বিপদে ভোট বিদ্রোহীরা

257

আলোকিত সকাল ডেস্ক

আওয়ামী লীগের যেসব নেতা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন, তাদের আর শেষ রক্ষা হচ্ছে না। তারা এবার ফেঁসেই যাবেন। দলীয় পদ থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অপরদিকে এসব বিদ্রোহী প্রার্থীকে যেসব এমপি-মন্ত্রী প্ররোচনা জুগিয়েছেন কিংবা সমর্থন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তির খড়গ নামছে।

এদিকে দু-একদিনের মধ্যেই তাদের কাছে কারণ দর্শানো নোটিস পাঠানো হতে পারে বলে আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে। কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাব পেলে দলীয় হাইকমান্ড তা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। গত শুক্রবার বিকালে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দুটি সভায়ই সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কার্যনির্বাহী পরিষদের বৈঠকের আগে দলের উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। দুটি বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, গত মাসে শেষ হয়েছে পাঁচ দফার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। আবার এ বছরই শুরু হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ বাড়তে থাকায় কঠোর অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের উপদেষ্টা পরিষদ ও কার্যনির্বাহী কমিটির সভায়ও অধিকাংশ নেতা ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দেন। কারণ দর্শানোর জবাব আসার পর অভিযোগ ও জবাব যাচাই-বাছাই করবেন দলের ৮ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তারপর তাদের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে সভাপতি দলীয় ফোরামে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।

জানা যায়, এর আগেও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে অনেক নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নানা দিক বিবেচনায় কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি দল। তবে এবার আর কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না বলে সূত্র জানিয়েছে। কেননা বিগত উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ১৪৩ নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন; যা দেশের মোট উপজেলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে এতসংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও এমপি-মন্ত্রীরা তাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সাংগঠনিকভাবে দলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন এখনই কঠোর হওয়ার উপযুক্ত সময়। কেননা, সামনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। যদি এখন ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তাহলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও এক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে যা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে।

গত শুক্রবারের সভায় উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রথমে সাময়িক বহিষ্কার করে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হবে। পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে। খুব শিগগিরই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান গতকাল শনিবার এ প্রসঙ্গে খোলা কাগজকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যারা আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। দু-এক দিনের মধ্যেই তাদের কাছে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হবে। নোটিসের জবাব পেলে যাছাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কয়েকদিন আগে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে যেসব মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য অবস্থান নিয়েছেন তাদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দলের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকরা এই তালিকা করে জমা দিলে দলের কার্যনির্বাহী কমিটি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।

এছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বিভিন্ন সময় বলেছেন- উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী থাকবে না। বিদ্রোহী প্রার্থী হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, গত শুক্রবারের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান। তিনি বলেন, যারা দলীয় পদ-পদবি ধারণ করে বিদ্রোহীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা করেছেন তাদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। আবদুর রহমানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবীর নানক। দলীয় সভাপতির উদ্দেশে নানক বলেন, এসব বিদ্রোহী ও তাদের সহায়তাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে অন্যরা উৎসাহিত হতে পারেন।

নেতাদের বক্তব্য শেষে দলের সভাপতি-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্রোহী প্রার্থীদের স্থায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত দেন। একই সঙ্গে যারা এসব বিদ্রোহীকে সহায়তা করেছেন এমন পদধারী নেতাদের কেন বহিষ্কার করা হবে না তা জানতে চেয়ে শোকজ নোটিস পাঠানোর সিদ্ধান্তও দেন তিনি। এ সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ইন্ধন ও মদদ দিয়েছেন তাদের সাসপেন্ড করা হবে। তবে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে তাদের শোকজ করার নির্দেশ দেন তিনি। এই সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রীর অনড় অবস্থানের কথা তুলে ধরে নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া দলীয় নেতাদের কোনো রকম ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানা গেছে।

সভায় উপস্থিত নেতারা জানান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, মন্ত্রী, এমপি, জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সবাইকে সাসপেন্ডের আওতায় আনা হবে। মন্ত্রী-এমপি বলে তাদের ক্ষমা করা যায় কি না- বৈঠকে এই প্রশ্ন উঠে এলে শেখ হাসিনা বলেন, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ থাকলে সে যত বড় নেতাই হোক শাস্তির আওতায় আসতেই হবে। এখানে কে মন্ত্রী, কে বড় নেতা, কে প্রভাবশালী, কে এমপি তা দেখার কোনো সুযোগ নেই বলে জানান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments