বিকল্প ব্যবস্থা না করে রিকশা বন্ধ করায় নগরবাসীর ক্ষোভ

215

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বিকল্প ব্যবস্থা না করে রিকশা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। এছাড়া লাখ লাখ রিকশাচালকের কর্মহীন হয়ে পড়ার মতো বিষয় তো আছেই। নগরবাসী বলছেন, গণপরিবহনের সংখ্যা ও সেবার মান না বাড়িয়ে রিকশা চলাচল বন্ধ করা হলে নারী ও শিশুরা পড়বেন চরম ভোগান্তিতে।

গুরুত্বপূর্ণ সড়কে রিকশা বন্ধের ক্ষেত্রে যানজটের কথা বলা হলেও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, রিকশা তুলে দেওয়াই যানজট নিয়ন্ত্রণের একমাত্র সমাধান নয়। এ সিদ্ধান্তে নগরবাসীর ভোগান্তি এবং খরচ বাড়বে বলেও মনে করছেন তারা। এরই মধ্যে বিভিন্নভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন নগরবাসী। ক্ষোভ প্রকাশ চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও।

তারা বলছেন, বাস তো স্বল্প দূরত্বে যাত্রী নেয় না। তা ছাড়া রিকশা চলাচল করার পরও বাসে জায়গা হয় না। রিকশা বন্ধ করে দিলে কী হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মেরুল বাড্ডা থেকে শাহজাদপুর পর্যন্ত এলাকায় অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বাসা থেকে চলাচলের জন্য রিকশাই ব্যবহার করেন।

তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, তারা রোববার থেকে কীভাবে যাতায়াত করবেন। মেরুল বাড্ডার একজন মা হাবিবা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, কোনো বিকল্প না রেখে রিকশা বন্ধ করে দিয়েছে। এ ধরনের কাজ জনগণের সঙ্গে সবসময়ই করা হয়। এবারও তাই করেছে। এত এত মানুষ কীভাবে যাতায়াত করবে, সেই চিন্তা করেনি কর্তৃপক্ষ।

স্বল্প দূরত্বে যাত্রী নেয় না বাসগুলো : সায়েদাবাদের জনপথ মোড় থেকে খিলগাঁও, মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডা হয়ে কুড়িল পর্যন্ত সড়কটি রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণে সংযোগকারী দুটি সড়কের একটি। এ সড়কে রাইদা, জাবালে নূর, গ্রিন ঢাকা, ভিক্টর, তুরাগ, অনাবিল, আকাশ, ছালছাবিল, প্রচেষ্টা, অছিম ও বিআরটিসির দোতলা বাসও চলাচল করে। ফলে রিকশার বিকল্প হিসেবে বাসের কথা বলতে পারেন ঢাকা পরিবহণ সমন্বয় কর্তৃপক্ষসহ (ডিটিসিএ) ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।

কিন্তু ওই এলাকার বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা, বিআরটিসি ও তুরাগ ছাড়া বাকি বাসগুলো স্বল্প দূরত্বের যাত্রী নেয় না। বাড্ডা লিংক রোডের বাসিন্দা আশরাফুল বলেন, আমি এ রাস্তা দিয়ে কাছাকাছি দূরত্বের অনেক জায়গায় যাই। যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরায় প্রায়ই যেতে হয় বিভিন্ন কাজে। এ সড়কে চলাচলকারী বেশির ভাগ বাস কাছাকাছি দূরত্বের যাত্রী নেয় না, দরজা বন্ধ করে রাখে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাসে ওঠাও মুশকিল।

এক নারী বলেন, বাসে অনেক ভিড় থাকে। অনেক সময় বাস নিতে চায় না। রিকশা ছাড়া চলব কীভাবে? আরেক নারী বলেন, রিকশার জন্য আলাদা লেন করে দিয়ে সমস্যা মেটানো যেত। বাচ্চাদের নিয়ে চলাচল করা না হলে অনেক সমস্যা হবে। আরেক পথচারী বলেন, পুলিশ যদি লেনের রিকশা কন্ট্রোল করতে পারে তাহলে যানজট কম হবে।

নিউ মার্কেটে কেনাকাটা করতে ওই এলাকার যারা রিকশায় যান, তাদেরও পড়তে হবে সমস্যায়। লালবাগের একজন বাসিন্দা বললেন, কেনাকাটা বা কোনো দরকারে সাধারণত রিকশায় করেই আসা হয় নিউমার্কেটে। কিন্তু যদি এ রুটে রিকশা বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে বিকল্প হিসেবে ভারী যানবাহন ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু সেটাও তো তেমন নেই। তবে পুরোপুরি বন্ধ না করে রিকশার জন্য আলাদা লেন তৈরি করে দেওয়ার পরামর্শ দেন অনেকেই।

