বাড়ছে পানি, ডুবছে নিম্নাঞ্চল

223

আলোকিত সকাল ডেস্ক

টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের নদী-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে নদী তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে শত শত ঘরবাড়ি। পানিবন্দি হয়েছে হাজার হাজার পরিবার। এ অবস্থায় আতঙ্কে রয়েছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। বিস্তারিত জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে-

সুনামগঞ্জ : সাতটি উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সরকারি হিসাবে প্রায় ১৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হওয়ার কথা বলা হলেও স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন অন্তত ৪০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে। ঢল ও বর্ষণের পানি উজান থেকে এখন নিম্নাঞ্চলে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় নলকূপ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সুনামগঞ্জ পয়েন্টে শনিবার সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৮৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় ৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দিনে সুরমা নদীসহ সীমান্ত নদীর পানি কিছুটা কমলেও রাতভর বৃষ্টি হলে আবারও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উজানের পানি এখন নিম্নাঞ্চলে নেমে ঘরবাড়ি, হাটবাজার, মাঠ প্লাবিত করছে। নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। শনিবার সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর এবং সুনামগঞ্জ-দোয়ারাবাজার সড়কের বিভিন্ন অংশ ডুবে থাকায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলা সদরের সঙ্গে উত্তরের চারটি ইউনিয়নের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ঢল ও বৃষ্টিতে উপজেলাগুলোর প্রধান সড়ক ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনও ২৩৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি রয়েছে। ১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং সেখানে বানভাসি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ছয়টি উপজেলায় বন্যাকবলিতদের মধ্যে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে তালিকাভুক্ত সবকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উঁচু অঞ্চল থেকে পানি নেমে এখন নিচের এলাকাগুলোকে প্লাবিত করছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, শুক্রবার পাহাড়ি ঢল ও বর্ষণ কিছুটা কম ছিল। যার ফলে প্রধান নদী সুরমাসহ অন্যান্য নদীর পানিও কিছুটা কমেছে। তবে পানি নিম্নাঞ্চলে গিয়ে এখন চাপ তৈরি করছে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হবে। আরও দুদিন বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে, ঢল ও বর্ষণে সুনামগঞ্জ জেলার ৬২১টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এতে প্রায় দুই কোটি ৬২ লাখ ৩৪ হাজার ২০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

বান্দরবান : টানা নয় দিনের বর্ষণে বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে আর্মিপাড়া, ইসলামপুর,বাসস্ট্যান্ড ছাড়াও লামা, আলীকদম, রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে প্রবল বৃষ্টির কারণে ফের পানি বাড়তে শুরু করেছে। বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের বাজালিয়ার বড়দুয়ারা এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গত মঙ্গলবার থেকে বান্দরবানের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। বন্যাদুর্গতদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে ১৩৩টি। আশ্রয় কেন্দ্রলোতে জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম : নগরীর বিভিন্ন এলাকা আবারও পানিতে তলিয়ে গেছে। টানা বৃষ্টির কারণে গত এক সপ্তাহ এ জলাবদ্ধতায় নাকাল নগরবাসী। এদিকে পাহাড় ধসে বেশকিছু বাড়িঘর মাটিচাপা পড়েছে। মাটিচাপা পড়া দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। গত ৮ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। এতে নগরীর দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা পানিতে ডুবে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রতিদিনকার জোয়ারের পানি। শুক্রবার রাত থেকে একটানা বৃষ্টির কারণে আবারও জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে চট্টগ্রাম।

নগরীর পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানিয়েছেন, শুক্রবার থেকে শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ৫১ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে চট্টগ্রামে। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এ বৃষ্টিপাত আরও দুদিন থাকতে পারে। এতে রাউজান, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, আনোয়ারা, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালী বন্যায় প্লাবিত হয়েছে।

রাউজান উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নিয়াজ মোরশেদ জানান, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সর্তাখাল ও ডাবুয়া খালের কয়েকটি স্থানে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে।

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সায়েদুল আরেফিন বলেন, বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হালদার বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বন্যাকবলিতদের ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

ফেনী : মুহুরী ও কহুয়া নদীর প্রবাহ কমতে শুরু করায় পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত ফুলগাজী ও পরশুরামের ২৬ গ্রামের পানি নামতে শুরু করেছে। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য। বর্ষা মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধের ভাঙা অংশ মেরামতের নিশ্চয়তা না দিতে পারায় আবারও পানিতে ভাসার আতঙ্কে স্থানীয়রা।

মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পের ১২২ কিলোমিটার বাঁধের ১২টি স্থানে ভাঙনের ফলে দুটি উপজেলার প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গত মঙ্গলবার রাতে ফেনীর মুহুরী ও কহুয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার কমপক্ষে ১২টি স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। এর ফলে একে একে ভেসে যায় দুই উপজেলার ১৫টি গ্রাম। পরদিন থেকে সেই পানি ছড়িয়ে পড়ে আরও ১১টি গ্রামে।

গলাচিপা (পটুয়াখালী) : উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ভাঙনকবলিত থাকলেও এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন হল ডাকুয়া। এ ইউনিয়নের তিনটি গ্রাম হল রামনাবাদ নদী ঘেষা, আটখালী, ডাকুয়া ও হোগলবুনিয়া। এখানে স্রোতের তীব্রতা এতই প্রকট প্রায় সারা বছর চলে নদী ভাঙন। বর্ষা আসলেই ভাঙনের তীব্রতা আরও বাড়ে।

স্থানীয়রা জানান, সাংবাদিক আলতাফ মাহমুদের বাড়ি ও সমাধিস্থল নদী ভাঙনের কবলে রয়েছে। এছাড়া ভাঙনের মুখে রয়েছে ডাকুয়া ইউনিয়ন পরিষদ, আটখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আটখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়, আটখালী কমিউনিটি ক্লিনিক, গলাচিপা কলাগাছিয়া সংযোগ সড়কের একাংশ, গলাচিপা-চরচন্দ্রাইল সংযোগ সড়কের একাংশ। এ ছাড়া তেঁতুলতলা বাজার, দুইশ বছরের পুরনো জমিদার বাড়ি, পাঁচটি মসজিদ, দুটি মন্দির, অসংখ্য বাড়িঘর ও ফসলি জমি।

হবিগঞ্জ : কুশিয়ারা ও খোয়াই নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কুশিয়ারা নদীর পানি হবিগঞ্জ অংশে বিপদসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে এবং খোয়াই নদীর পানি হবিগঞ্জ অংশে বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি আরও বাড়তে পারে বলে দাবি পানি উন্নয়ন বোর্ডের।

কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধ উপচে অনেক গ্রামে পানি প্রবেশ করছে। এছাড়া হুমকিতে রয়েছে এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহত্ত গ্যাস ক্ষেত্র বিবিয়ানা পাওয়ার প্লান্ট। ইতোমধ্যে কুশিয়ারা নদীর বাঁধ উপচে বিবিয়ানা পাওয়ার প্লান্টের আশপাশ এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে কুশিয়ারা ডাইক। সেখানে ভাঙন ঠেকাতে ও পানি প্রবেশ বন্ধ করতে বালির বস্তা ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কুশিয়ারা ডাইক ভেঙে গেলে প্লাবিত হবে বিবিয়ানা পাওয়ার প্ল্যান্ট- এমনটা আশঙ্কা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

পানি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ইতোমধ্যে উপজেলার দীঘলবাক, কসবা, কুমারকাঁদা, ফাদুল্লা, রাধাপুর, জামারগাঁওসহ বেশকিছু এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। বাড়িঘরে পানি উঠায় সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েছেন নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা। বন্যার্তদের সহযোগিতায় নবীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম বলেন, কুশিয়ারা নদীর পানি বর্তমানে বিপদসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কুশিয়ারা ডাইক মেরামতের জন্য আমাদের লোকজন কাজ করছে। ভাঙন রোধে সেখানে বস্তা ফেলা কাজ চলছে। কুমিয়ারা ডাইক ভাঙলে বিবিয়ানা পাওয়ার প্লান্টে পানি প্রবেশ করতে পারে। এতে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) : কমলগঞ্জে ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের রামপাশা এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। বন্যার পানিতে দুটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পাঁচ শতাধিক লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মনু নদীর পানি বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ও ধলাই নদীর পানি ২৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলেন জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শঙ্কর চক্রবর্তী। তিনি বলেন, শুক্রবার রাত ২টার দিকে কমলগঞ্জ পৌরসভার রামপাশা এলাকায় ধলাই নদীর প্রায় ৭০ ফুট বাঁধ ভেঙে গেছে। এর ফলে গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। তবে সকাল থেকে পানি কমছে। পানি কমে গেলে বাঁধ দ্রুত মেরামত করা হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা খালিদ বিন ওয়ালিদ বলেন, এ এলাকার প্রতিরক্ষা বাঁধসহ পুরো ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধে পাথরের ব্লক স্থাপনে একটি প্রস্তাব দুই মাস আগে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ প্রস্তাব পাস হলে প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ শুরু হবে। আপাতত শুক্রবার রাতে ভেঙে যাওয়া অংশে মেরামত কাজ করার জন্য একজন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। পানি কমলে কাজ শুরু হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, উজানে তেমন বৃষ্টি না হলে আশঙ্কার কিছু নেই। তবে উজানে ভারি বৃষ্টি হলে কমলগঞ্জের ধলাই নদীতে পানি বেড়ে যেতে পারে।

কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) : মেঘনার ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। অব্যাহত ভাঙনের কারণে গত দেড় মাসে শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এভাবে নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে রামগতি ও কমলনগর উপজেলা নদীতে বিলীন হওয়ার শঙ্কা স্থানীয়দের।

কমলনগর উপজেলার সাহেবেরহাট, পাটওয়ারীরহাট, চরফলকন, মাতব্বরহাটসহ ১০টি এলাকার প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া চরকালকিনি, মাতব্বরহাট ও লুধুয়াসহ অন্তত ৩০টি হাট-বাজার, ২০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ১৫টি মসজিদ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

সাহেবের হাট ও মাতব্বরহাট এলাকার রফিক মাঝি ও আবুল বাশার জানান, মেঘনা তাদের সব কেড়ে নিয়েছে। বসতভিটা হারিয়ে বর্তমানে রাস্তার পাশে খুপরি ঘর তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। এখনও সরকারিভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়নি তাদের। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসা জানান, দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের বরাদ্দ না পেলে এ বর্ষায় অনেক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এক হাজার ৭০৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

মীরসরাই (চট্টগ্রাম) : সারাদেশের মত মীরসরাইয়ে টানা বৃষ্টিতে ডুবে গেছে গ্রাম। অতি বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে হেলে পড়েছে গাছপালা। প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে আমন বীজতলার। উপজেলার করেরহাট, হিগুলী, জোরারগঞ্জ, কাটাছরা, মিঠানালা, মীরসরাই সদর, খৈয়াছড়া, ওয়াহেদপুর, ওসমানপুর, আবুতোরাবসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বর্ষণে নিম্নাঞ্চল ডুবে গেছ।

মীরসরাই পৌরসভার ফেনাপুনি এলাকার সাইফুল্লাহ জানান, ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ফেনাপুনি ও খৈয়াছরা এলাকায় পানি বেড়ে গেছে। আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তবে কোথাও কোনো ঘর বাড়ি ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

নেত্রকোণা : দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, বারহাট্টার সবকটি গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। সুমেশ্বরীর নদীর পানি কমলেও কংস, ঘোমাই, উব্দাখালী নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলায় তিন শতাধিক গ্রাম বন্যায় প্লাবিত রয়েছে। এর মধ্যে কলমাকান্দায় সবচেয়ে বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এভাবে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে জেলার বেশিরভাগ গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

কলমাকান্দা উপজেলার চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্দুল খালেক তালুকদার জানান, জেলা প্রশাসন থেকে ১০ টন জিআর ও ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার উপজেলার প্রত্যেক ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের মাঝে বণটন করে দেওয়া হয়েছে। বারহাট্টা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, বারহাট্টা সদর ইউনিয়ন আংশিক অন্য ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বন্যাকবলিত লোকজনদের শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বন্যা পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা পাবে তারা।

সিরাজগঞ্জ : যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পানি ৪২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি বৃদ্ধির কারণে সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালী, কাজিপুর ও শাহজাদপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার পুঠিয়াবাড়ি ও চরমালশাপাড়া এলাকায় বাঁধের নিচে বসবাসরত ঘর বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। এসব মানুষ বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়েছে। পাশাপাশি যমুনা নদীতে ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হওয়ায় সিরাজগঞ্জ, কাজিপুর, চৌহালী, শাহজাদপুরে ব্যাপক নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। চরাঞ্চলের মানুষ বাড়িঘর হারিয়ে উঁচু বাঁধ বা বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে। দ্রুত পানি বৃদ্ধির কারণে চরাঞ্চলের বিভিন্ন ফসলি জমি ও সবজি ক্ষেত ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষক।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পানি ৪২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যমুনার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করবে।

সিলেট : সিলেটের সব নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিভিন্ন হাওরে পানি প্রবেশ করায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। অনেক বাড়িঘর বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাসিন্দারা বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, লোভা, সারি, ধলাই, সারীগোয়াইন নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল শনিবার সকাল থেকে লোভা ও সারি গোয়াইনের পানি কিছুটা কমলেও সুরমা, কুশিয়ারার পানি বাড়ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস সংক্রান্ত কন্ট্রোল রুম জানিয়েছে, গতকাল শনিবার সুরমা নদীর পানি সিলেটের কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৪২ সেন্টিমিটার, সিলেট পয়েন্টে বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর পানি আমলসিদ পয়েন্টে বিপদসীমার ১২৮ সেন্টিমিটার, শেওলা পয়েন্টে ৬২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১৭৫ মিলিমিটার। এছাড়া সিলেটের শেওলায় ৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

ইসলামপুর (জামালপুর) : জামালপুরে যমুনার পানি বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনার পানি বৃদ্ধির ফলে ইসলামপুর, বকশীগঞ্জ, সরিষাবাড়ী, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বন্যাকবলিত এলাকা ইসলামপুর উপজেলার চিনাডলী, বেলগাছা, সাপধরী ও পাথর্শী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments