বাড়ল গ্যাসের দাম টান পড়ল হিসাবে

334

আলোকিত সকাল ডেস্ক

গ্রাহকদের তুমুল আপত্তির মধ্যেই সব পর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। নতুন নির্ধারিত মূল্যে গ্যাসের দাম বেড়েছে আগের চেয়ে ৩২.৮ শতাংশ। আবাসিক গ্রাহকদের এক চুলার জন্য এখন থেকে গুনতে হবে ৯২৫ টাকা; আগে যা ছিল ৭৫০ টাকা। আর দুই চুলার জন্য গুনতে হবে ৯৭৫ টাকা; যার মূল্য আগে ছিল ৮০০ টাকা। এর মধ্য দিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি ১ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা আদায় করা হবে, যার পুরোটাই নেওয়া হবে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পকেট থেকে।

রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এক গণবিজ্ঞপ্তিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বলেছে, জুলাই মাসের প্রথম দিন অর্থাৎ আজ থেকেই দামবৃদ্ধির ঘোষণা কার্যকর হবে। এ নিয়ে সংস্থাটি বিকালে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলামসহ অন্য কমিশনাররা।

বিইআরসির নতুন মূল্যে সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৭ টাকা ৩৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। গৃহস্থালিতে মিটারে যারা গ্যাসের বিল দেন, তাদের প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহারের জন্য এখন থেকে ১২ টাকা ৬০ পয়সা করে দিতে হবে। এতদিন প্রতি ঘনমিটারে তাদের বিল হতো ৯ টাকা ১০ পয়সা। অন্যদিকে যানবাহনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম আজ থেকে প্রতি ঘনমিটারে ৩৮ টাকা থেকে বেড়ে হচ্ছে ৪৩ টাকা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতেও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে খরচ বাড়বে শিল্পোৎপাদনেও।

ঘোষিত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গ্রাহকশ্রেণি অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটারে দাম নির্ধারিত হয়েছে-বিদ্যুতে ৪.৪৫ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ১৩.৮৪ টাকা, সারে ৪.৪৫ টাকা, শিল্পে ১০.৭০ টাকা, চা বাগানে ১০.৭০ টাকা, বাণিজ্যিক হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ২৩ টাকা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ১৭.০৪ টাকা এবং সিএনজিতে ৪৩ টাকা।

এদিকে, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির চূড়ান্ত ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গেই ভোক্তা পর্যায়ে অসন্তোষ ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কারণ সর্বস্তরে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার ভয়াবহ প্রভাব পড়বে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে। বাসা ভাড়া, নিত্যপণ্যের দাম, যানবাহন খরচ, বিদ্যুৎ বিল সবকিছুই বেড়ে যাবে বিইআরসির এ ঘোষণার পর। বিশেষ করে শিল্পোৎপাদন এবং যানবাহনে ব্যবহার্য্য গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যক্ষ প্রভাবে নাগরিক জীবনে নাভিশ্বাস উঠবে। ফলে নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত সব শ্রেণির মানুষের দৈনন্দিন হিসাবের খাতায় টান পড়বে। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এ সিদ্ধান্তকে তাই মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবেই দেখছেন নাগরিকরা।

যদিও বিইআরসি থেকে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব আসার পর সে প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব এবং নানা নাগরিক সংগঠনের নেতারা। এ নিয়ে গত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে ভোক্তা বা ব্যবহারকারীদের পক্ষ থেকে নানা যুক্তি ও ব্যাখ্যা তুলে ধরে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি না করার জোরালো প্রস্তাব করা হয়।

ই শুনানিতে উপস্থিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও নাগরিক আন্দোলনের কর্মী রুহিন হোসেন প্রিন্স গতকাল খোলা কাগজকে বলেন, ‘গণশুনানিতে আমরা প্রমাণ করেছিলাম, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। আমরা নানা তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তি হাজির করে বলেছিলাম পেট্রোবাংলা ও তিতাসের মতো প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করলেই উল্টো সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয় সরকারের। আদালতও একইভাবে বলেছে পেট্রোবাংলা ও তিতাসে দুর্নীতির ৫০ ভাগ কমালেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না। অথচ সরকার সে দুর্নীতি বন্ধ করছে না।