তারা বলছেন, রিকশা পুরোপুরি তুলে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণের অভিনব প্রতিবাদ : রাজধানীর কয়েকটি সড়কে রিকশা বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তালুকদার রিফাত পাশা নামের এক তরুণ অভিনব প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গত শুক্রবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের সড়ক দিয়ে তাকে রিকশায় চড়ে যেতে দেখা যায়। এ সময় তার হাতে ‘রিক্সা বন্ধ হলে, আমি চলব কিসে’ লেখা প্ল্যাকার্ড ছিল। রিফাতের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের তিনি প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্র। ছোটবেলায় চোখের গ্লুকোমা সমস্যায় তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায়। রিফাত বর্তমানে মগবাজারের বাসিন্দা। তিনি ধানমন্ডির শংকর এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

রিফাত বলেন, আমি রিকশার পাশাপাশি মাঝে-মধ্যে পাঠাও এবং উবারে অফিসে যাতায়াত করতাম। কিন্তু সেগুলো নিরাপদ নয়। আমি দুই বার এক্সিডেন্ট করেছি। আমাদের দেশের প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনো বাস এবং বাস স্টপেজ নেই। যেখানে সাধারণ মানুষই অফিস টাইমে বাসে উঠতে পারে না। সেখানে আমি কীভাবে বাসে উঠব? আমার মতো আরও অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও ঢাকায় চলাচল করতে একই সমস্যায় পড়তে হয়। রিকশা বন্ধ হয়ে গেলে আমি কীভাবে অফিসে বা অন্য কোথাও যাতায়াত করব? তাই আমি এর প্রতিবাদ করছি।

যেসব রুটে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ : যেসব রুটে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেগুলো হলো- কুড়িল-রামপুরা-সায়েদাবাদ, গাবতলী-আসাদগেট-আজিমপুর ও সায়েন্সল্যাব-শাহবাগ। গেল বুধবার দক্ষিণ নগর ভবনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভা শেষে এসব রুটে রিকশা চলাচল বন্ধের পাশাপাশি সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার এ ঘোষণা দেওয়া হয়।

রুটি-রুজি হারানোর শঙ্কায় রিকশাচালকরা : এদিকে কর্মহীন হয়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছে এ যানের শ্রমিকরা। তারা বলেন, এক রিকশায় ৩টা পরিবার চলে। রিকশাওয়ালার পরিবার, গ্যারেজ মালিকের, আর মেস খাওয়ায় যে তার। তারা আরও বলেন, রিকশা চালাতে পারব না, কী খাব, আমরা চুরি ডাকাতি করব? সোহেল রানা নামের এক রিকশাচালক বলেন, এদিকে রিকশায় খ্যাপ বেশি পাওয়া যায়। এ রাস্তায় রিকশা বন্ধ করে দিলে আমাদের ইনকাম কমে যাবে।

রাজধানীতে চলাচলকারী রিকশার প্রকৃত তথ্য নেই কারও কাছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে নিবন্ধিত রিকশা ৫৮ হাজার ৭১৪টি, তবে এর মধ্যে ৫ হাজার ৮৬০টি ভ্যানও রয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটিতে নিবন্ধিত রিকশা আছে ৩০ হাজার। তবে কমপক্ষে ৫ লাখ রিকশা রাজধানীতে চলছে এবং ১০ লাখেরও বেশি চালক এসব রিকশা চালান বলে তথ্য দিয়েছেন ঢাকা মহানগর রিকশা-ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস।

প্রধান তিনটি সড়কে রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত শ্রমজীবী মানুষের ওপর এটি আরেকটি আঘাত বলে মনে করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। নাগরিকদের অসুবিধার দিকটি দেখিয়ে তিনি বলেন, এসব সড়কে যদি পর্যাপ্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো বিষয়টি নিয়ে ভাবা যেত।

রিকশা নয়, প্রাইভেট কারকে যানজটের জন্য দায়ী করা হচ্ছে : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যানজটের জন্য রিকশাকে দায়ী করে তা নিষিদ্ধ করা হলেও আদতে যানজটের জন্য দায়ী প্রাইভেট কার। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে বর্তমানে ঢাকায় প্রাইভেট কার আছে দুই লাখ ৮৩ হাজার ৬১৭টি। এ প্রাইভেট কারকে যানজটের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মারুফ হাসান। একটি গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ঢাকায় প্রতিদিন সাড়ে তিন কোটি ট্রিপ হয়। এর ৪০ শতাংশ হয় রিকশার মাধ্যমে। রিকশা বন্ধ করলে সড়কে প্রাইভেট কারের পরিমাণও বেড়ে যাবে। একটা প্রাইভেট কার রিকশার চেয়ে আড়াইগুণ বেশি জায়গা নেয়। একটি বড় বাসের জায়গা নেয় এক দশমিক ৮টি প্রাইভেট কার।

এসব প্রাইভেট কার পার্কিংয়ে রাস্তার অনেকটা জায়গা দখল করে ফেলা হচ্ছে। অন্যদিকে, রিকশা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট। এটি সবসময় চলার উপর থাকে। তিনি বলেন, সারা বিশ্বে পরিবেশবান্ধব অযান্ত্রিক যানবাহন উসাহিত করা হয়। আমাদের এখানে হচ্ছে উল্টোটা। রিকশার চেয়ে বেশি যানজট তৈরি করে প্রাইভেট কার। তো কিছু সড়কে প্রাইভেট কারও বন্ধ করে দেখাক।

আস/এসআইসু

Facebook Comments