়েই পরিবার থেকে বাল্যবিয়ে দেয়া হচ্ছে। মেয়েদের বয়স কম থাকায় নিবন্ধন (রেজিস্ট্রি) করতে না পেরে শুধুমাত্র গ্রামীণ আর ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে দেন পরিবার থেকে।

স্মরলিকা পারভীন বলেন, ইচ্ছে ছিল জাতীয় দলে খেলার। দেশের জন্য কিছু করার। কিন্তু সেই স্বপ্ন শেষ হয় বিয়ে হয়ে যাওয়ায়। সামাজিক নানা কথা মেয়েরা ফুটবল খেললে বিয়ে হবে না, ভালো ছেলে পাওয়া যাবে না; আর্থিক অনটনসহ এমন অনেক কারণে বাবা-মা বিয়ে দিয়ে দিছে। আমার টিমের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে।

স্মরলিকার বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি কৃষিকাজ করে ৫ জনের সংসার চালাই। সীমান্ত এলাকায় কোনো কাজ নাই। করোনার জন্য অভাব আরও বেশি হয়েছে। ভালো ঘর পাইছি। ডিমান্ড ছাড়াই বিয়ে দিয়েছি মেয়ের।

তিনি আরও বলেন, স্মরলিকার গত ৫ মার্চ উপজেলার পার্শ্ববর্তী শিলখুড়ি ইউনিয়নের মোটর মেকানিক কামরুল ইসলামের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে।

টিমের অপর খেলোয়াড় লিশামনির মা আমিনা বেগম বলেন, অনেক দিন ধরে কেউ খোঁজ নেয়নি। স্কুল বন্ধ, পড়াশুনা নাই, মেয়েরা বসে থাকে। ভালো ছেলে পেয়ে স্মরলিকার বিয়ে দিয়েছেন ওর বাবা-মা। আমিও ভালো ছেলে পেলে আমার মেয়েকেও বিয়ে দেব। মেয়েকে পড়াশুনা করানো আর খেলোয়াড় বানানোর মতো সামর্থ্য আমাদের নেই।

খেলোয়াড় লিশামনি বলেন, আমি বাঁশজানি টিমে খেলেছি। সেদিনের সেই অনুভূতি বলার মতো না। সেখান থেকে আসার পর আমাদের কেউ কোনো খোঁজখবর রাখেনি। গেল তিন মাসে আমাদের টিমের সাতজন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তারা হলো- বাঁশজানি দলের অধিনায়ক দশম শ্রেণি পড়ুয়া স্মরলিকা, একই শ্রেণির জয়নব, নবম শ্রেণির শাবানা, অষ্টম শ্রেণির রত্না, আঁখি, শারমিন এবং আতিকা।

শাবানার বাবা অটোচালক সাইফুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এতদূর থেকে মেয়েরা খেলতে গেছিল। শুধু যাওয়া-আসা আর থাকা-খাওয়া ছাড়া মেয়েরা কিছুই পায়নি। উল্টো খেলতে গেলে মেয়েদের পেছনে টাকা খরচ করতে হতো। করোনার আগেও রংপুর, ঢাকায় খেলে আসছে। কোনো কিছু সহযোগিতা পায়নি। করোনার মধ্যে স্কুল বন্ধ, আয় কমে গেছে। খরচ বাড়ছে। তাই ভালো সম্বন্ধ আসছে বলে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি।

প্রতিবেশী শাহআলম বলেন, করোনার কারণে দিনে দিনে বাল্যবিয়ের হার বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি-বেসরকারিভাবে এসব প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নজরদারি বাড়ালে অন্যান্য মেয়েদের বাল্যবিয়ের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

বাঁশজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই সময়ের ফুটবল প্রশিক্ষক আতিকুর রহমান খোকন জানান, সেই সময়ের বাঁশজানি দলের ৬-৭ জনের বিয়ে হয়ে গেছে। আমাদের অগোচরেই এসব বিয়ে দিয়েছে তাদের পরিবার। এখন তারা খেলার মাঠে থাকার কথা। অথচ অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাবার কারণে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। ওদের কারও মুখের দিকে তাকানো যায় না। কতগুলো সম্ভাবনা চোখের সামনেই শেষ।

তিনি বলেন, খেলে আসার পর যদি এদের প্রশিক্ষণ আর অর্থনৈতিক সহযোগিতা করা যেত, তাহলে হয়তো এমনটি ঘটতো না। এখন যারা বাকি আছে তাদের দিকে সরকারি-বেসরকারিভাবে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।

বাঁশজানি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কায়সার আলী বলেন, করোনার সময় স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর তেমনটা নেয়া সম্ভব হয়নি। অনেকের বিয়ের বিষয়টি আমি পরে জানতে পেরেছি। বিয়ের সময় জানতে পারলেও বিয়ে আটকানো যেত। আসলে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আমাদের কিছু করার থাকে না।

পাথরডুবি ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরফান আলী বলেন, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধির অগোচরেই বাঁশজানি দলের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে। তবে তিনি দাবি জানান, সরকারি-বেসরকারিভাবে কিশোরী খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণসহ প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি করা গেলে বাল্যবিয়ের হার কমে আসবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার দেব শর্মা বলেন, কিশোরী ফুটবলারের বাল্যবিয়ের বিষয়ে অবগত ছিলেন না। কেউ তাকে জানায়নি। জানলে তিনি আইনি পদক্ষেপ নিতে পারতেন। তবে বাকি খেলোয়াড়রা যেন বাল্যবিয়ের স্বীকার না হয় সেজন্য তিনি নজর রাখার পাশাপাশি তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

Facebook Comments Box