এছাড়া নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মধ্য দিয়েও গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা যায় বলেও আমরা মত দিয়েছি। কিন্তু সরকার গ্যাসের সংকট দেখিয়ে অযৌক্তিকভাবে বেশি দামে এলএনজি আমদানিকে অনিবার্য করে তুলেছে। মূলত দেশি-বিদেশি লুটেরা গোষ্ঠীর স্বার্থে সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই লাভবান হবে না। একটা বড় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে জনগণের পয়সা তুলে দিতেই সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর বিইআরসির মতো প্রতিষ্ঠানও সরকারে তাঁবেদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে গণবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। জনগণ মাঠে নামলে সরকার এ গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারবে না। আমরা জনগণকে রাজপথে নামার আহ্বান জানাই। প্রিন্স বলেন, আমরা আন্দোলনেই আছি, প্রয়োজনে বৃহত্তর কর্মসূচি দিয়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ঠেকাবো।

গত ফেব্রুয়ারিতে বিইআরসির দেওয়া প্রস্তাবে বাসাবাড়িতে একচুলা গ্যাসের দাম ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৫০টাকা এবং দুই চুলা গাসের দাম ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৪৪০ টাকা করার কথা বলা হয়। এ ছাড়া যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজির দাম প্রতি ইউনিট ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ দশমিক ১০ টাকা এবং শিল্পকারখানার বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিট ৯ দশমিক ৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮ দশমিক ০৪ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ওই প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি চলাকালীন ভোক্তা সংগঠন ক্যাব-এর পক্ষ থেকে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হলে শুনানি শেষে আদালত বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের যে মূল্য রয়েছে সেটা মেনেই দেশে গ্যাসের দাম বাড়ানো বা কমানো উচিত। কারণ ভারত যেখানে ছয় ডলার দিয়ে গ্যাস কিনছে, সেখানে বাংলাদেশ কেন ১০ ডলার দিয়ে কিনবে? আদালত তখন মন্তব্য করেন, পেট্রোবাংলা ও তিতাসে দুর্নীতির ৫০ ভাগ কমালেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না বলে।

ক্যাবের ওই রিট আবেদনে বলা হয়, ‘২০১০ সালের আইনে গ্যাসের বিতরণ ও সঞ্চালন সংক্রান্ত প্রবিধানমালায় গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কতগুলো সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা বলা আছে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই অযৌক্তিকভাবে গ্যাসের দাম বাড়াতে চাইছে বিইআরসি। এখানে দাম বৃদ্ধির নামে যেটা হচ্ছে, সেটা হলো কোনো একটি বিশেষ মহলকে সুবিধা দেওয়া।’

রিট আবেদনকারীরর আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এ ব্যাপারে খোলা কাগজকে বলেন, আগামী পরশু (মঙ্গলবার) ওই রিটের শুনানির জন্য দিন পূর্বনির্ধারিত রয়েছে। এর মধ্যে বিইআরসির গ্যাসের দাম বাড়ানোর চূড়ান্ত ঘোষণা এলো। জনমত ও যুক্তি উপেক্ষা করে যখন সরকার কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয় তখন আদালত ছাড়া আমাদের আর আশ্রয় থাকে না। আমরা তাই আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি। আদালতের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা ও ভরসা আছে। কারণ আদালতও ইতোমধ্যে বলেছে-বিইআরসি কী ঘোষণা দেয় তা তারা দেখবেন।

আমরা আদালতকে বলেছি, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর দুর্নীতি রোধ করা গেলে ২০ বছরেও গ্যাসের দাম বাড়ানোর দরকার হতো না। ইন্টারন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (আইওসি) থেকে কেনা গ্যাসের ক্ষেত্রে ১৯৯৩ সালে সরকারি সার্কুলারে বলা হয়েছিল গ্রাহকের কাছ থেকে কোনোভাবেই এই গ্যাসের দাম নেওয়া যাবে না। কিন্তু সরকারি কোম্পানিগুলো জনগণের পকেট থেকে সে টাকা নিয়েছে।

কয়েক বছর আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পেট্রোবাংলাকে একটা হিসাব দিয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে জনগণের কাছ থেকে নিয়ম লঙ্ঘন করে ১৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। এটা সরকারি হিসাব। প্রকৃত অঙ্ক ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো হবে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যে তথ্য তা হলো-এসব টাকার কোনো হিসাব নেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। আমরা এসব তথ্যপ্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করব। আইনী লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই গণবিরোধী এ সিদ্ধান্ত আমরা রদ করতে পারবো বলে আশা করি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments